হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলে, নষ্ট হবে না। কেউ খেয়ে নেবে, যাদের খিদে আছে।
মেয়েটি একটু মিষ্টি হেসে বলে, ঠিক আছে। কিন্তু দুপুরে খাবেন তো! অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে যে আপনার জন্য বিরাট রান্নাবান্না হচ্ছে।
খাবো। এই বলে নিঃশেষিত ডাবটা চেয়ারের পাশে নামিয়ে রেখে রুমালে মুখ মুছে সে বলল, আমি বড়লোক একথা আপনাকে কে বলল?
বুঝতে অসুবিধে হয় না।
কথাটা শুনে হেমাঙ্গ একটু খুশিই হল। মেয়েটির দিকে সে মোটেই তাকাচ্ছে না। সে জানালা দিয়ে কখনও মাঠের একটা লাল গরুকে দেখছে, কখনও দৃশ্যহীন সিলিং-এর দিকে চেয়ে গলাটা একটু চুলকে নিচ্ছে, কখনও দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের বাঁধানো ফটোর ওপর একটা ধৈর্যশীল মাকড়সাকে বসে থাকতে দেখছে, তবু কি করে যেন এর ফাঁকে ফাঁকে না তাকিয়েও মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছে সে। দুষ্টুমিতে ভরা বিন্দুর মতো মুখ, নিতান্তই চব্বিশ পঁচিশ বয়সের এই মেয়েটা, কি করে হেড মিস্ট্রেস হল? বাপ-দাদার জোরে? নাকি রাজনীতির ব্যাকিং-এ।
প্রশ্নটা করতে অনেক সময় লাগল হেমাঙ্গর। ঘণ্টা দুয়েক বাদে যখন কাগজপত্র খাতা হিসেব ইত্যাদি নিয়ে তিনজনে খুবই ব্যস্ত, তখন হঠাৎ এক ফাঁকে হেমাঙ্গ বলল, আপনি বেশ অল্প বয়সেই হেড মিস্ট্রেস হয়েছেন, না?
মেয়েটি একটু অবাক হয়ে বলে, অল্প বয়স? মোটেই না। আমার আঠাশ চলছে।
আঠাশ কি অনেক বয়স?
অনেক। হেড মিস্ট্রেস হতে গেলে বয়সটা ফ্যাক্টর নাকি?
হেমাঙ্গ তটস্থ হয়ে বলে, না, তা অবশ্য নয়। তবে কিনা—
নগেনবাবু তাড়াতাড়ি হেমাঙ্গর কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ম্যাডামের বিলিতি ডিগ্রি।
ওঃ, দ্যাট এক্সপ্লেনস্ ইট।
মেয়েটি ঠাণ্ডা গলায় বলে, হোয়ট এক্সপ্লেনস্ হোয়াট?
আপার বিলিতি ডিগ্রি, আর কে না জানে, আমরা মনে মনে এখনও সাহেবদের প্রতি দাস্যভাব পোষণ করি।
মেয়েটি অবাক হয়ে বলে, তাই নাকি? আমার তো সেরকম মনে হয় না।
কেরানি নগেনবাবু অতিশয় বিগলিত কণ্ঠে বললেন, ম্যাডামের জন্মই তো বিলেতে। লিভারপুলে।
শুনে হেমাঙ্গ প্রথা ভঙ্গ করে মেয়েটার মুখের দিকে এক ঝলক সোজাসুজি তাকাল। ভক্তি ভরে। তারপর মুখটা নামিয়ে নিয়ে বলল, তা হলে এই গাঁয়ের স্কুলে পড়ে থাকার দরকার কি?
