প্রথম দিন এর বেশী কথা হয়নি। কাকা ব্যস্ত লোক। সবসময়ই তার ঘরে ভিড়।
বাইরে এসে নদেরচাঁদ বলল, দিলে তো ড়ুবিয়ে! ওরকম বেঁকে বসলে কেন বলো তো! সারাক্ষণ যে পাখি-পড়া করে শিখিয়ে আনলুম।
শেখালেই হল! এক কথা বলে নিয়ে এলে, পরে দেখি আর এক ব্যাপার। তুমি ভীষণ খারাপ লোক।
এ বাজারে এ এক মস্ত সুযোগ তা জানো? কত বিদ্যোবুদ্ধি নিয়ে বেকার ছেয়েমেয়েরা বসে আছে তা দেখছ না?
আমি এসব পারব না।
সে তো বুঝতেই পারছি। আমার বাসভাড়াটাই জলে গেল।
শেষ অবধি জলে গেল না। বাড়ি ফিরে সকলের নানা প্রশ্নে ভাসা-ভাসা জবাব দিয়ে সে গভীর রাত অবধি নিবিষ্ট হয়ে ভাবল। সামনে তার অনেক বিপদ। তার মধ্যেই যেন একটু ডাঙা জমি হল ওই কাকা।
পরের সপ্তাহে ফের বনগাঁয়ে নদের চাঁদকে নিয়ে হাজির হল বীণাপাণি। কাকার সামনে সতেজে দাড়িয়ে অকম্পিত গলায় বলল, পার্ট দিন, করব।
তাহলে রোজ রিহার্সালে আসতে হবে। কঠিন কাজ। তোমার কোনও ট্রেনিং নেই। শিখতে সময় লাগবে, খাটতে হবে খুব।
আমাকে কত মাইনে দেবেন?
মাইনে! দল না দাঁড়ালে মাইনে আসবে কোথা থেকে? এ কি কলকাতার পেশাদার দল! শুধু পয়সার লালচ থাকে এসো না, তাতে লাভ নেই। অভিনয় অন্য জিনিস।
অন্য জিনিস তো বটেই। সিনেমা থিয়েটার কিছু দেখেছে বীণাপাণি। সিনেমার হিরো হিরোইনদের অনেক পয়সা আছে বলেও শুনেছে কিন্তু এই লাইন তার চেনাজানা জগতের বাইরে।
পারবে?
বীণাপাণি কাদো কাদো হয়ে বলল, আমার বরের খুব অসুখ। বাড়িতে হাঁড়ি চড়ছে না। আমার একটা ব্যবস্থা না করে দিলে কি করে পারব?
কাকা মৃদু হেসে বলে, সকলের গল্পই একরকম, বুঝলে? এদেশে কেউ সুখে নেই। সকলেরই নানা বিপদ। তবে সেসব সয়ে বয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু নদেরচাঁদ আমাকে বলেছিল। আপনি চাকরি দেবেন।
নদেরচাঁদ জানে না বলেই বলেছে। তবে তোমাকে আমি ঠিকাব না। যদি লেগে থাকো, দল যদি দাঁড়ায় তবে ভালই পাবে। এখন অবশ্য থোক টাকা না দিলেও খাওয়া-পরা পাবে, থাকার জায়গা দেবো। কিছু হাতখরচ।
বীণা হাত পেতে কাকার দেওয়া পঞ্চাশটা টাকা প্ৰায় ভিক্ষে হিসেবে নিল। সেই টাকা পেয়ে শ্বশুরবাড়ির সকলেই খুশি। তাকে বনগাঁয়ে রহস্যময় চাকরিতে পাঠাতে কারও কোনও আপত্তি হল না। শুধু ধুকতে ধুকতে নিমাই বলল, বনগাঁ যে অনেক দূর!
