দুঃস্বপ্ন! চটকা ভেঙে গেল। একটু শিহরিত হল কৃষ্ণজীবন। অনেকদিন ধরেই একটি অপরাধবোধ কাজ করে তার মনের ভিতরে। তাদের তৃতীয় সন্তান দোলনকে পৃথিবীতে আনা তাদের উচিত হয়নি। পৃথিবীর জনসংখ্যার পক্ষে নিরপেক্ষ অংকের নিয়মে দোলন একটি বাড়তি মানুষ। বাহুল্য। এই একটি বাড়তি মানুষ থেকে জন্ম নেবে আরও কিছু বাড়তি মানুষ। না, দোলনকে আনা তাদের উচিত হয়নি। কিন্তু জন্মের পর কি দোলন ক্রমে তার নয়নের মণি হয়ে ওঠেনি। দোলনকে ছাড়া এই জীবনটার কথা কি ভাবতে পারে কৃষ্ণজীবন? সে মনে মনে শিউরে ওঠে আবার। কিন্তু এও নিৰ্মম সত্য, যে ভাবাবেগ নয়, পরিসংখ্যানই আজ সবচেয়ে সত্য কথা বলে। দোলন বাড়তি, দোলন বাহুল্য। দোলনের জন্যই সে পৃথিবীর কাছে অপরাধী। দোলনের জন্য সে লন্ডনের এক বিখ্যাত দোকান থেকে অনেক দাম দিয়ে নিয়ে এসেছে একটা মন্ত মেকানো সেট, ছবি আঁকার রং, পেনসিল, ভিউ মাস্টার। ভবিষ্যতের পৃথিবী দোলনকে এত আদর করবে কি?
প্লেনের মস্ত পেটের মধ্যে লাগেজ হ্যাচ-এ তার সুটকেসে আরও অনেকের জন্য অনেক কিছু আছে। রিয়া এবং ছেলেমেয়েদের জন্য। কিন্তু সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, এবার সে বিস্মৃতপ্রায় চারটি মানুষের জন্যও কিছু জিনিস কিনেছে। কেন কিনল, কেনার কথা কেন মনে এল, সেটাই সে বুঝতে পারছে না। সম্ভবত লন্ডনের ওয়েম্বলিতে একটা দোকানের মস্ত অখণ্ড কাচে লাগানো একটি গ্রাম্য ছবির পোস্টারই তার জন্য দায়ী। শাড়ি পরা একটি মেয়ে কলসী কাঁখে ঘোর বৃষ্টির মধ্যে আবছা একটা পিছল পথ বেয়ে আগাছার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পুকুরঘাটে নেমে যাচ্ছে। ভারী আবছায়া মায়াভরা ছবি। পিছন ফেরা বলে মেয়েটার মুখ দেখা যায় না। কিন্তু সন্দেহ নেই, ছবিটা গ্রাম বাংলার। অথচ ওয়েম্বলি হল গুজরাতি পাড়া, বাঙালি ব্যবসাদার নেই।
নিরামিষ ডিনার খাওয়াবে বলে তার বন্ধু, লন্ডনের এক স্কুলের অংকের শিক্ষক ভানুভাই তাকে নিয়ে গিয়েছিল গতকাল। সেখানে ফুটপাথে অজস্র জাপানী শাড়ি সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। ওসব দিকে নজর দেওয়ার কথা নয় কৃষ্ণজীবনের। কিন্তু পোস্টারটা দেখে সে দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটার পায়ের চারধারে নির্ভুল কচুবন। সামনে তালের ডোঙায় বাধানো ঘাট। অজস্র বৃষ্টির জলধার। বিষ্টুপুর যেন উড়ে এল লন্ডনে। দুটো বোনের কথা ভীষণ মনে পড়ল, যারা জনও কখনও আসবে না বিদেশে, কখনও পরবে না জাপানী সামু সাটিন শাড়ি, অতীতের সব অপমানের ওপর কি বিস্মৃতি আজও পলির আস্তরণ ফেলে যায়নি? ওদের জন্য কখনও তো কিছু নিয়ে যায় না কৃষ্ণজীবন! সে সিদ্ধান্ত নেয় আচমকা, আবেগে।
