বীণাপাণির রাগটা নিমাইও টের পাচ্ছে। তাই চোখে চোখ রাখছে না। মাথা নিচু করে খুব মন দিয়ে সুটকেস গোছাচ্ছে। তিনখানা ধুতি আর জামায় পাঞ্জাবিতে গোটা চারেক, সাকুল্যে এ কখানাই সম্বল। ওপরে দুখানা লুঙ্গি আর একখানা গামছা পাট করে রাখতে যত সময় লাগা উচিত তার চেয়ে বেশী সময় নিচ্ছে। এই শেষ সময়টাতে বীণাপাণি কিছু বলবে, আস্কারা-দেওয়া, লাই-দেওয়া কোনও কথা, সেইজন্যই কি অপেক্ষা করছে? আগে, অর্থাৎ বিয়ের পর পর ওই বেঁটে রোগা কালো এবং অপদাৰ্থ লোকটার মান ভাঙাতে পায়ে অবধি পড়েছে বীণাপাণি। তখন দুনিয়াটা একরকম ছিল, আজ সেই দুনিয়াটারই রং চটে, পলেস্তারা খসে বেড়ানো চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। কত কী ভাল লাগত তখন। এখন সবই বিষাদ।
এই মেনীমুখো মানুষটাকেই তার বাবা খুঁজে এনে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। বাবার মতে বড়ই ভাল ছেলে। শান্তশিষ্ট, স্থিরবুদ্ধি, চরিত্রবান। সবচেয়ে বড় কথা, মা-বাপের প্রতি ভক্তি আছে। ভগবানে বিশ্বাস আছে। চমৎকার কীর্তন গায়। শুধু পয়সাটারই যা অভাব। বড় জাগুলিয়ায় এক ঠিকাদারের গুদাম পাহারা দেয়। চাকরি পাকা নয়, তবে ঠিকাদারবাবুটি ভাল, স্নেহ করেন। চাকরির মেয়াদ বাড়তে পারে। পালপাড়ায় নিজেদের একখানা মেটে বাড়ি আছে, তিনচার বিঘে জমি। সুতরাং মেয়েকে একেবারে জলেফেলা হচ্ছে না। অন্তত অগাধ জলে নয়।
বীণাপাণি তখন কতটুকুই বা মেয়ে? বুদ্ধিটুদ্ধি কিছু পাকেনি, মা-বাপের ওপর নির্ভর। তবে বিয়ে নিয়ে একটা সুখের ভাবনা ছিল বড়। মিথ্যে বলবে না বীণাপাণি, বিয়ের পর সুখ হয়েছিল কিছুদিন। তার বুঝি তুলনা নেই। বীণাপাণি এ কথাও বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না যে, নিমাই লোকটা খারাপ। যদি মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবে তাহলেই বুঝতে পারে, এ লোকটার মনের জোর নেই বটে, কিন্তু দোষঘাটও বিশেষ নেই। নরম মনের মানুষ। সবসময়েই বিনয়ী বিগলিত ভাব। সেই কারণেই লোকে নিমাইকে ভালবাসে। ঠিকাদার নিরঞ্জনবাবুও বাসতেন। তবে তাঁর কাজটাই নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে। জাগুলিয়ার কাছে একটা রাস্তা তৈরির কাজশেষ করে তিনি আসামে গেলেন আরও বড় কাজে। নিমাইকে নিতে চেয়েছিলেন, তবে বুড়ো মা-বাপ, ক্ষেতি-গেরস্তি, নতুন বউ ছেড়ে তিন চারশ টাকার ভরসায় অতদূর যাওয়ায় গা-ও বিশেষ নেই। জাগুলিয়ায় একখানা ফলের স্টল খুলেছিল নিমাই। তখনই তার ব্যারাম শুরু হয়। জুর, কাশি, বুকে ব্যথা। জল জমেছিল বুকে। এমন কিছু সাতিক রোগ নয়। আজকাল কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই রোগের চিকিৎসা করতে গিয়েই দুবিঘে জমি বেচে দিতে হল। হাঁড়ির হাল।
