নেই মা। আজ সকালে ছেড়ে গেছে। তুমি বোসো একটু আমার কাছে।
গোমড়া মুখে অপর্ণ বিছানার একপাশে বসল।
তুমি কি কেঁদোছো মা? চোখ ছলছল করছে কেন?
কাঁদিনি।
কেঁদেছো। তোমাকে যে আমি ভীষণ চিনি।
লক্ষ করো নাকি? আমি যে একজন মানুষ এ সংসারের এক ধারে পড়ে আছি। এটা কি মনে থাকে?
মাথাটা অপর্ণার কোলের দিকে নামিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করে বলে, তুমি কি খুব অ্যাটেনশন চাও মা?
মোটেই সে কথা বলিনি। তোমরা ব্যস্ত মানুষ, আমার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় কোথায় তোমাদের?
ঝুমকি হাসল, কিন্তু এটা তো জানো, সবাইকে ছাপিয়ে কিন্তু তুমি, তোমাকে কখন দরকার জানো? যখন মন খারাপ লাগে, একা লাগে, যখন ভয় পাই, তখন সারা পৃথিবীতে এই একজনকেই সবার আগে মনে পড়ে। তা জানো? বাইরের মনোযোগটা বড় কথা হল বুঝি? তুমি যে আমাদের মন সত্তা সব জুড়ে আছো!
অপর্ণার বাঁ হাতখানা আপনা থেকেই ঝুমকির মাথায় বিলি কাটতে লাগল। আর চোখের বাঁধ ভেঙে জল পড়তে লাগল ফোঁটায় ফোঁটায়। তারপর ধারায়।
০২৫. খোঁচাখুঁচি করা হেমাঙ্গর একটা বদ অভ্যাস
খোঁচাখুঁচি করা হেমাঙ্গর একটা বদ অভ্যাস। এটা যে ভাল অভ্যাস নয়, তাও সে জানে। তবে মানুষ তো অভ্যাসেরই দাস। বিখ্যাত ডেন্টিস্ট অতীন নদীর চেম্বারে তাকে যেতে হয়েছিল রিটার্নের কিছু জরুরি কাগজপত্র আনতে। বিদেশ প্রত্যাগত নদী মস্ত ডাক্তার, তার কাছে সবসময়ে ভি আই পিদের ভিড়। এইসব লোককে কিছু কাগজপত্রের জন্য বা জিজ্ঞাসাবাদের কারণে নিজের অফিসে পারতপক্ষে টেনে আনে না সে। নিজেই চলে যায়। এটুকু পাবলিক সারভিস সে ইচ্ছে করেই দেয়। নদী হয়র্তো বড় বড় ব্যবসায়ীদের মতো মস্ত ক্লায়েন্ট নয়, কিন্তু গুরুতর ক্লায়েন্ট। এর মতো লোক হাতে থাকলে আরও অনেক লোক চলে আসে। সাধারণ মানুষদের স্বভাবই হল, জেনে বা অজান্তে ভি আই পিদের অনুসরণ করা।
উপরন্তু নদী তার অনেকটা বন্ধুর মতোই হয়ে গেছে।
বিকেলে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার দরুন নদীর চেম্বারে ভিড় ছিল না তেমন। নদী শেষ রুগীটিকে বিদায় দিয়ে ব্রিফকেস থেকে দরকারি কাগজপত্র বের করে দিল। তারপর বলল, আচ্ছা মশাই, আপনার দাঁতে কোনও কমপ্লেন নেই?
কমপ্লেন! না তো!
আছে কিনা তা আপনি জানেন?
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, আমার দাঁত আর আমি জানবো না?
