মণীশ ফুলের গোছাটা নিয়ে একটু গন্ধ শোকার চেষ্টা করে বলে, এসব ভদ্রতা আবার করতে গেলে কেন? তুমি তো আমার মেয়ের মতোই। আচ্ছা, কলকাতার রজনীগন্ধায় গন্ধ থাকে না কেন বলো তো! রজনীগন্ধায় তো বেশ চড়া গন্ধ হওয়ার কথা।
বাসী ফুলে কি গন্ধ থাকে বলুন! কলকাতায় ঢুকলেই সব জিনিসের গন্ধ হারিয়ে যায়, গুণ হারিয়ে যায়, চরিত্র হারিয়ে
মণীশ খুব হাসল, বলল, তুমি রীতিমতো ফিলজফার হয়ে উঠছে দিনকে দিন। তোমার নতুন অ্যাডভেঞ্চার এখন কী হচ্ছে বলো তো!
আপা একটু কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, হল না তো। আমি এভারেস্ট এক্সপিডিশান যাওয়ার একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। ওরা জবাবই দিল না।
কারা?
একটা দেশী দল।
তুমি কখনও পাহাড়ে উঠেছো?
না তো! কিন্তু সুযোগ দিলে প্রথম বারেই ঠিক উঠে যেতাম।
উঃ, কী পাগল তুমি!
আমি সবসময়ে বড় কিছু করার কথা ভাবি। আমার মনে হয়, পৃথিবীর যে কোনও শক্ত কাজই আমি পেরে যাবো। কিন্তু বাড়ির আর সবাই কোথায়? কাকিম, অনীশ, অনু, ঝুমকি দিদি! এখন সকাল আটটা বাজছে। বাড়ি চুপচাপ কেন?
বুবকা বোধ হয়। সকালে জগিং করতে গেছে। ঝুমকির জুর। অনু একটু বেলা অবধি ঘুমায়। আর কাকিমাকে বোধহয় টয়লেট বা রান্নাঘরে পাওয়া যাবে।
বুবকা জগিং করছে শুনে খুশি লাগছে। ও আপনাকে এত ভালবাসে যে, আপনার অসুখের সময় ও একদম পাগলামতো হয়ে গিয়েছিল।
জানি। হি ইজ নট গ্রোয়িং টু অ্যাডাল্টহুড। একদম শিশুকাল থেকে আমার ন্যাওটা। আমি যদি হঠাৎ মারা-টারা যাই তাহলে যে ওর কী হবে!
আপনি ওকে কেন এত দখল করে আছেন কাকাবাবু? সেই জন্যই তো ও এত পলকা, টক করে ভেঙে যায়।
মণীশ এবার হাসল না। মাথাটা নেড়ে বলল, ঠিক বলেছো। ছেড়ে দিতে ইচ্ছেও করে, আবার ভয়ও পাই। সমাজটা কি রকম তা তো জানো। ড্রাগ, গার্লস, মদ, খারাপ লোক। তার ওপর পলিটিক্স আছে, গুণ্ডামি আছে, সন্ত্রাস আছে, অ্যাকসিডেন্ট আছে।
এবার আপা হাসে, ওইসব ভেবে ভেবেই বুঝি আপনার অসুখ হল! সমাজটা খারাপ বটে, কিন্তু আমাদের তো এর মধ্যেই ঝটপট দিয়ে, একটু সাফসুরত করে থাকতে হবে! নাকি!
তুমি খুব স্বাধীন, না?
আমাকে কে আটকে রাখবে বলুন! আমার বাবা সকাল থেকে রাত অবধি টাকা রোজগার করে। মার সারাদিন পুজোপাঠ। আমার দুটো দাদা ক্যারিয়ার নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। আমি একটু একা, তাই স্বাধীন। সারা দিন শহর চষে বেড়াই, অবশ্য যখন স্কুলটুল থাকে না।
অত ঘুরে বেড়াও তাহলে এত ভাল রেজাল্ট করো কী করে?
হয়ে যায়। আমি বেশী পড়িও না। যখন পড়ি তখন গল্পের বই-ই বেশী পড়ি।
তুমি যে আমার কাছে একটা বিস্ময়, সেটা জানো?
