তা অবশ্য ঠিক। তবে কিনা
দাঁড়াও। তোমার মতো অতটা না জানলেও আমি কিন্তু রামায়ণ মহাভারত অনেক শিখেছি। পৌরাণিক পালার পার্ট করি। অনেক ভাল কথা জানা আছে। আমাকে যা খুশি বোঝাতে পারবে না।
নিমাই সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে বলে, সে আর বলতে! তুমি অনেক শিখেছে। এ কদিনে।
তাই বলছি, কলিযুগের ধর্মটা হল বেঁচে থাকা। তাই নয়?
নিমাই মাথা চুলকে বলে, প্রথমেই বড্ড পায়তারায় ফেলে দিলে। আসল কথাটায় আসছে না।
আসল কথাটা তোমার মাথায় ঢোকাতেই আজ বাসর বসিয়েছি। বুঝলে?
বুঝেছি। এবার বলো।
বলি, ওরকম সাধু-সাধু ভাব করে থাকলে কি আমাদের পেট চলবে? নাকি টিকে থাকা যাবে?
টিকে তো আছি। চালেও যাবে। দোকানটা বসাতে পারলে আর চিন্তা নেই। এখানে সবাই আমাকে ভাল লোক বলে জানে।
বীণা একটু হেসে তরল গলায় বলে, তুমি কেমনতরো ভাল লোক? তোমার বউ তো যাত্ৰা থিয়েটার করে বেড়ায়। তাহলে তুমি ভাল লোক হলে কিভাবে? লোকে বলে, তুমি একজন যাত্রাওয়ালীর স্বামী। আর সবাই জানে যাত্রাওয়ালীর স্বামী মানেই একটা মেরুদণ্ডহীন লোক।
নিমাই একটু চুপ করে থেকে হতাশ গলায় বলে, কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। তবে বাজে লোকের কথায় কিই বা আসে যায় বলো।
বাজে লোক হোক, আর যাই হোক, লোকে বলে তো?
লোকের মুখ বন্ধ করতে চাও নাকি?
চাই। আমার অভিনয়ের নেশা আছে বটে, এরকমভাবে আর থাকতে ইচ্ছে করে না। একটু ভালভাবে থাকলে বেশ হত।
নিমাই মাথা চুলকে বলে, প্রসঙ্গটা ধরতে পারছি না। কলিযুগ নিয়ে শুরু করেছিলে। কথাটা কোথায় দাঁড়াল?
আমার মাথায়। আচ্ছা হাঁদারাম বাবা!
নিমাই ভারি। কাচুমাচু হয়ে বলে, কথাটা যে বড্ড সাঁটে বলছো। ভাল করে বুঝতে পারছি না। জানোই তো, আমি বড় বোকাসোকা মানুষ।
অত বোকা হলে কি কাজ হয় বাপু? কলিযুগটা বোকাদের জন্য নয়।
তাই দেখছি।
শোনো, এ যুগে একটু পাপ-টাপ করলেও ভগবান ক্ষমা করে দেন। বুঝতে পারলে?
নিমাই পারল। উজ্জ্বল হয়ে বলল, তা ক্ষমা করবেন না কেন? তিনি যে পতিতপোবন! পাপীকে উদ্ধারের জন্যই আসেন। তবে কথাটা হল, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। পাপ করলে লোকে পথভ্ৰষ্ট হয়। প্ৰায়শ্চিত্ত হল পুনরায় চিত্তে গমন।
ও বাবা! প্ৰায়শ্চিত্তের কথা আসছে কেন?
আসবে না? পাপ করলে অনুতাপ, খ্যাপন এইসব করতে হয়।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আচ্ছা, এই যে আমি যাত্ৰা-টাত্ৰা করি, এটাও তো পাপা! নাকি?
নিমাই একটু ধন্ধে পড়ে বলে, পাপ করলেই পাপ। নইলে নয়।
ধরো যদি আমি লটারিতে টাকা পাই, সেটা কি পাপ?
না তো! পেয়েছো নাকি?
না গো! তবে যদি ওরকমই কোনও পড়ে।-যাওয়া টাকা কখনও পেয়ে যাই, তাহলে কি সেটা নেওয়া অধৰ্ম হবে? তোমার মন কি বলে?
