কৃষ্ণজীবন অনুর দিতে চেয়ে বলে, যদি গিয়ে দেখতে পাও যে, সুমনও আর একটা মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছে?
অনু ফের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, সে হোয়াট? আমি তো আর জেলাস টাইপের নই। সুমন না চাইলে আমি আর একজন ফ্রেন্ডকে খুঁজে বের করে নেবো।
হতাশ মৃত কণ্ঠে কৃষ্ণজীবন বলে, তুমি এরকম কেন অনু? নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে কি কোনও রচনা নেই। কোনও নির্মাণ নেই?
অনু খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, আপনি ভীষণ ওল্ড টাইমার।
তা হবে।
হঠাৎ অনু তার দিকে ঝুঁকে মুখের পানে সকৌতুকে চেয়ে থেকে বলে, রাগ করলেন?
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে রাগ নয়। মনটা খারাপ লাগছে।
আচ্ছা, আপনি কেন নিজেকে বদলাতে পারেন না বলুন তো!
বদলাবো! কেন বলো তো!
আপনি ভীষণ সেকেলে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন আর ইনস্টিটিউশন্যাল, তাই না?
তাই নাকি?
তাই-ইতো। নইলে কেন ম্যারেজটাকে এত ভ্যালুয়েবল মনে করেন?
ম্যারেজ থেকেই তো ফ্যামিলি, আর ফ্যামিলি থেকে ক্ল্যান। পরিবার হল মানুষের ভিড়। তার শিকড়। পরিবার না থাকলে মানুষ পরগাছার মতো হয়ে যায়, যাযাবরের মতো জীবনযাপন করে।
আপনার পরিবার কি আপনাকে শিকড় মেলতে দিয়েছে? তাহলে আপনি কেন আর গায়ের বাড়িতে যান না? আপনার নিজের পরিবারের সঙ্গে কেন আপনার মাখামাখি নেই।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে, তোমার দেখার মধ্যে একটু ভুল আছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু পরিবার মানুষকে কিছু একটা দেয়ই। সেটা হয়তো তার একটা পরিচয়, একটা পদবী, একটা ঠিকানা। আর এই আইডেন্টিটিই তাকে লক্ষ কোটি মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেয় না।
আমি তো হারিয়েই যেতে চাই। কি হবে বাবা-মা-ভাই-বোন আঁকড়ে থেকে বলুন তো! আমার তো একদম ভাল লাগে না। বাবা-মায়েরা ভীষণ ন্যাগিং টাইপের হয়, ইচ্ছেমতো চলতে দেয় না, এটা বারণ করে, সেটা বারণ করে। আমাকে আমার মতো হতে দেয় না কিছুতেই।
তুমি কিরকম হতে চাও?
আমি আমার মতো হতে চাই। আমার ইচ্ছেমতো যা-খুশি হবো, যা-খুশি করব। কোনও প্রম্পটার চাই না। লাইফ ইজ নট এ গাইডেডর টুর।
কৃষ্ণজীবন সামান্য ঘামতে থাকে দুশ্চিন্তায়। অনুর দিকে চেয়ে থেকে বলে, তাই তুমি ফিলাডেলফিয়া চলে যাচ্ছো?
আবার ঠোঁটের মনোরম একটা ভঙ্গি করে অনু বলে, যেতাম না তো, যদি এখানে কেউ আমাকে ভালবাসত।
তুমি জানো না, তোমাকে কতটা ভালবাসেন তোমার মা আর বাবা।
ওরকম ভালবাসার কথা বলছি না। আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট রোমান্টিক লাভ।
ওঃ, মাই গড! রোমান্টিক লাভ! তার জন্য তো বয়স পড়ে আছে তোমার সামনে।
এইটেই তো ঠিক বয়স। আর বেশী বয়স হলে আমার মন যে হিসেবী হয়ে যাবে। ভাঙচুর করতে পারব না যে।
ভাঙচুর করতেই হবে?
করুণ মুখ করে অনু বলে, নইলে যে কেউ আমাকে ইস্পার্ট্যান্স দিচ্ছে না। টিন এজার বলে ভীষণ নেগালেক্ট করছে!
