ওরকম জলে-পড়া ভাব করবেন না। ব্যাপারটা ভাবার মতো কিনা বলুন তো!
খুবই ভাবার মতো কথা।
নন্দী হেসে ফেলল, আচ্ছা আজ আর আপনাকে বিব্রত করব না। বেশ বিপদে পড়েছেন দেখা যাচ্ছে।
বিপদটা অবশ্য সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে এল না। হেমাঙ্গ এক কৌটো স্টেরিলাইজড প্লাস্টিকের টুথপিক কিনেছিল বড় একটা ওষুধের দোকান থেকে। সেই টুথপিক দিয়ে দাঁতের সিলিংটা একটু খুঁচিয়ে দেখতে ইচ্ছে হল তার, রাতের খাওয়ার পর। কারণ সবসময়েই দাতে একটা ফরেন জিনিস ঢুকে থাকার অস্বস্তি হচ্ছিল তার। খোঁচাখুঁচির ধাক্কায় সিলটা হঠাৎ আলগা হয়ে গেল। আর তারপর থেকেই ব্যথা নয়, একটা সিরসিরে ভাব ফুটো দাঁতটায় টের পেতে লাগল সে। ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যাল না ফিজিকাল সেটা ভাবতে ভাবতে দুশ্চিন্তা নিয়েই সে ঘুমোলো। সে স্বপ্ন দেখল, একদিন সকালে উঠে সে দেখছে সে সম্পূর্ণ ফোকলা, আর তার দাঁতগুলো সব খসে ঝরা শিউলির মতো বালিশে আর বিছানায় ছড়িয়ে পড়ে আছে। আতঙ্কে পেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে নিজের চেঁচানিতেই ঘুম ভাঙল হেমাঙ্গর। ঘড়িতে দেখল, ভোর সাড়ে চারটে।
বেলা সাড়ে দশটায় হেমাঙ্গ একটা ছোট্ট রেল স্টেশনে নামল। গঞ্জ পার হয়ে জলকাদায় থকথকে একটা গেঁয়ো পথ রিকশায় ডিঙিয়ে একটা দীন বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে নামল। আজ রবিবার। রবিবারে রবিবারে সে মাঝে মাঝে এরকম শৌখিন অডিট করে বেড়ায়। টাকার জন্য নয়, এইসব আউটিং তাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
মাঝবয়সী কেরানিবাবু অপেক্ষা করছিলেন। রিকশা থেকে হেমাঙ্গ নামতেই, অফিসঘর থেকে বেরিয়ে এসে, বারান্দা থেকেই হক মারলেন, আসুন স্যার, আসুন।
জলকাদায় ভরা উঠোনে পা ফেলার জন্য জোড়া জোড়া ইঁট পাতা। সাবধানে পা ফেলে হেমাঙ্গ বারান্দায় এসে উঠল। ব্যারাক বাড়ির মতো টিনের দীনদরিদ্র বাড়ি। চল্টা ওঠা মেঝে, নোনাধরা দেওয়াল, জীর্ণ দরজা-জানালা। কেমন একটা ভ্যাতভ্যাতে গন্ধ।
অফিসঘর আজ তার সম্মানে কিছুটা সাজানো হয়েছে। টেবিলের ওপর একটা এমব্রয়ডারি করা সবুজ টেবিলক্লথ পাতা। চেয়ারের পিছনে একটা তোয়ালে।
ডাব আনি স্যার?
দাঁতের ফুটোটায় বারবার জিব চলে যাচ্ছে। হেমাঙ্গ বলল, আনুন।
কোল্ড ড্রিংক্সও আছে স্যার।
না, ডাব হলেই চলবে।
তারপর একটু চা খাবেন তো!
সেটা পরে হবে। কাগজপত্র সব রেডি তো!