নিমাই ফাপড়ে পড়ে বলে, এ তো গাছের মগডালে জল। টাকাটা পাচ্ছে কোথায়?
ধরো, যদি পাই?
আমি তো বাপু কিছু বুঝতে পারছি না। বড্ড গণ্ডগোলে ফেলে দিচ্ছে। আমাকে!
আমি তোমার আপনজন তো!
একশোবার।
কথাটা মনে রেখো। পাপে-তাপে, দোষে-ঘাটে, আমি কিন্তু সর্বদাই তোমার আপনজন।
খুব ঠিক কথা।
আমাকে কখনো ঘেন্না কোরো না পাপী বলে।
শোনো কথা! বলে নিমাই খুব হাসল।
সে রাতে বেশ একটু ভালবাসাবাসি হয়েছিল তাদের মধ্যে। একটু বেশী মাখামাখি। কিন্তু বীণা তবু সাহস করে কবুল করতে পারেনি। নিমাইয়ের ওপর সে নির্ভর করতে পারে না। বড্ড ভয় হয়। লোকটা ধর্মভীরু, লোকটা বড় দুর্বল। এসব লোক ভাল হলে কি হয়, এরাই বিপদ ডেকে আনে।
আজ বর্ষাকাতর দিনে, তিন দিন বাদেও বীণা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তার সামনে সবটাই ভারি আবছা, ভারি সন্দেহজর্জরিত। বুকে বুকজোড়া ভয়।
তার কি বুকের ব্যামো দাঁড়িয়ে যাবে?
নিমাই মুখ ফিরিয়ে বলল, ড়ুবল গো!
কী ড়ুবল?
আর এক আঙুল বাকি। জল ঢুকছে।
হাঁড়িকুড়ি, বাক্স-প্যাঁটরা যেটুকু আছে তাদের সব ওপরে তোলা, উনুন জ্বলেনি। বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ড়ুবুক। সব
০২৪. কাউকে কোনও উপলক্ষে ফুল দেওয়া
কাউকে কোনও উপলক্ষে ফুল দেওয়া একদম পছন্দ নয়। আপার। একমাত্র পুজোর সময় ছাড়া। ঐ একটা ব্যাপারে তার দুর্বলতা আছে। তবে ঠাকুরপুজোয় ফুলও খুব বেশী দেওয়া উচিত বলে সে মনে করে না। সামাজিক অনুষ্ঠান বা শোকের সময় যে সব ফুল ও মালা দেওয়ার প্রথা আছে সেটা তার কাছে ফুলের অপমান বলে মনে হয়। তবু আজ। আপা এক গোছা রজনীগন্ধা নিয়ে অনীশদের বাড়িতে এল সকালে।
কাকাবাবু, আপনি তো খুব ভাল আছেন দেখতে পাচ্ছি। একদম যুবক দেখাচ্ছে আপনাকে!
মণীশ হেসে বলে, থাক, আর তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলতে হবে না।
আপা এ বাড়িতে আলো-হাওয়ার মতো অবারিত আসে যায়। একখানা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসে বলল, আমি মিথ্যে কথা বলতে পারি না যে!
মণীশ এ মেয়েটিকে খুব পছন্দ করে। মমতা মাখানো চোখে মেয়েটির রোগা মুখখানার দিকে চেয়ে বলল, মিথ্যে বলো না তা জানি। তবে ভুল দেখছো। কয়েকদিনেই তো আমার মনে হচ্ছে বুড়িয়ে গেছি।
একদম নয়। শুনুন, শরীরবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছমাংস না খেলে এ রোগটা কম হয়। আপনি ননভেজ ছেড়ে আমার মতো পুরো ভেজ হয়ে যান।
মণীশ হাসল, সেটা পরে ভেবে দেখব। এখন ডাক্তার কড়া হুকুম দিয়েছে, রোজ একটা করে ছোট্ট মুগীর সুরুয়া খেতে হবে।
মুর্গীদের কপাল খারাপ!
আচ্ছা, তোমার হাতে ফুল কেন? কোথাও যাচ্ছ ফুল নিয়ে!
জিব কেটে আপা বলে, এ মা, এ তো আপনার জন্যই এনেছি। অভ্যাস নেই বলে দিতেই ভুলে গেছি। এই নিন।