যেসব ড্যাকরারা বক্তৃতা দিয়ে দেশ চালাচ্ছে, মানুষকে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে, তারা কি জানে গাঁয়ে গঞ্জে মাঠে ঘাটে লোকে রোগ-ভোগ খিদে-তেষ্টা বিপদ-আপদ নিয়ে কিরকম ভাবে বেঁচে আছে। আর কেমনতরো বেঁচে-থাকাটাই বা এটা? এই মলাম কি সেই মলাম বলে এই যে শ্বাসটুকু চালু রাখা—এর মধ্যে আবার ধৰ্ম-অধৰ্ম পাপ-পুণ্য ঢোকানোর কোনও মানে হয়? আকাশে যে আর কোন এক ড্যাকরা থাকে তার ততা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোনো ছাড়া আর কোনও কাজ দেখতে পায় না বীণাপাণি। পাপ-পুণ্য কোলে করে বসে থাকলে কি ভাত জুটবে? বীণাপাণির ঘরের পাশ দিয়েই পেটকেঁচড়ে পিস্তল নিয়ে এইটুকুন-টুকুন ছেলেরা প্রাণ হাতে করে যেসব কাজ করতে যায় তা পাপ না পুণ্য তা কে বলে দেবে? পেট-ভাতের জোগাড় থাকলে যেত ওসব করতে? বেকারে ভরা দেশ, বাপে খেদায় মায়ে খেদায়, চা-বিস্কুট খাওয়ার, দাড়ি কামানোর অবধি পয়সা জুটতে চায় না, তা করবেটা কি? কোন ভগবান দেখবে তাদের কোন সরকার। আছে নাকি তারা এদেশে?
নদেরচাঁদদ লোকটা গঙ্গাজলে যোয়া তুলসীপাতা যে নয় সবাই জানে সে কথা। তার নামে লোকে দু-গাল ভাত বেশী খায়। নানা দোষ আছে তার, কিন্তু ওই বিপদের দিনে লোক বাছতে গেলে কি চলত? বিপদে যে পাপ-পুণ্য ভেসে যায়। ভগবানের যদি বিচার থাকত তাহলে পাপ-পুণ্যের নিক্তিখানা ধরার আগে কুলোর বাতাস দিয়ে আপদ-বিপদ রোগ-ভোগ তাড়িয়ে মানুষকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দিত। না বচলে পাপ-পুণ্য করবেটা কি?
ভগবানের কাজ ভগবান না করে যদি এক পাপীতাপী লম্পট এসে করে তবে সেই লম্পটই তখন বীণাপাণির ভগবান। নদেরাদ তো ভগবানের মতোই এসে দাঁড়াল একদিন। তখন মেটে স্যাঁতসেঁতে ঘরে পুঁকছে নিমাই। অ্যালোপ্যাথির পয়সায় টান পড়ায়, হোমিওপ্যাথি চলছে। পথ্যের জোগাড় নেই। জ্যেঠতুতো দেওরের বন্ধু নদেরাদ উদয় হয়ে বলল বনগাঁর দিকে আমার কাকার একটা ব্যবসা আছে। তাতে একজন লোক দরকার। তবে পুরুষমানুষ হলে চলবে না। মেয়েছেলে চাই।
বীণাপাণি ডগমগ যুবতী। সে জানে মেয়েছেলে হয়ে জন্মানোর কিছু জনগত পাপ আছে। তবে শরীরটা যে সব পুরুষেরই ভক্ষ্যবস্তু। যদি একটু দেখনসই হয় তাহলে তো কথাই নেই। ছেলে-বুড়ো সকলেই নরখাদকের মতো মনে মনে ঠোঁট চাটবে। এই হালুম-খালুম ভাবটা চারদিকে বড় টের পায় বীণাপাণি। কপালের দোষই হবে, সে দেখতে ভাল। লম্বাটে গড়ন, রংখানাও ফর্সার দিকে, মুখের ডৌলটি নিখুঁত, দুটি টানা চোখ। নিজেকে কখনও আড়াল করেনি সে।
কথা হচ্ছিল নিমাইয়ের সামনে বসেই। বোেকা শাশুড়িটাও ঘরে ছিল। এরা দুনিয়ার হালচাল কিছুই জানে না, বোঝেও না। লোকে অচেনা কথা বললে হ করে চেয়ে থাকে। বোকা মাথায় কোনও ভাল বা মদের ঢেউ ওঠে না। এতদিন দুনিয়াতে কাটিয়েও দুনিয়াটা বড় অচেনা এদের কাছে। বীণাপাণিরও তো এর চেয়ে ভাল অবস্থা নয়। তবে সে নদেরচাদের চোখে একটা লোভানি দেখতে পেয়েছিল।
