ও বাবাঃ! মরে যাবো যে!
আপা মাথা নেড়ে বলে, কিছু হবে না। প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা আলাদা গল্প। যত জানবেন তত মজা। মিন্টো পার্কের কাছে দেখবেন যখন ট্র্যাফিকে গাড়ি থামে। তখন একটা লোক রেড ক্রসের কোটো ঝাকিয়ে পয়সা চায়। আর একটা লোকও এ কাজ করে চৌরঙ্গীর মোড়ে। আমি দুজনকেই পাকড়াও করেছিলাম। ওরা কেউ রেড ক্রসের লোক নয়। আসলে ওভাবেই ভিক্ষে করে। এ দেশে যার যা আছে বা নেই। সবাই সেই আছে বা নেইকে একটা ব্যাপারেই লগ্নি করতে চায়। সেটা হল ভিক্ষে। যার একটা হাত নেই সে সেই নেইটাকে ভিক্ষের কাজে লাগায়। ভিক্ষে করতে কে আমাদের শেখাচ্ছে জানেন? আমাদের সরকার। সরকার নিজেই পৃথিবীতে সবচেয়ে নির্লজ্জ ভিখিরি। এ দেশে। কত সম্পদ আছে, কোথায় কী পাওয়া যায়, আমাদের সত্যিকারের অভাব কতখানি তা কেউ খুঁজে দেখেনি আজ অবধি। খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে, আমাদের দেশে রিসোর্সের অভাব নেই। শুধু খুঁজে দেখা হয়নি, এই যা।
মণীশ চোখ বুঝে কিছুক্ষণ ভোবল। তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, অথচ তোমার তো আঠেরোর বেশী বয়স নয়, তাই না। আপা?
আপা সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি একটু বেশী পাকা, না কাকাবাবু? আমার মাও সেই কথাই বলেন।
এ বয়সে এতটা ভার মাথায় নিয়েছে, তোমার সাহস তো সাজঘাতিক।
আমি আরও অনেক বেশী ভার নিতে চাই।
তুমিই বোধ হয় আমাদের ভাবী প্রধানমন্ত্রী!
ঠাট্টা করছেন কাকাবাবু?
না। আপা, ঠাট্টা করছি না। তুমি আমাকে সবসময়েই অবাক করে দাও। এইসব কথাগুলি তোমাকে কেউ শেখায়নি তো। আপা? তুমি কি নিজে ফিল করো?
খুব ফিল করি। কাকাবাবু। এত বেশী করি যে, আমার জীবনে একটুও শান্তি থাকে না। মাথা এত গরম হয়ে যায় যে, রাতে ঘুম আসতে চায় না।
মণীশ দুঃখিত মুখে বলল, তোমার তুলনায় আমার ছেলেমেয়েরা কত নাবালক আর নাবালিকা রয়ে গেছে।
আপা গম্ভীর মুখ করে বলে, আজকাল সব ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলারাই নিজেদের ছেলেমেয়েকে বোতলবন্দী করে রাখতে চায়। তাদের দোষও নেই। সমাজে নানারকম দূষণ বাড়ছে তো। কিন্তু মুশকিল হল, চারদিকে দূষণ বেড়ে গেলে তার কিছুটা ঘরের মধ্যেও ঢুকে পড়বেই। ঘরের পাশে বেড়াল মরে পড়ে থাকলে ঘরে পচা গন্ধ আসবে না? আবর্জনা জমে থাকলে মশা মাছি তো তার কিছুটা ঘরেও ছড়িয়ে দিয়ে যাবে। যাবে না, বলুন?
