কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে বীণা। মাথাটা এমন হয়ে আছে যে, পরিষ্কার করে কিছু ভাবতেই পারছে না। তার মন প্রম্পটারের মতো বলছে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। কাজটা ঠিক হচ্ছে না।
বীণা শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করতে পারল, অনেক কষ্ট করে বলতে হল যেন। ধরা গলায় বলল, তাহলে কি হবে। কাকা?
কাকা তার দিকেই চেয়ে ছিল। বলল, সেটা নিয়েই তো ভাবছি। তবে ঝঞাট তো আর চিরকাল থাকবে না। এই দেখ, এবার নিজে পালা লিখছি। মনের মতো করে। খুব জাকজমক করে নামাবো। প্রথম শো করব কলকাতায়। কলকাতাকে দেখিয়ে দিতে হবে যে, মফস্বলেও ভাল জিনিস হয়।
কথাগুলো বীণার কানে ঢোকে, কিন্তু তাকে চেতিয়ে তুলতে পারে না। সে বিহ্বলভাবে চেয়ে থাকে শুধু। কাজটা সে ভাল করছে না। তার জন্যই যদি খুনখারাপি হয় তবে সেই পাপ কি তাকেও অর্শাবে না? তার চেয়েও বড় কথা, পল্টু যদি বলে দেয়? পল্টু যদি শক্ৰতা করে?
বীণা দুর্বল শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, আসি কাকা।
এসো। কয়েকদিন বিশ্রাম করে শরীরটা ঠিক করে নাও। আট দশ দিন বাদে রিহার্সাল শুরু হবে।
বীণা বেরিয়ে আসে। রাস্তায় পড়ে একটু এগিয়ে যেতেই পল্টুর লটারির দোকানটা চোখে পড়ে। লোডশেডিং-এ হ্যাজাক জেলে বসে আছে। দু-তিনটে ছেলেছোকরা আড্ডা দিচ্ছে।
পা ভারী লাগছিল বীণার। পল্ট শক্রিপক্ষের লোক কিনা তা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু দিদি বলে ডাকে, ভদ্র ব্যবহারও করে। আবার এমনভাবে তাকায় যে, নানা সন্দেহে বুকটা দুরদুর করে ওঠে বীণার।
একটু দূর থেকেই বীণা অভিনয়ের গলায় বলল, এই পল্টু!
পল্টু হাজাকের আলো থেকে অন্ধকারে ভাল দেখতে পেল না তাকে। চোখটা হাত দিয়ে আড়াল করে বলল, কে! বীনাদি?
হ্যাঁ।
কি খবর?
খবর তো তোর কাছে। আমার টিকিটে প্রাইজ উঠেছে কিনা দেখেছিস?
পটু হাসল, তোমার আর লটারির প্রাইজের দরকার কী?
বীণার কয়েক সেকেন্ড লাগল কথাটা বুঝতে, তারপর হঠাৎ তার মনে হল, এ-কথাটার দু নম্বর একটা অর্থ আছে। বুকটা কেঁপে গেল। গলাটা শুকিয়ে গেল।
পল্টু খুব হালকা গলায় বলল, আর একটা টিকিট নেবে? এক কোটি টাকা প্ৰাইজ। খেলা পরশু!
না, আজ নয়।
ছেলেগুলো না থাকলে বীণা পটুর সঙ্গে একটু কথা বলত। আর কথা বাড়াল না সে, বাড়ি ফিরে এল। তখন নিমাই ঘরে ছিল না। বীণা ঘরে এসে আলো জ্বেলে ঠাকুরের আসনে একটু ধূপ দীপ জেলে, জল বাতাসা দিয়ে চুপ করে বসল। বিছানায়। অনেক ভাবতে হবে তাকে এখন। ভেবে একটা কিছু ঠিক করতে হবে।
বীণা চোখ বুজে। সব ঘটনাটা মনে মনে ঝালিয়ে নিল। বৃষ্টির মধ্যে পগার আসা, চলে যাওয়া। তারপর তার খুনের খবর। তারপর অনেক কিছু। সেই থেকে বীণার জীবনে শান্তি নেই। বুকে শব্দ হয়, মনে সবসময়ে ভয়-ভয় ভাব। তার তেমন অন্তরঙ্গ আর বিশ্বাসী কেউ যদি থাকত, তাহলে তাকে সব বলে, পরামর্শ নিতে পারত বীণা। কিন্তু কেউ নেই তার। নিমাই আছে বটে। কিন্তু ও বড় বেশী সৎ আর বোকা। শুনলেই চোঁচামেচি করবে, ভয় খাবে, টাকা ফিরিয়ে দিতে বলবে। কে জানে, হয়তো পাঁচজনকে বলেও বেড়াবে।
সেদিন কলকাতায় গিয়ে বড়দাকে পেলে খুব ভাল হত। বিদেশী টাকা দিয়ে স্বদেশী টাকা নিয়ে আসতে পারত। তা ठूल क्रा।
এখন তার কী করা উচিত? কাকাকে যদি বাঁচাতে হয় তবে বান্ডিলটা তার ফেরত দেওয়া উচিত। গল্প একটা বানিয়ে বললেই হবে। তাই কি করবে। বীণা?