ওটা তোমার ভুল ধারণা। কেউ তোমাকে নেগলেক্ট করছে না। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে মানুষ একটু বেশী সেন্টিমেন্টাল হয়, তাই সবাই নেগালেক্ট করছে বলে ভাবে।
অনু মাথা ঝামরে বলে, অন্তত একজন তো করছেই। আর তার জন্যই তো আমি সুমন সিং-এর কাছে চলে যাচ্ছি। রাগ করে।
কে নেগালেক্ট করছে তোমাকে?
আপনি।
আমি! বলে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ে কৃষ্ণজীবন, আমি তো কই তোমাকে নেগলেক্ট করি না। কত আড্ডা দিই তোমার সঙ্গে।
তাই বুঝি! আমি কিন্তু ঠিক টের পাই, আপনি আমাকে একদম পাত্তা দিতে চান না। ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ওয়াইফ, ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ওয়ার্ক, ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ফ্যামিলি, আমার জন্য আপনার একটুও ভালবাসা নেই।
আচ্ছা বাবা আচ্ছা। কী করলে প্রমাণ হবে যে—বলে কৃষ্ণজীবন বাক্যটা সঙ্কোচবশে অসমাপ্ত রাখে।
অনু খিলখিল করে হাসে, আগে বলুন, আমার জন্য লন্ডন থেকে কী এনেছেন!
তোমার জন্য? ওঃ, তোমার জন্য … শাড়ি-হ্যাঁ একটা দারুণ শাড়ি!
দুর! শাড়ি আমি পরি নাকি?
তাহলে?
এক বাক্স চকোলেট আনলেন না কেন?
চকোলেট! বলে হাঃ হাঃ করে হাসতে চেষ্টা করল কৃষ্ণজীবন। কী ছেলেমানুষ! বালিকা বললেই হয়।
একটা এয়ারপকেটে জপ করে কিছুটা নেমে গেল প্লেন।
চটকা ভেঙে চোখ চাইল কৃষ্ণজীবন। না, লজ্জার কিছু নেই। স্বপ্ন স্বপ্নই। তবু নিচে উষর এক পাথুরে ভূখণ্ডের উপর ভোরের অপরূপ আলোর দিকে চেয়ে নিজের কাছে নিজেকেই লুকোতে ইচ্ছে করে কৃষ্ণজীবনের। অনুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার মধ্যে কোনও গোপন পাপ নেই তো মনে?
মন বড় বিচিত্র এক জিনিস। কিছুতেই তার টিকির নাগাল পাওয়া যায় না। মন কতভাবে যে নাকল করে বেড়ায় মানুষকে। নইলে সে কেন তার অবচেতন মনেও অনুর চিন্তা পোষণ করবে? কোনও মানে হয় এর?
গায়ের আর একটা জিনিস সঙ্গে করে এনেছে কৃষ্ণজীবন। খিদে। তার প্ৰেশার, ব্লাড সুগার, কোলেস্টোরেল নেই। সেজন্য বাঘের মতো খায়। তার খিদে প্ৰচণ্ড, ব্রেকফাস্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গোটা ট্রে চোখের পলকে উড়িয়ে দিল।
দিল্লি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সারাটা দিন পড়ে থাকতে হল কৃষ্ণজীবনকে। সে রিক্লাইনিং চেয়ারে পড়ে পড়ে ঘুমোলো। তারপর বিকেলে ধরল। কলকাতার প্লেন।
উইসকনসিন ইউনিৰ্ভার্সিটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণার চাকরির একটা প্ৰস্তাব তার কাছে এসেছে। মনস্থির করতে পারে না কৃষ্ণজীবন। সে গায়ের ছেলে। গরিব গ্রাম, গরিব দেশ। আমেরিকায় গেলে সে লোভনীয় চাকরি পাবে, থাকবে মহা আরামে। তার চেয়েও বড় কথা, তার কাজের পরিসর বেড়ে যাবে অনেক। খুব খুশি থাকবে রিয়া এবং তার তিন ছেলেমেয়ে। সবই ঠিক। তবু বিদেশে বসবাসের কথা ভাবলেই কেন যে তার ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। এই নোংরা, গরিব, জনাকীর্ণ অকৃতজ্ঞ স্বদেশ কেন যে তাকে সম্মোহিত করে রেখেছে কে জানে! না, কোনওদিনই দীর্ঘ প্রবাস তার সহ্য হবে না।
