চারটে শাড়ি নিয়ে রাতে রিয়া তার বিষ ওগরাল।
কেন ওদের শাড়ি দেবে? ওরা কি তোমাকে চেনে? দাদা বলে খাতির করে? ঝগড়ার সময় তো পারলে গলাধাক্কা দিয়েছিল।
কৃষ্ণজীবন ব্যথাহত মুখে বলল, সংসারে তো ভুল বোঝাবুঝি হয়। তা বলে সম্পর্ক তো মিথ্যে হয়ে যায় না।
ও সম্পর্ক কোনও সম্পর্কই নয়। চুকেবুকে গেছে, ওদের নিয়ে ফের মাতামাতি শুরু করলে পেয়ে বসবে।
আমি ওদের কখনও কিছু দিই না। কখনও না। সব লেনদেনই তো বন্ধ। এটা কি ভাল?
লেনদেনের কথা বলছে। তাহলে বলি, সম্পর্ক থাকে দেওয়া আর নেওয়ার মধ্যে। তুমি তো দিলে, ওরাও কিছু দিক। এই তো সেদিন বীণা হঠাৎ করে এসে হাজির। হাতে দু টাকার মিষ্টির বাক্সও তো ঘরে আনেনি ভাইপো-ভাইঝিদের জন্য!
অবাক হয়ে কৃষ্ণজীবন বলে, বীণা এসেছিল? ‘
তুমি লন্ডন যাওয়ার তিন চারদিন পর।
কী বলল?
কী আবার বলবে! বোধহয় দাদার সংসারটা একটু দেখে গেল, গিয়ে কৃটিকচালি করবে। বরটা তো একটা হাঁদা গঙ্গারাম।
কিছু বলেনি? কোনও দরকারের কথা?
না। হয়তো তোমাকে পেলে বলত।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে বলে, তোমাকে ভয় পায় ওরা। তাই কিছু বলেনি। হয়তো বিপদে পড়ে এসেছিল।
তার মানে তোমার মাথায় হাত বোলাতে। তোমার ওই বোনটি কিন্তু সোজা পাত্রী নয়। শুনতে পাই সে যাত্ৰা থিয়েটার করে বেড়ায়। চরিত্রের কোনও বালাই নেই। স্বামীটা তো মেনিমুখো। খুব সাবধোন কিন্তু। পেয়ে বসবে। একবার সাহায্য করলে বারবার করে যেতে হবে।
কৃষ্ণজীবন এখনও সংসারের সব প্যাঁচ বোঝে না। তবে সে বিমর্ষ বিবৰ্ণ মুখে বসে রইল। কথাটা মিথ্যে নয় যে, বীণাপানি যাত্রায় নেমেছে।
রিয়া গম্ভীর মুখ করে বলে, কিছু মনে কোরো না, তোমার যা স্ট্যাটাস, যা নাম, তাতে এইসব সাব স্ট্যান্ডার্ড লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা ভীষণ বেমানান। কথাটা যতই খারাপ শোনাক, কিন্তু খুব সত্যি।
কৃষ্ণজীবন একটাও কথা বলতে পারল না। হার মেনে নিল। রিয়া শাড়ি চারখানা তুলে রাখল। তার নিজস্ব আলমারিতে। চিরকালের মতো।
রাতে ঘুম হল না। কৃষ্ণজীবনের। কেন যে খুব মনে পড়ছে ওদের কথা! তার ভাইবোন যদি নষ্ট হয়ে দিয়ে থাকে। তবে তা কার দোষ? ওরা যদি সাব স্ট্যান্ডার্ড থেকে গিয়ে থাকে। তবে তা কার দোষ? তার সঙ্গে যে ওদের যোজন যোজন তফাত হয়ে গেল সে কার দোষ? ছোট্ট বীণা তো তার হাত ধরে ধরে হাটতে শিখেছিল। সাইকেলের রডে পাখির মতো হ্যান্ডেল আঁকড়ে বসে থাকত আর তাকে নিয়ে নিয়ে পাড়ায় টহল দিত কৃষ্ণজীবন। ভাবলে কত কী মনে পড়ে! আর এক বোন সরো, তাকে কত কাল দেখেনি সে। রামজীবন, বামাচরণ, শিবচরণ এদের সবাই যে একদিন লতানে গাছের মতো উদ্বাহু হয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে উঠে আসতে চেয়েছিল অন্ধকার থেকে আলোয়। অশিক্ষা, দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, আত্মাবমাননার হাত থেকে আকাশের ঈশ্বর নয়, দাদাকেই তারা বেশী নির্ভর করত।
এগারোতলার ছাদে নিশুত রাতে ভূতগ্ৰস্তের মতো উঠে আসে কৃষ্ণজীবন। আকাশে কালো ঘন মেঘ। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। তুমুল হাওয়া। ফাঁকা ছাদে আলসের ধারে দাঁড়িয়ে বিপুল শহরের অন্ধকার দিগন্তের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে থাকে সে। ভেজে। শীত করে।
উজানে যাবে কি নদী? আবার কি রচনা করা যাবে সব বিস্মৃত সম্পর্ক? নাকি ভুলে যাওয়া ভাল?