তার ততদূর হিসেবনিকেশ জানা নেই, যাতে কত ডলার। আর পাউন্ডে কত টাকা হয়, তা হিসেব করে দেখবে। আসলে কত পাউন্ড আর ডলার বান্ডিলে আছে তাই সে আজ পর্যন্ত ভাল করে গুনে দেখেনি। তবে অনেক আছে। ভাঙালে যা হবে তাতে সারা জীবন চলে যাবে বীণার। শুধু চলেই যাবে না, আরও কিছু বেশীই ভাল থাকতে পারবে তারা। কাকার হাত-তোলা হয়ে, অন্নদাস হয়ে থাকতে হবে না। তাদের। উদ্ধৃবৃত্তি শেষ হবে।
নিমাই একটু বেশী রাতেই ফিরল। হাবড়ায় গিয়েছিল। কীর্তন করতে। ভাত খেতে বসে বলল, আজ তোমাকে খুব ভাবিত দেখাচ্ছে।
ভাবিত! তাহলে আমার মুখের দিকে তাকাও মাঝে মাঝে?
নিমাই হেঁ হেঁ করে বিনয়ী হাসি হেসে বলে, শোনো কথা! তোমার চন্দ্ৰবদনটি ছাড়া আর কোনও মেয়েমানুষের মুখের দিকে তাকাই নাকি কখনও?
মাঝে মাঝে তাকালেই পারো। কেউ তো বারণ করবে না। তাতে একঘেয়েমিটাও কমবে।
খুব হাসল নিমাই। হেসে-টেসে বলল, এ মুখ কি একঘেয়ে হয়। কখনও! নিত্যি নতুন লাগে যে।
ভালবাসারই কথা, তবু বীণার ভিতরটা যেন রি-রি করে কথাটা শুনে। বলে, আর মুখের গুণ গাইতে হবে না। খাও। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
নিমাই একবার বীণার মুখের দিকে চেয়ে বলে, খারাপ কথা নাকি? গুরুচরণ কিছু?
ধরো তাই।
নিমাই খেয়ে উঠল। আঁচিয়ে এসে বিছানায় মশারির মধ্যে বসল। দুজন।
নিমাই মুখখানা খুব গন্ত্রীর করে বলল, বলো বীণাপাণি।
বীণা নিমাইয়ের দিকে চেয়ে রইল। হ্যারিকেনের আলোয় মুখটা খুব আবছা। কিন্তু ওই মুখ এবং ওই মুখের পিছনে চরিত্রটাকে বীণা খুব ভাল করে চেনে।
একটু আদুরে গলায় সে বলে, আচ্ছা, এটা যে কলিকাল তা তো জানো!
নিমাই হেসে বলে, শোনো কথা! এটা কোনও গুরুচরণ ব্যাপার হল?
দাঁড়াও, কথাটা তো এখনও ফেদে বসিনি। বলছি, তুমি কলির ধর্ম মানো কিনা!
কলির তো ধর্ম নেই। সবই অধর্ম। দু চারজন যারা ধাৰ্মিক, কলির শেষে তারাই টিকে থাকবে, বাদবাকি সব ফৌত হয়ে যাবে।
ফৌত একদিন সবাই হবে। সাধুও হবে, চোরও হবে। সত্য ত্রেতায় কি কেউ মরেনি নাকি?
