ফুল! বলে অবাক হয়ে অনীশ আপার দিকে তাকায়, তুমি ফুল এনেছো নাকি? এ তো ভাবা যায় না।
আপা সামান্য লজ্জা পেয়ে বলে, ফুলটা আজ পাগলামি করে কিনে ফেললাম। কাকাবাবুকে একটু ইমপ্রেস করব বলে।
আমি খুব ইমপ্রেসড আপা। থ্যাংক ইউ।
কাকাবাবু, আপনার কি হাঁটাচলা বারণ?
মণীশ মুখটা একটু বিকৃত করে বলল, ডাক্তারদের কথা আমি কিছু বুঝতে পারি না। বলেছে ফুল রেস্ট। তার মানে শুয়ে থাকা কিনা আমি জানি না। তবে আমার এইসব অফশুটরা আমাকে শুইয়েই রেখেছে। এমন কি পাশ ফিরতে অবধি দিচ্ছে না। সাতদিন এভাবে থাকলে আমাকে বোধ হয় পাগলাগারদে পাঠাতে হবে।
আপনার নিজের কেমন লাগছে?
খুব উইক, কিন্তু উঠতে বা একটু-আধটু চলাফেরা করতে কোনও অসুবিধে নেই।
তাহলে উঠে পড়ুন তো! চলুন ডাইনিং টেবিলে বসে একটু কালো কফি খাবেন।
বুবকা ভ্রূ কুঁচকে বলে, খুব ডাক্তার হয়েছো, না? মাথা-ফাতা ঘুরে গেলে কি হবে?
আপা একটা ছোট্ট ধমক দিয়ে বলে, চুপ করো তো! আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে মস্ত এক হার্ট স্পেশালিস্ট থাকেন। আমি প্রায়ই তাকে অ্যাসিস্ট করি। কত কিছু জানি, তুমি ধারণাও করতে পারবে না। রুগীকে রুগী বানিয়ে ফেলে রাখা মানে জানো? বিশেষ করে যারা হার্ট পেশেন্ট! একজরশান না করে যতদূর সম্ভব নরমাল রাখতে হয়। তোমরা কাকাবাবুকে জড়ভরত বানাতে চাও নাকি? আপনি উঠন তো কাকাবাবু।
মণীশের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বলে, তোমার কাকিমারও একটু পারমিশান নিয়ে এসো। নইলে হয়তো রাগ করে কথা বন্ধ করে দেবে। বেশী শুয়ে থাকলে তো বেডসোরও হয়, না? কথাটা কাকিমাকে বোলো, যাও।
একটু বাদে যখন ডাইনিং টেবিলে তারা কফি ইত্যাদি নিয়ে বসল। তখন অপর্ণা বেজার মুখে বলল, আমার বাড়িতে এত অসুখবিসুখ যে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। একজনকে বাড়ি নিয়ে আসতে পারলাম তো মেয়েটা জ্বরে পড়ল। বুকে সাজঘাতিক কনজেশন, জ্বর এখনও নামেনি। এত টেনশন যাচ্ছে।
তার কথাটাকে কেউ কোনও গুরুত্বই দিল না। হয়তো শুনতেই পেল না কেউ। অনু তার বাবার কানে কানে কী বলছে তার খুব হাসছে দুজনে। আপা আর অনীশ খুব নিবিষ্টভাবে ওদের পড়াশুনোর বিষয়ে কিছু বলছে। টেবিলে অপর্না আলাদা এবং একা। কিন্তু বরাবরই কি সে একা নয়? এ বাড়িতে তার তিন ছেলেমেয়ে আর ওদের বাবা যখন একসঙ্গে থাকে তখন অপর্ণা স্পষ্ট বুঝতে পারে, ওরা এক দলে। সে আলাদা। সে আউট অফ দি সার্কল। বর্জিত, অবহেলিত, উপেক্ষিত।
অথচ অপর্ণা কি প্ৰাণপাত করে দিচ্ছে না। সংসারের পিছনে? সে কি খরচ হয়ে যাচ্ছে না, ক্ষয় হচ্ছে না। এই তার আপনজনদের জন্য? ওরা কখনও কেউ কেন গুরুত্ব দেয় না। তাকে? রান্নাঘরের বাইরে কি তার কোনও ভূমিকা নেই?