আপা হাসল, বন্ধুরা অনেকে ওকথা বলে। আসলে আমি তো ক্যারিয়ারের কথা ভেবে পড়ি না। পড়ি প্রাশন থেকে। তাই একবার পড়লেই সব বুঝে যাই।
তোমার মাথা তাহলে খুবই পরিষ্কার।
খুব মাথা নেড়ে। আপা বলে, মোটেই তা নয় কাকাবাবু। আমার মাথায় যে রাজ্যের আজেবাজে চিন্তা। আমি সব সময়ে ভাবি। আর ঘুরি। ঘুরি। আর ভাবি।
এত ঘোরো কেন আপা?
আমি দেশটাকে বুঝবার চেষ্টা করি। এত দুঃখী মানুষ আর কোনও দেশে নেই। ভাতে দুঃখী, ভাবে দুঃখী, চিন্তায় দুঃখী, কল্পনায় দুঃখী, কাজে দুঃখী। আমি বুঝবার চেষ্টা করি।
তুমি দারুণ মেয়ে। একদিন কি তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী-টন্ত্রী হবে নাকি? হলে আমি অবাক হবো না কিন্তু।
দূর! প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী হবে? মন্ত্রী-টন্ত্রীরা কি এসব লোকের কাছাকাছি আসতে পারে? তারা তো এসকর্ট নিয়ে ভি আই পি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রধানমন্ত্রী হলে আমি মরেই যাবো।
তাহলে কি মাদার টেরিজার মতো হতে চাও?
সবেগে মাথা নেড়ে। আপা বলে, মা টেরিজার কথা মনে হলেই আমি ভারি লজ্জা পাই।
মণীশ অবাক হয়ে বলে, লজ্জা পাও! কেন বলো তো?
লজ্জা পাবো না? মা টেরিজা একজন মেমসাহেব। কতদূর থেকে এসে তিনি কলকাতায় দুঃখী আতুরের সেবা করছেন, তাই না? সাহেবদের সঙ্গে আমরা কোন ব্যাপারেই পারি না। অলিম্পিকে পারি না, বিজ্ঞানে পারি না. শিল্পে পারি না, সভ্যতায় পারি না, কিন্তু সেবাটুকু তো পারতে পারতাম! তাই না কাকাবাবু? সেবা তো সহজ কাজ ছিল, তার জন্ম গায়ের জোর, কসরৎ বা মেধার দরকার হয় না। কিন্তু সেটাও একজন মেমসাহেবের কাছ থেকে শিখতে হচ্ছে কেন? আসলে শিখছিও না, মা টেরিজা নিজের কাজ করে যাচ্ছেন, আর আমরা আমাদের মতো দিব্যি শুয়ে বসে আছি।
বিষণ্ণ মুখে মণীশ বলে, তুমি বোধ হয় ঠিকই বলছে আপা। এ দেশের জন্য কারও কিছু করার নেই।
ওটা কথা নয় কাকাবাবু। আসলে দেশটাকে বুঝে ওঠাই খুব শক্ত। কেউ তো সে কাজ করেনি; বুঝতে হলে গোটা দেশটা পায়ে হেঁটে ঘুরতে হবে। প্রত্যেক জায়গার লোকজনকে চিনতে হবে, শুনতে হবে অনেকের অনেক দুঃখ আর সমস্যার কথা। অনেক সময় লাগে, অনেক কষ্ট করতে হয়। কার মাথাব্যথা আছে বলুন!
মণীশ এই বাচ্চা মেয়েটার দিকে শ্রদ্ধাপুত চোখে চেয়ে থেকে বলে, এর চেয়ে অবাক-করা কথা আমি বহুকাল শুনিনি। তোমার মধ্যে দারুণ প্যাশন আছে আপা। তুমি বোধ হয় একটা কিছু করবে। খুব বড় কিছু। অল মাই গুড উইশেস।
আপা লাজুক হেসে বলে, কাকাবাবু, শুভেচ্ছা খুব ভাল। আরও ভাল কী জানেন?
কী বলো তো! আবার বোধ হয় তুমি চমকে দেবে আমাকে! মনে রেখো, আমার হার্ট কিন্তু জখম। এমন কিছু বোলো না যাতে হার্ট ডিগবাজি খায়।
আপা খুব হাসল। বলল, না, সেরকম কিছুই নয়। আমি বলতে চাই শুভেচ্ছার চেয়ে বেশী দরকার সহযোগিতা। কোঅপারেশন। আমার সঙ্গে একদিন পায়ে হেঁটে ঘুরবেন?