হ্যাঁ আপা।
আমাদের বাড়ির কাছেই একজন মাতাল থাকে। মদ খেলেই সে ভীষণ গালাগাল করে। কখনও একে, কখনও ওকে। আমাদেরও মাঝে মাঝে গালাগাল করেছে। আমরা নাকি তামিলনাড়ু থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গকে লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছি। আমার মা আর বাবা ভয় পেয়ে ওদিককার জানালা বন্ধ রাখত। কিন্তু আমি বুঝলাম, ওটা কোনও প্রতিকার নয়। আমি সেই মাতালটার সঙ্গে আলাপ করে ফেললাম। সে বস্তির লোক, গরিব, চোর এবং রাগচটা। প্রথমটায় ভোব করতে চায়নি, সন্দেহ করেছিল। তার বউ, ছেলে আর মেয়েরাও একটু কেমন যেন অ্যাগ্রেসিভ টাইপের। তবু আমি লেগে রইলাম। এক মাস ধরে রোজ গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করতাম, জিজ্ঞেস করতাম তারা কেমন আছে। একটু একটু করে ভাব হয়েই গেল। আমি লোকটার কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছি, সে কেন সবাইকে গালাগাল করে। লোকটা জবাব দিতে পারেনি। তখন বুঝতে পারলাম, ওর রাগটা বিশেষ কারও ওপর নয়। ওর মনটাই বিগড়ে গেছে। মদ খেলেই ভিতরের নানারকম জমেথাকা বিষ গালাগাল হয়ে বেরিয়ে আসে। তখন আরাম পায়। খুব সহজ লোক, ওকে বুঝতে অসুবিধে হয় না। এখন সে আমার খুব বন্ধু।
তাকে মদ ছাড়াতে পেরেছো?
আপা মাথা নাড়ে, না কাকাবাবু। ওটা ছাড়া সোজা কথা নয়। চেষ্টা করছি। বিষ-মদে কত মানুষ মারা যায়। সে সব বলেছি। কিন্তু ওরা তো বিষকে ভয় পায় না, মরে যাওয়াকেও নয়। কিভাবে ছাড়াবো বলুন তো!
তা বটে।
তবে এখন আর গালাগাল দেয় না। ঘরে বসে মাতাল অবস্থায় গজগজ করে খানিকক্ষণ, তারপর ঘুমোয়।
তোমার মতো বুকের পাটা কম মানুষেরই আছে। আমার বাসার পাশেই তো বস্তি, কই আমার তো কখনও ওখানে ঢোকার ইচ্ছেই হয়নি।
ওটাই তো আমাদের মুশকিল। আমরা সব জায়গা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিই, প্রত্যাহার করে নিই। মনে ভাল ভাল ইচ্ছে থাকে, কিন্তু সেগুলো করি না।
তুমি কি আমাকে বকিছো?
না তো কাকাবাবু! ছিঃ, বকিবো কেন? আপনি দারুণ মানুষ একজন।
বকলেও দোষ নেই আপা। তুমি যে খুব নতুন কথা বলছে তা নয়, কিন্তু যেটা বড় কথা তা হল, তুমি যা বলো তা প্র্যাকটিসও করো। আমরা করি না।
আমি আপনাকে অনেকক্ষণ যন্ত্রণা করছি।
না না, আমার খুব সেলফ পিটি হচ্ছে ঠিকই, তবে তোমার কম্পানি খুব ভালও লাগছে। ডোরবেল বাজল নাকি? ওই বোধ হয় বুবকা এল!
বুবকাই। সাদা টি শার্ট, কালো শর্টস, পায়ে দৌড়োনোর জুতো। ঘর্মাক্ত, হাঁফাচ্ছে। ঘরে ঢুকেই মণীশের দিকে চেয়ে বলে, কেমন লাগছে। বাবা? আরে আপা! কখন এলে?
অনেকক্ষণ। বকে বকে কাকাবাবুর মাথা ধরিয়ে দিলুম।
অনীশ এসে সাবধানে তার বাবার বিছানায় একটু আলগোছে বসল। পাছে ধাপ করে বসলে খাটের ঝাঁকুনিতে হাৰ্টবিট বেড়ে যায়। মণীশের। তারা সবাই এখন অত্যধিক বাবা-সচেতন। মণীশের হাতটা নিজের সবল হাতে ধরে নাড়ীটা একটু বুঝবার চেষ্টা করল সে। তারপর বলল, মনে হয় সবই ঠিক আছে, না বাবা?
মণীশ ছেলের মুখের দিকে তৃষ্ণার্তা চোখে চেয়ে থেকে বলে, ঠিকই আছে। ভাবছিস কেন? আপা কত ফুল নিয়ে এসেছে দেখ, তোর মাকে বল সামনের ঘরে সাজিয়ে রাখতে।
