নিমাই বলল, ব্যবসাটা কিসের?
নানান জিনিসের। চালানি ব্যবসা। মাল আনা, চালান দেওয়া। পয়সা আছে।
শাশুড়ি বলে উঠল, বউমাকে দিয়ে হয়, ও বাবা নদেরচাঁদ?
খুব হয়। বউদি তো দিব্যি চটপটে মেয়ে। কাকা এরকমই খুঁজছে।
দেখবে নাকি বউমা?
বীণাপাণি জানে, এর মধ্যে একটা চক্কর আছে। তাকে গভীর জলে টেনে নামানোর জন্য কুমীর এসে ডাঙায় উঠেছে।
বাপের বাড়ির অবস্থা একটু ভাল হলে বীণাপাণি দুর্দিনে গিয়ে বাপ-ভাইয়ের ঠ্যাং ধরত। কিন্তু সে সুবিধে নেই। বউদিরা দাঁতে বিষ নিয়ে ফণা তুলে আছে। বাপ-মায়ের অবস্থা শোচনীয়।
বীণাপাণি সভয়ে বলল, কেমনধারা কাজ গো! আমি কি পারব।
নদেরচাঁদ উদাস গলায় বলল, মেয়েছেলেরই কাজ।
বোকা শাশুড়িটা নেচে উঠে বলল, দে বাবা নদেরাদ, কাজটা করে দে। সবাই মিলে দুটি খেতে পাই তাহলে।
ভয়-ভাবনা-অনিশ্চয়তা নিয়েই একদিন নদেরষ্টাদের সঙ্গে বনগাঁয় এল বীণা। কাকার সঙ্গে কথা বলে বিকেলেই ফিরে যাবে। বাসে বসেই নদেরাদ বলে ফেলল, শোনো বউদি, নিমাইদা অবুঝ তোক বলে তার সামনে বলিনি। যে কাজে তোমাকে নামাতে চাইছি তা একটু অন্যরকম।
বীণা চমকে উঠে বলল, কিরকম?
খুব মজার। চাকরির একঘেয়েমি নেই। রংদার কাজ।
বনগাঁয়ে বিশ্ববিজয় অপেরা সবে ডানা মেলতে শুরু করেছে। বিশ্ববিজয় অপেরার স্বত্বাধিকারী বিজয় সাহাকে কেউ তার আসল নামে ভাল চেনে না। সবাই জানে কাকা বলে। পঁয়ত্রিশ-চত্রিশ বছর বয়স, কালো, লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। অভিনয় তার নেশা। কলকাতার থিয়েটার পাড়া, যাত্রাপাড়া, ফিলমের স্টুডিওতে এতকাল ঘুরঘুর করেছে। সুযোগ পেয়েছিল কয়েকটা, কিন্তু সুযোগ এক কথা, উন্নতি আর এক জিনিস। শেষে একটা যাত্ৰাদলের চাকরি পেয়েছিল সামান্য মাইনের। বনল না। তখন মাথায় রোধ চাপল, কলকাতায় আর নয়। দেশে বনগাঁয়ে ফিরে গিয়ে যাত্ৰাদল খুলবে। কলকাতার পেশাদারদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তবে ছাড়বে।
কিন্তু ভাবা আর করা তো এক কথা নয়। টাকা-পয়সার বন্দোবস্ত নেই, ভাল পালাকার কোথায় পাবে, গানবাজনার লোকই বা কোথা থেকে জুটবে, নটনটী জোটানোও কি সোজা কথা। কিন্তু সবার আগে দরকার টাকা।
নাটকের নেশাই কাকাকে পথ দেখাল। কাছেই বাংলাদেশ বর্ডার। চোরাইচালানের ব্যবসায়ে লোকে টাকা লুটছে। যাত্ৰাদল করতে হবেই, সুতরাং কিছু না ভেবেই সে চোরাইচালানের কাজে নেমে গেল। কাজটা বড় সহজ নয়। প্রথম প্রথম বিপদে পড়ত, মারধর খেত, অ্যারেস্টও হয়েছে। কিন্তু লেগে রইল। ধীরে ধীরে দল তৈরি হল, চোরাই ব্যবসার অলিগলি মুখস্থ হল, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পাকা ব্যবস্থা হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা, টাকা আসতে লাগল হাতে।
টাকা ওড়াত না সে। নেশাভাঙ ছিল না, জুয়া খেলত না, মেয়েমানুষের দোষ নেই! দিনত শুধু যাত্রার ভাবনা তাব মাথায়। কলকাতার নাম-করা অপেরাগুলোর খোতা মুখ সে ভোতা করে ছাড়বে। মফস্বলের দল নিয়ে সে কাপিয়ে দেরে দেশ।
বিশ্ববিজয় অপেরা খুলেছে বছর দুই। গুটি কয়েক পালা করে একটু নামও হয়েছে। তবে সেটা কিছু নয়। বিরূপ চৌধুরীর হাতে পায়ে ধরে দুখানা পালার বায়না করেছে। ঐতিহাসিক পালায় বিরূপবাবুর জুড়ি নেই। গানের জন্য আকাশবাণীর পুরোনো এক গায়ককে ধরেছে। নিমাই পাল। কেউ পৌঁছে না, কিন্তু নিমাইবাবুর অগাধ জ্ঞান। এইসব ফেলে দেওয়া লোককেই দরকার কাকার। কার ভিতর থেকে কোন প্ৰতিভা বেরিয়ে আসবে কে জানে!