নদী হেসে বলে, অত সোজা নয়। দাঁতের কমপ্লেন তৈরি হয় খুব ধীর গতিতে। প্রথমটায় বোঝাও যায় না। যখন বোঝা যায়। তখনও কেউ সহজে ডেন্টিস্টের কাছে আসতে চায় না। যখন ট্রাবল বাড়ে তখন আসে বটে, কিন্তু তখন আর দন্তোৎপাটন ছাড়া চিকিৎসা থাকে না। সাহেবরা কিন্তু নিয়মিত দাঁত চেক আপ করায়। ওটাই উচিত কাজ।
সুন্ধবদের কথা আলাদা। তারা মদ মাংস বেশী খায়। আমার সে অভাস নেই। শেওয়ার আগে আমি রোজ দাঁত ব্ৰাশ কার।
মাঝে মাঝে একটু ক্লিনও তো করে নিতে পারেন। আমার খুব ভাল যন্ত্র আছে, ব্যথা দেবো না।
ক্লিন! তাই বা করাবো কেন? আমি পান-টান খাই না, সিগারেটও নয়।
নদী হাসল, আচ্ছা, ঠিক আছে। তবু একবার দেখে দিলে আপত্তি নেই তো?
হেমাঙ্গ অবাকের ওপর অবাক হয়ে বলে, আরো কমপ্লেন হলে তো আপনার কাছেই আসবো!
নন্দী কথাটায় কান দিল না। একটু সহজাত কর্তৃত্বের ভাব আছে তার। বংশগত অভ্যাসই হবে। কারণ, নন্দীদের একসময়ে বিরাট জমিদারি ছিল। ওর দাদু ছিল রায়বাহাদুর।
রিক্লাইনিং চেয়ারে তাকে বসিয়ে আলো-টালো ফেলে হেমাঙ্গর দাঁত পরীক্ষা করে নন্দী অবশ্য বলল, আরে বাঃ, এ তো সত্যিই পারফেক্ট দাঁত! চমৎকার! শুধু বাঁ দিকে কষের দতে একটা কেরিজ দেখা যাচ্ছে। ওটা সিল করে দিচ্ছি।
ঘুরন্ত উকো দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে নন্দী খানিকটা পুটিং-এর মতো জিনিস ঠেলে দিল।
তারপর বলল, আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
কেন, আমার দাঁতের কি এতই খারাপ অবস্থা যে, ঈশ্বরবিশ্বাসের দরকার হবে!
আরে নাঃ, দাঁত ফার্স্টক্লাস আছে। তবে, এই যে চমৎকার দাঁতের সারি, এটা কি একটা কেমিক্যাল অ্যাকসিডেন্ট? মানুষের শরীর, গরু, মোষ, জীবজন্তু, গাছপালা এসবই অ্যাকসিডেন্টাল বলে আপনি বিশ্বাস করেন? নাকি সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ আছে?
হঠাৎ একথা কেন?
ডারউইন থেকে শুরু করে বড় বড় সায়েন্টিস্টরা কেউই সৃষ্টিতত্ত্বকে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। একটা র্যানডম অঘটন বলে জোড়াতাপ্পি দেওয়া এক্সপ্লানেশন দিচ্ছেন। আপনি কি সেটা বিশ্বাস করেন?
কি বললে আপনি খুশি হবেন? আরে, আপনার কি নিজস্ব কোনও মতামত নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেমাঙ্গ বলে, হিসেবের খাতা থেকে চোখ তোলার সময় পেলে তো ভগবান-টগবান নিয়ে ভাববো! সময়টা কোথায়?
নন্দী ঐ কুঁচকে বলে, তার মানে কি আপনি আমার চেয়েও ব্যস্ত লোক? আমার দুটো চেম্বার, একটা হাসপাতাল আর তিনটে নার্সিং হোেম অ্যাটেন্ড করতে হয়, তা জানেন? তবু আমি সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে ভাববার সময় পাই।
হেমাঙ্গ ফাঁপরে পড়ে বলল, ভগবানের কথা আমার মনেই হয় না যে!
কেন হয় না? এই যে আপনার চারদিকে জমজমাট পৃথিবী, চারদিকে প্রাণের প্রকাশ, এসব দেখে এর পিছনকার প্যাটার্নটার কথা আপনার জানতে ইচ্ছে করে না? এই জড় জগৎ থেকে দুম করে জীব সৃষ্টি হয়ে গেল—আর সেটা সম্ভব করে তুলল মস্তিষ্কহীন, কল্পনাহীন জড়বস্তুই-এটা কি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা।
তা তো মনে হচ্ছে না।