নদেরচাঁদ বলল, কিসের দূর! দুনিয়াটা কি আর আগের মতো আছে নিমাইদা? লোকে কলকাতায় ঘুম থেকে উঠে রাত্তিরের খাবার আমেরিকায় খায়, তা জানো? দুনিয়াটা এই একটুখানি হয়ে এসেছে। পালপাড়া থেকে বনগাঁ যদি দূর তাহলে নাক থেকে কানটাও দূর।
ডাঙা থেকে কুমীরটা শেষ অবধি তাকে বিপদসঙ্কুল জলে টেনে নামালই। হাবুড়ুবু কিছু কম খেয়েছে বীণাপাণি! তবে না শক্তিপোক্ত হয়েছে! বনগাঁয়ে তাকে আসতে হয়েছিল একা। যাত্ৰাদলের আর একটা মেয়ের বাড়িতে কাকা তার থাকবার ব্যবস্থা করে দিল। তিন মেয়ে নিয়ে বিধবা মায়ের সংসার। বুড়ি একটু ভাল মানুষ গোছের। বড় মেয়ে একটা স্কুলে পড়ায়, সংসার তারই কাঁধে। মেজো একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে বসে চলে গিয়েছিল, ফেরত এসেছে। ছোটো মেয়ে সীমা যাত্ৰাদলে ঢুকে পরে সিনেমায় নামবার স্বপ্ন দেখছে।
প্রথম প্রথম লজ্জা, ভয়, অনভ্যাস আর অস্বস্তিতে রিহার্সালের পর রিহার্সালে বকুনির পর বকুনি খেত বীণাপাণি। রাতে শুয়ে কাদত আর সীমা তাকে সান্তুনা দিত। একমাস তাকে খাঁটিয়ে জেরবার করে দিল কাকা। তারপর ভরাভর্তি আসরে একটা ছোটো রোলে সত্যিই নেমে পড়ল বীণাপাণি। কোনওরকমে পার্ট মুখস্থ বলে যেতে পারল।
কাকা তার মধ্যে কী দেখেছিল কে জানে! এর পরও তাকে দল থেকে তাড়ায়নি, বরং উঠে-পড়ে লাগল তাকে তৈরি করতে। শুরু হল বেদম খাটুনি। কাকা বলতে লাগল, এবার বড় রোল দিচ্ছি, কিন্তু দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই রোলটা। ভাববে। ভাববে। তুমি দময়ন্তী, তুমিই দময়ন্তী, দময়ন্তী ছাড়া আর কেউ নও।
তাই ভেবেছিল বীণাপাণি। দ্বিতীয়বার একই পালায় অন্য ভূমিকায় নেমে তার আর বিশেষ ভয় হল না। খানিকটা সহজভাবে পার্ট করে গেল। নল-দময়ন্তী দিয়ে চাঁদপাড়া, চাকদা, বড় জাগুলিয়া, কাঁচড়াপাড়ায় বেশ লোক টানল বিশ্ববিজয় অপেরা। ততদিনে পাকাপোক্ত হয়ে উঠল বীণাপাণি। নেশা ধরল অভিনয়ের।
সবচেয়ে বড় কথা হাতে টাকা আসতে লাগল। আর বেনোজলে ভেসে আসতে লাগল যতেক কামট কুমীর। ডাঙা থেকে তাকে জলে টেনে নামানোর অপেক্ষায় যারা ছিল। তাদের কাছে মেয়েছেলে মানে মেয়েছেলেই। তার বেশি আর কিছু নয়। কে আর্ট করে, কে লেখাপড়ায় ভাল, কার গানের গলা আছে বা লেখার হাত আছে সে সব নিয়ে বেশির ভাগ পুরুষেরই মাথাব্যথা নেই। মেয়েমানুষের গুণকে তারা মোটেই দাম দিতে চায় না। তাদের কাছে শরীরটাই আসল কথা।
শরীর বাঁচাতে বীণাপাণিকে কম কূটবুদ্ধি খাটাতে হয়নি। দু-একজন তো খুন করারও হুমকি দিয়েছিল।
শরীরের জন্য একজন পাহারাদার দরকার ছিল। সে চৌকিদার স্বামীর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে? নিমাই যতই সামান্য মানুষ হোক, তবু কলেরা-বসন্তের টীকার মতো স্বামীরও কিছু উপকার আছে। যাত্রায় নামবার ছমাস বাদে নিমাইকে আনতে গিয়েছিল বীণাপাণি। সে বনগাঁয়ে একখানা ঘর ভাড়া করেছে, নতুন চৌকি কিনেছে।
বীণাপাণির টাকায় ওষুধ-পথ্য করে নিমাই তখন শক্ত অসুখ থেকে খাড়া হয়েছে। ফলের দোকানে বসেছেও। বীণাপাণিকে দেখে তার অভিমান আকাশে উঠল বুঝি। বাকা গলায় বলল, আমাকে আর তোমার কিসের দরকার।