সে চারজনের দিকেই চাইল। না, তাকে কেউ লক্ষ করছে না। পাত্তা দিচ্ছে না। সে খামোখা বসে আছে। এখানে। খুব হঠাৎ করে অভিমান হল অপর্ণার। নিঃশব্দে সে নিজের কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে এল।
হ্যাঁ, এইটেই তার সঠিক জায়গা। এখানেই তাকে মানায়। ভাবতে ভাবতে চোখে জল এল অপর্ণার। কত ভালবেসে সে বিয়ে করেছিল মণীশকে। কত ভালবাসার ভিতর দিয়েই না এল তাদের তিন সন্তান। টুক-টুক করে বড় করে তোলা ওই তিনজন কেন তার দিকে ফিরেও চায় না? মণীশই কি আজকাল আগের মতো গুরুত্ব দেয় তাকে? খুব ভাল হয় এখন যদি অপর্ণা মরে যায়। তাহলে ওরা হাড়ে হাড়ে বুঝবে অপর্ণা কে ছিল, কী ছিল ওদের সংসারে।
কেন যে তার মতো বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মহিলার আজকাল এত অভিমান হয়! কেন ষে সহজেই চোখে জল চলে আসে! অপর্ণা তার টলটলে জলভরা চোখে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তেতো পৃথিবীটার দিকে চেয়ে রইল। উথলানো ডালের জল পড়ে গ্যাস নিবে যাচ্ছে, তবু গা করল না।
ক্ষীণকণ্ঠে একটা ডাক বাতাসে পাখির ডাকের মতো ভেসে এল, মা!
রান্নাঘরের পাশেই ঝুমকির ঘর।
ডাকটা শুনল অপর্ণা। নড়ল না। ডাকুক গে।
আবার ডাকটা এল, মা! ও মা!
অপর্ণা চোখ মুছে গম্ভীর মুখে দরজায় এসে দাঁড়ায়, কী বলছিস?
ঝুমকি একেই রোগা। অসুখে যেন বিছানায় মিশে গেছে। নিজের মাথাটা চেপে ধরে বলে, একটু কাছে এসে বসবে?
কেন?
এসো না। কাছে একটি বোসো। আমার কাছে কেউ কেন কখনও আসো না বলো তো!
কাকে চাই? অপর্ণ গম্ভীর গলাতে বলে।
তোমাকে।
অভিমানটা এবার ফেটে পড়ল জল-বেলুনের মতো, আমাকে! আমাকে আর তোমাদের কী দরকার? আমি তো এ বাড়ির কাজের লোকের চাইতে বেশী কিছু নয়।
ঝুমকি রোগা মুখে এবার হাসল, ঝগড়া হয়েছে বুঝি!
মোটেই ঝগড়া হয়নি। কী দরকার বলো, গ্যাসে রান্না চড়ানো।
গ্যাস নিবিয়ে দিয়ে এসো।
অত সময় নেই। বরং তোমার বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।
বাবা! বাবা কি উঠেছে?
বাইরের ঘরে বসে চা খাচ্ছে।
ঝুমকির মুখটা আলো হয়ে গেল, গুড নিউজ মা। তাহলে তোমার মুখ ওরকম ভার কেন?
মোটেই ভার নয়। কাজ আছে। তোমার বাবাকে ডাকছি।
বাবাকে আকণ্ঠ ভালবাসে ঝুমকি। বোধ হয় একবার ইচ্ছে হল, বাবাকে ডাকিয়ে আনার। কিন্তু ইচ্ছেটা সংবরণ করে বলে, না, বাবা নয়। তুমি এসো একটু।
বলছি না, রান্নাঘরে এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত। ওই বোধ হয় ডালের জল পড়ে গ্যাস নিবে গেল। গ্যাসের গন্ধ আসছে।
রান্নাঘরে গিয়ে ছোট ঝামেলাটা সামলাতে সামলাতেই আরও দুবার ঝুমকির ডাক শোনা গেল। আর পারে না। অপর্ণ। সুমকির কাছে এসে কপালে হাত দিয়ে বলল, জ্বরটা কি আছে? আমার তো জল-হাত, বুঝতে পারছি না।