সে ঠিক বুঝতে পারে না। শুধু বুঝতে পারে, তার বুকের প্রকোষ্ঠে বড় গোপন একটা ব্যথা হয়। তার চোখে জল আসতে চায়। তার বুক ফাঁকা হয়ে যায় হাহাকারে।
অনেক রাত। বৃষ্টির তোড় বাড়ল সাজাতিক। হাওয়ায় প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণজীবনকে। তবু সে শান্ত ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির অজস্র চাবুক খেল সারা শরীরে। এ যেন তার প্রায়শ্চিত্ত। এ যেন তার নানা অপরাধের গুণাগার। এ যেন মাটি ভুলে গিয়ে বৃক্ষের অনুতাপ।
একসময়ে তার শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল শীতে। হাত পা অসাড়, কান বধির, চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে যাচ্ছিল প্ৰবল
উপর একসময় সিঁড়িতে শরীরের জল ছড়িয়ে ধীর পায়ে নিজের ফ্ল্যাটে নেমে এল সে। দরজা খুলল। গা মুছল। তারপর নিজস্ব স্টাডিতে বসে রইল চুপ করে। বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল।
০২৩. বনগাঁয়ের জমাটি অঞ্চলে নয়
বনগাঁয়ের জমাটি অঞ্চলে নয়, খানিকটা দূরে, গরিব পাড়ায় তার দুঃখী ঘরখানা। উঠোন ছাপিয়ে বর্ষার জল ঘরে ঢুকতে চাইছে। কয়েক আঙুল মোটে বাকি। ঘরের মাটির ভিত গলে যাচ্ছে জলে। এখানে সেখানে গর্তের মুখ যাচ্ছে খুলে। সাপ, ইঁদুর, ব্যাঙ, উচ্চিংড়ে, বিছে ঢুকে পড়ছে। ঘরে। সারা দিন একরকম জলবন্দী হয়ে আছে তারা। বীণাবাণি আর নিমাই। শুধু বীণা জানে, যতটা দেখায়, ততটা গরিব সে আর নয়। জালার নিচে, মাটির গভীরে প্লাস্টিকে মোড়া অনেক ডলার।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তাই বুঝি আজকাল তার অম্বল বেড়েছে তিনগুণ! হাতে পায়ে জোর নেই। অল্প পরিশ্রমেই হাফ ধরে। কড়ার নিচে ব্যথা হয়।
নিমাই আর সে কথা ফুরিয়ে ফেলেছে। ঘরে মাত্র দুটি প্রাণী, বাইরে দুৰ্যোগ, টানা বৃষ্টি, জল। যাত্রার রিহার্সাল বন্ধ, কোথাও যাওয়ার নেই। দুদিন তারা ঘর থেকে বেরোয়নি। আজ তৃতীয় দিনে সকালবেলাটা ভেজা, স্যাঁতনো। বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। নিমাই বসে আছে। দরজার কাছে। হাতে একটা কিঞ্চি। জল মাপছে। চৌকাটের নিচেই জল। বীণাবাণি বসে আছে তাদের স্যাঁত।ানো বিছানায়।
তিন দিন আগে রিহার্সালে গিয়ে সন্ধেবেলায় শুনল, রিহার্সাল হবে না। কাকার বাজারের ঘরখানা থমথমে। লোকজন নেই। কাকা বসে বসে লম্বা খাতায় পালা লিখছে।