আজ্ঞে, সব রেডি। ম্যাডামও আজ এসেছেন। আপনি এলে খবর দিতে বলেছেন। ডাবটা খেয়ে নিন, ওঁকে ডাকছি।
ম্যাডাম মানে হেড মিস্ট্রেস। কেরানিবাবু পর্যন্ত হেমাঙ্গর কোনও অসুবিধে নেই। খাতাপত্রে কোনও অনিয়ম বা অসম্পূর্ণতা থাকলে মৃদু অসন্তোষ প্রকাশ করা যেতে পারে। কিন্তু মহিলারা এন্ট্রি নিলেই মুশকিল। তাদের সঙ্গে কখনও এঁটে ওঠে না হেমাঙ্গ। আর কে না জানে হেড মিস্ট্রেসরা সাধারণত রাশভারী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না মহিলা হন, যাদের হেমাঙ্গ বরাবর ভয় পায়।
সে বলল, ঠিক আছে। তবে ঔর একটু পরে এলেও হবে। আমরা বরং কাজটা শুরু করে দিই।
কিন্তু প্রধান শিক্ষিকা ডাবের পিছু পিছুই এলেন। তাকে দেখে নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল হেমাঙ্গ। ছিপছিপে, ফর্সা, অল্পবয়সী, ধারালো চেহারার এই মহিলাকে হেড মিস্ট্রেস বলে মনে হয় না। খুবই শহুরে চেহারা। অত্যাধুনিক সাজপোশাক। উপরন্তু বিদেশী সুগন্ধী চারদিকটা মোহময় করে রেখেছে মেয়েটির।
লজ্জা পেয়ে মেয়েটি বলল, আরে! দাঁড়ালেন কেন? বসুন!
হেমাঙ্গ ধপ করে বসে পড়ল। সে গায়ে গঞ্জে অনেক বালিকা বিদ্যালয়ে অডিট করতে গেছে, কিন্তু এরকম হেড মিস্ট্রেস কখনও দেখেনি। এ তো রূপালি পর্দা থেকে নেমে এসেছে। কিংবা তাও নয়। আরও একটা বেশী মাত্রা যোগ হয়েছে। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের নভেলের নায়িকা-টায়িকাদের মতো। তার মানে এ নয় যে, হেমাঙ্গ রবীন্দ্রনাথের সব নলে পড়েছে বা পড়ে। কিন্তু একটা আন্দাজ আছে তো! সুচরিতা, লাবণ্য এদের কথা বামচা ধামচা ভাবে যেটুকু জানে হেমাঙ্গ, তা হয়তো এরকমই। হেমাঙ্গ অপোবদন হল।
হেমাঙ্গ যে নার্ভাস বোধ করছে সেটা মেয়েটি স্পষ্ট বুঝতে পারল। সংকোচহীন চোখে হেমাঙ্গকে একটু মেপে নিয়ে বলল, আপনার তো মস্ত বড় ফার্ম, এ সব ছোটোখাটো অডিট আপনারা করতে এলে আমরা যে ভয় পেয়ে যাই।
হেমাঙ্গ জানে, কেন সে গাঁ-গঞ্জে অডিট করতে যায়, তা প্রায় কাউকেই বুঝিয়ে বলে লাভ নেই। কেউ বুঝবে না। এ মেয়েটি তো নিশ্চয়ই নয়। সে মৃদু মিষ্টি হাসি দিয়ে প্রসঙ্গটিকে পাশ কাটাল। নিবিষ্টভাবে প্লাস্টিকের ঐ দিয়ে ডাবের জলটা ধীরে ধীরে টেনে নিতে লাগল ভিতরে। এবং টের পেল, তার সেই দাঁতটা সিরসির করছে। খুব মৃদু, খুব সামান্য, তবু করছে।
স্কুলের দফতরি গোটা চারেক মিষ্টি, দুটো সিঙাড়া, দুখানা নিমকি, কয়েক টুকরো আপেল, কয়েকটা আঙুর, দুটো সিঙ্গাপুরী কলা দিয়ে সাজানো দুটো প্লেট অতি সম্মানের সঙ্গে রেখে গেল সামনে, সঙ্গে পরিষ্কার কাচের গ্রাসে জল।
মেয়েটি বলল, খান।
হেমাঙ্গর অভিজ্ঞতা সর্বত্রই অল্পবিস্তর একইরকম। সর্বত্রই এরকম মিষ্টির প্লেট সাজিয়ে দেওয়া হয়, হেমাঙ্গ স্পর্শও করে না। সে মৃদুস্বরে বলল, আমি খেয়ে এসেছি। ওসব নিয়ে যেতে বলুন।
অন্যান্য জায়গায় এই মৃদু আপত্তিকে সম্মতির লক্ষণ বিবেচনা করে প্রচণ্ড চাপাচাপি করা হয়। এমনকি প্রবল আপত্তিকেও অগ্রাহ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই শহুরে মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, আমি নগেনবাবুকে আগেই বলেছিলাম, এত জলখাবারের আয়োজন করবেন না, বড়লোকেরা বেশী খান না। উনি শুনলেন না। নষ্ট হবে, জানাই ছিল।