মেয়েটি নগেনবাবুর দিকে একটু শাসনকরা দৃষ্টিক্ষেপ করে হেমাঙ্গর দিকে চেয়ে বলে, ওটাও কোনও নিয়ম নয়। বিলেতে জন্ম হলে বা বিলিতি ডিগ্রি থাকলে, এ দেশের গায়ের স্কুলে চাকরি করা তো বেআইনী নয়।
ওটা তর্কের কথা। ঘটনা ওরকমভাবে ঘটে না।
মেয়েটি একটু চুপ করে থেকে বলে, সবাই ঠিক আপনার মতোই প্রশ্ন করে। বিলেতে জন্ম, বিলিতি ডিগ্রি, তা হলে গায়ের স্কুলে পড়ে আছো কেন? আমি তো মানেই বুঝতে পারি না।
হেমাঙ্গ মেয়েদের রাগকে সাঘাতিক ভয় পায়। সে জানে, রেগে গেলে মেয়েরা অপ্রতিরোধ্য। সে তাড়াতাড়ি মোলায়েম গলায় বলে, এটা যদি আপনার একটা মিশন হয়ে থাকে তো ভাল কথা। প্রফেশন হলে কিন্তু লোকে অবাক হবেই। কারণ, ইচ্ছে করলেই আপনি যে-কোনও ভাল স্কুলে কলকাতাতেই চাকরি পেতে পারেন।
মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সেটা ঠিক কথা। এটা আমার একটা মিশন। আমি এ দেশের গায়ের স্কুলে চাকরি করছি অবস্থাটা বুঝবার জন্য। ঠিক চাকরি করার জন্য নয়।
কেমন বুঝছেন?
খুব ভাল নয়।
দুজনেই একটু হাসল। তারপর আবার কাজ। কাজের মাঝখানে মাঝখানে হেমাঙ্গ মেয়েটির গা থেকে উড়ে আসা মাদক গন্ধটি পাচ্ছিল। বিলিতি ডিগ্রিধারী, বিলেতে জন্মগ্রহণকারী মেয়েটি তাকে আরও একটু তটস্থ করেছে, অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তার দাঁতটা কি একটু বেশি সুলসুল করছে?
বেঁটেখাটো টাক-মাথা অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার এলেন একটু বাদেই—এবার যে একটু উঠতে হবে। কিছু মুখে দিয়ে আসবেন চলুন। খাবার রেডি।
খেতে গিয়ে আর এক দফা বিপদে পড়তে হল হেমাঙ্গকে। তার আর মেয়েটির খাওয়ার আয়োজন হয়েছে একটা ছোটা টেবিলের দুধারে। মুখখামুখি। দুজনের বেশি বসার জায়গাও নেই। একখানা একটেরে ঘরে তারা দুজনই মাত্র।
অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই বশংবদ দরজার কাছে একটু তফাতে দাঁড়ানন।
হেমাঙ্গর যত সংকোচ, যত আড় হয়ে থাকা। মেয়েটির সেসব নেই। খেতে বসে বলল, আপনার সঙ্গে কিন্তু আমার ফর্মাল পরিচয়টাই হয়নি। আমার নাম রশ্মি রায়। আপনার নাম অবশ্য আমি জানি।
হেমাঙ্গর দাগী দাঁতটা অকারণে সুলসুল করে ওঠে এ কথায়।
হেমাঙ্গ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। একটু ভাবতে হল। তারপর সম্পূর্ণ অনাগ্রহে প্রশ্ন করল, আপনি কি আগাগোড়া বিদেশেই লেখাপড়া করেছেন?
না। আমার আড়াই বছর বয়সে আমরা দেশে চলে আসি। আমি পড়াশুনো করেছি কলকাতায়। বি এস-সি পাশ করে ফের বিলেতে চলে যাই। দুবছর হল ফিরেছি।
আবার যাবেন?
রশ্মি মৃদু হেসে বলে, বিলেত এখন আর অত সুখের দেশ নেই। তবে সামনের বছর হয়তো যাবো। পারমানেন্টলি।
পারমানেন্টলি কথাটায় আবার দাঁতটা সুলসুল করল কেন? দাঁতটার কি কোনও রি-অ্যাকশন হচ্ছে? দাঁতের কি কাতুকুতু আছে? দাঁতের কি মস্তিষ্ক বা হৃদয় থাকা সম্ভব।
পারমানেন্টলি কেন?
কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে। বিদেশ ছাড়া কাজ করার উপায় নেই। এই যে স্কুলটা দেখছেন, এর যে কত প্রবলেম, ভাবতেই পারবেন না। তার ওপর ফাণ্ড নেই, পলিটিক্যাল প্রেসার আছে, ইন ফাইটিং আছে, ডেস্টেড ইন্টারেস্ট আছে। এইটুকু একটু স্কুল নিয়েও কত কি হয়, না দেখলে বিশ্বাস হত না। আপনি আজ খুব আলগাভাবে অডিট করেছেন, ভাল করে হিসেব দেখেননি। দেখলে অনেক ভূতুড়ে এন্ট্রি খুঁজে পেতেন।
