এই শান্ত বিভোর চেহারাটা দেখে বোঝাও যাবে না যে, এর একটা অন্য চেহারাও আছে। সেই চেহারাটা কেমন তা অবশ্য বীণাবাণি জানে না। জেনে কাজও নেই। এই বিভোর চেহারাটাই সে মনে রাখতে চায়। অন্য চেহারাটার কথা ভাবলে তার ভয় করে। সেদিন ভোরবেলায় তার বাড়িতে গিয়ে যখন দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিল কাকা, তখন সেই অন্য চেহারার একটা ছায়া দেখেছিল বীণা। ধরা পড়লে কাকা তাকে কী করত? মারত? তাড়িয়ে দিত? ভগবান বাচিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন। কিন্তু তার পরও কয়েকটা দিন সে কাকার মুখোমুখি হলে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেছে।
কাকার সামনে একটা বেঞ্চে বসে বীণা চুপ করে চেয়ে ছিল।
কাকা খাতা থেকে মুখ না তুলেই বলে, কি খবর বীণা?
খবর আর কি? পালা কবে নামবে তাই ভাবি। বসে বসে আর ভাল লাগছে না।
কাকা মৃদু গলায় বলে, সময় হোক। এই বাদলার সময়টায় আমাদের খুব আকাল।
তা জানি। এ সময়টায় অন্য কোনও কাজ পেলে হত।
কেন, তোমার কি ঘরসংসারের কাজ নেই?
বীণা একটু লজ্জা পেয়ে বল, গরিবের সংসারের আর কত কাজ থাকবে বলো তো!
ছেলেপুলে হোক, তখন দেখবে কাজ করে কূল পাবে না।
বীণা মুখটা ঘেন্নায় ফিরিয়ে নিল। ছেলে।পুলের কথা এখন সে ভাবতেই পারে না। ওসব ঝঞাট আর পোষাবে না।
কাকা ভাঁড়ের চা আনাল।
বীণা চা খেতে খেতে বলল, অন্তত রিহার্সালটা হলেও একটু সময় কাটে।
জানি। সাত আটটা দিন বাদ দিয়ে রিহার্সাল ফের শুরু হবে। এখনও সেই ঝঞাটটা যাচ্ছে। তাই বন্ধ রেখেছি।
কোন ঝঞাট?
নতুন করে আর কী শুনবে! সবাই তো জানে। পগা খুন হওয়ার পর থেকে পাপা সিং নানা গণ্ডগোল পাকাচ্ছে, জানো না?
বীণার বুকটা ধক করে ওঠে। পগা নামটাই আজকাল তার শক্ৰ। সে আবছা শুনেছে বটে, পাপা সিং হল পগার মহাজন। বিরাট, পয়সা, দুর্দান্ত মানুষ। পগা ছিল তার বিশ্বাসী লোক। তার ওপর অতগুলো ডলার। আর পাউন্ড খোয়া যাওয়াতে লোকটা ক্ষেপে গেছে।
বীণা বিবৰ্ণ মুখে বলে, এখনও মেটেনি?
এগুলো মেটে কখন জানো? পাল্টি দু-একটা লাশ পড়ার পর। তার আগে নয়।
মা গো! বীণার ভিতরটা যেন অবশ হয়ে যায়। এ সবের জন্য কি সে-ই দায়ী?
বিবশ গলায় বীণা স্বগতোক্তির মতো বলে, খুন হবে!
কাকা চায়ের ভাঁড়টা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে বলে, সেরকমই মনে হচ্ছে। মনটা তাই ভাল নেই।
বীণা সম্মোহিতের মতো কাকার দিকে চেয়ে থাকে অপলক। এ লোকটা তার অন্নদাতা, এ লোকটা তার শরীর চায়নি। কথাৎ, এ লোকটা তাকে পাঁচজনের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। আজ এর বিপদের সময় কি বীণার কিছু স্বর্থত্যাগ করা
বীণা সামান্য হাফসানো গলায় বলে, পাপা সিং কী চায় বলো তো!
কাকা বাইরের দিকে চেয়ে থেকে মৃদু গলায় বলে, কি আর চায়। ডলার আর পাউন্ডগুলো ফেরত চায়, তার বিশ্বাসী লোকের খুনের বদলা চায়।
বনগাঁ তোমার এলাকা, এখানে ও লোকটা তোমার কী করতে পারে?