প্রতিভা খুঁজবার নেশোটা ছিল বলেই কাকা নদের চাঁদের আনা মেয়েটাকে প্রথম দর্শনেই ভাগিয়ে দিল না। নদেরচাঁদকেও সে একটু খাতির করে। তিন চারখানা বায়না করে দিয়েছে ছেলেটা।
মেয়েটা দেখতে ভাল। ছোটোখাটো পার্টে চলবে। তবে এখনও বড্ড গেয়ো আর জড়োসড়ো। ভয়ে আধখানা হয়ে আছে।
নদেরচাঁদ ধরে পড়ল, একে কাজ না দিলেই নয় কাকা।
বলতে নেই, প্রথম দর্শনেই এই কাকা লোকটিকে ভাল লেগেছিল বীণাপাণির। জন্মে সে অভিনয় করেনি। আসার-ভরা লোকের সামনে সে হয়তো কেন্দেই ফেলবে পার্ট করতে উঠে। তবে এই কাকা লোকটি যে আর পাঁচটা মতলবীবাজাদের মতো নয়, এ যে যাত্ৰা-পাগল মানুষ, অন্য ধান্দা নেই, তা দশ-পনেরো মিনিট কথাবার্তার মধ্যেই বুঝতে পারল বীণাপাণি।
তবে বোকা-মাথার বুঝ, সেই বুঝকে তো আর বিশ্বাস নেই। এই তো নদেরচাঁদ চাকরির নাম করে নিয়ে এল। তাকে, বুঝতে পেরেছিল কিছু বীণাপাণি?
শুধু একটা জিনিসই স্পষ্ট বোঝে সে, তার শরীরখানার দিকে সকলের নজর। মেয়েদের চারদিকে পাপের হাজারো পথ। যেদিকেই পা বাড়াও, পথ পায়ের নিচে হাজির হয়ে যায়।
সে বলেই ফেলল, এ কাজ আমি পারব না।
কাকা তার দিকে চেয়ে নিরাসক্ত গলায় বলল, ইচ্ছে না হলে জোর তো কেউ করছে না। জবরদস্তির কাজও নয় এটা। এসব আর্ট, ভালবাসার জিনিস। যদি টান না থাকে তাহলে পারবেও না। তবে এসব কাজ মানুষই করে, অভিনয় করতে তো আর স্বৰ্গ থেকে আসে না। চেষ্টা করলে পারা কঠিন নয়।
আমি ঘরের বউ, এসব যাত্রাপালায় নানা খারাপ ব্যাপার হয়, শুনেছি। মেয়েমানুষের ধর্ম থাকে না।
ধর্ম যে যার নিজের কাছে। আগেই তো বলেছি, জবরদস্তির কিছু নেই। বহু ছেলেমেয়ে ঘুরঘুর করে একটা পার্টের জন্য। এ বাজারে একটা সুযোগ পাওয়াই যে বড্ড কঠিন। কত মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হয় রোজ। তোমাকে যে প্রথম চোটেই ফিরিয়ে দিইনি। সেটা কিন্তু মস্ত ব্যাপার। তুমি চাইলে করতে পারো। শিখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, কষ্ট করতে হবে। এ লাইন খুব কঠিন। বাড়ি গিয়ে দেখ। রাজি থাকলে এসো। সামনের মাসেই পালা নামবে।