কাকা ম্লান হেসে বলে, ওসব বাইরে থেকে মনে হয়। হিসেবটা অত সহজ নয়। এই এলাকায় বহু লোক আছে যারা দু-চার হাজার টাকায় দু-তিনটে খুন হাসতে হাসতে করে যাবে। পাপা সিং-এর অনেক টাকা।
বীণার বুকটা হিম হয়ে গেল কথাটা শুনে। সে কাকার দিকে অর্থহীন চোখে চেয়ে থেকে স্বলিত গলায় বলে, আমার ভয় করছে কাকা। কী হবে তাহলে!
কাকা উদাস চোখে বীণার দিকে চেয়ে বলে, দুনিয়াটা বড় কঠিন ঠাঁই বীণা। আমার রাস্তায় সবসময়েই বিপদ।
বীণা দুর্বল গলায় বলে, মিটমাট করে নেওয়া যায় না?
কাকা বিষণ্ণ মুখে বলে, মিটমাট করতেই তো চেয়েছিলাম। খুনটা যারা করেছে, তারা দুজন আমার ডান হাত আর বঁ: হাত। তারা এখন ফেরার। ফলে কাজ-করবার বন্ধ হওয়ার মুখে। আমাকে মুশকিলে পড়ে যেতে হয়েছে। তারা খুব কাজের ছেলে ছিল। মিটমাট করে ফেলতে পারলে দুজন ফিরে এসে কাজে হাত দিতে পারত। কিন্তু পাপা সিং বিগড়ে আছে। শুনছি। এখানে অনেকের সঙ্গে কথাটথা বলছে, প্রায়ই আসছে, যাচ্ছে। কিন্তু আমার সঙ্গে আর দেখা করছে না; তাইতেই বুঝতে পারছি যে একটা কিছু করবে। ভয়টা পাপা সিংকে নয়, ভয় এখানকার ছেলে-ছোকরাব্দের; এদের মধ্যে অনেকেই পগার বন্ধু ছিল। তারা পাপার সঙ্গে গা ঘষাঘষি করছে।
এ কথায় আরও বিহ্বল হয়ে গেল বীণা। লটারিওয়ালা পল্টও তো পগার বন্ধু ছিল। পল্ট কি জানে? পল্টকে যেন আজকাল কেমন কেমন লাগছে বীণার। মুখে তেমন কিছু বলছে না, কিন্তু যেন একটু ইশারা ইঙ্গিত দিচ্ছে। পগা কি সেই রাতে ওকে কিছু বলে গিয়েছিল। পল্টু কি পাপা সিংকে বলে দেবে?
বুকের ভেতরটা এমন তোলপাড় করতে থাকে যে, একটা ব্যথাই চাগাড় দিয়ে ওঠে যেন। বীণা উঃ বলে মুখে হাতঢাকা দিয়ে শক্ত হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
কাকা একটু উদ্বেগের গলায় বলে, কি হল তোমার? অম্বলের ব্যথাটা নাকি?
বীণা একটু থিম ধরে থেকে মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ।
তাহলে বাড়ি চলে যাও। চা না খেলেই পারতে। অম্বলের অসুখে চা-ফা খেতে নেই।
অম্বলের ব্যথার চেয়েও অনেক বড় ব্যথা ঘনিয়ে আসছে বীণার কপালে। ঠাকুর না করুন, কাকা যদি খুন হয়, তাহলে বীণার ভাত জুটবে না। আলেয়ার মতো মিলিয়ে যাবে যাত্রার মদির মায়াময় আলোর রোশনাই। দর্শকের হাততালি। এই একটা লোকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার অদৃষ্ট। আষ্টেপৃষ্ঠে।
মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল তার। একথা ঠিক যে, যাত্রায় নেমে তার আরো দুটো হাত গজায়নি বা টাকা পয়সার ছড়াছড়িও হয়নি। তবে পায়ের নিচে একটু দাঁড়ানোর মতো জমি পেয়েছে, আর ভবিষ্যতের একটি রঙিন ছবি টাঙাতে পেরেছে চোখের সামনে। সব যাবে। কাকা। যদি যায়, তো সব ভেসে যাবে বীণার। উঠে যাবে বিশ্ববিজয় অপেরা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো মানুষ এ যুগে তো বেশী নেই!