শাড়িগুলো যেমন সুন্দর, তেমনি সস্তা। ওদের জন্য কিনলে কি রিয়া কিছু মনে করবে? তার ভয় শুধু রিয়াকে।
ভানুভাই তাড়না দিয়ে বলল, আরে লে লো ভাই কুছ মেহেঙ্গা তো নেহি।
না, মোটেই মেহেঙ্গা নয়। তিন পাউন্ড মানে দেদার সস্তা। আর কৃষ্ণজীবনের বিলে সদ্য অর্জিত প্রচুর বাড়তি পাউন্ড। তাদের কৌতূহল দেখে দোকানদারনি মাঝবয়সী গুজরাতি মহিলাও নেমে পড়লেন শাড়ি বাছতে। চমত্তার বিরল রঙের দুখানা শাড়ি মাত্র ছয় পাউন্ডে কিনে ফেলল কৃষ্ণজীবন। তারপরই হঠাৎ মনে পড়ল, রামজীবন আর বামাচরণের বউয়ের কথা। দুই বোনকে শুধু দিলে ভাল দেখাবে কি? সুতরাং আরও দুখানা কিনল সে। এখন দিল্পিগামী বিমানে ভোরের প্রত্যাশায় বসে পৃথিবীর দূষণজনিত দুশ্চিন্তার মতোই একটা মৃদু উদ্বেগ অনুভব করল সে। দেওয়াটা উচিত হচ্ছে কি? সংসারের নিয়ম এর কী ব্যাখ্যা করবে? কেমনভাবে নেবে রিয়া?
মনশ্চক্ষে সেই পোস্টারটা দেখতে পায় কৃষ্ণজীবন। দোকানদারনি বলতে পারেনি, ছবিটা কার আঁকা বা কোন প্রদেশের ছবি। কিন্তু মনটা ভারী স্নিগ্ধ হয়ে যায়। গাছপালা, বৃষ্টি, পুকুরঘাট আর সেই মেয়েটি। কী সুন্দর! যেন তার শৈশবের একটা জানালা খুলে গেল হঠাৎ।
একটা পোস্টারও কত কী করতে পারে।
আবার ঝিমুনি এল কৃষ্ণজীবনের।
হাই।
আরে অনু! কী খবর?
অনু তার সুন্দর ঠোঁটদুটি ভেঙে হাসির উৎস খুলে দিয়ে বলে, ভাল আর কই! ভালবাসা পেলে লোকে ভাল থাকে, তাই না? আমাকে তো কেউ ভালবাসে না!
তাই বুঝি? কেন তোমাকে কেউ ভালবাসে না? তুমি তো লাভেবল।
মোটেই না। আমার বাবা আর মায়ের সব ভালবাসা নিয়ে নেয় আমার দাদা আর দিদি। আমি বাড়িতে থাকি অরফ্যানের মতো।
অত সহজ নয়। মা আর বাবার ভালবাসা কি অত সহজে মাপা যায়? সে ভালবাসা তো শুধু আবেগ নয়, তাতে শাসন, নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব, উদ্বেগ সব মিশে থাকে। ওটা বুঝতে একটু সময় লাগে।
তাই বুঝি? আমার কি বুদ্ধি নেই? আমি কি বুঝি না?
আমার বড় দুই ছেলেমেয়েও বোধহয় তোমার মতোই ভাবে। তারা বোধহয় ভাবে, আমি তাদের ভালবাসি না। সেটা তাদের বোঝার ভুল এবং কমিউনিকেশনের অভাব।
ইউ আব নট ক্যাপেল অফ লাভিং। সেইজন্যই তো আমি ফিলাডেলফিয়া চলে যাচ্ছি, সুমনের কাছে।
সুমন! সে কে বলো তো!
আপনি বুঝি আমার সব বয় ফ্রেন্ডকে চেনেন। সুমন সিং আমার বয়ফ্রেন্ড। দারুন স্মার্ট। ইন দি মেকিং অফ এ বিগ ডক্টর।
বয়ফ্রেন্ডের কাছে যাচ্ছো! তার সঙ্গেই থাকবে নাকি?
হোয়াই নট! উই উইল লিভ টুগেদার।
সে কী?
অনু কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে বলে, সো হোয়াট! আমাদের সময়ে আমরা আদ্যিকালের সব নিয়ম আর ভ্যালুজ উড়িয়ে দেব। আমরা মানি না যে, ম্যারেজস আর মেড ইন হেভেন। লিভ টুগেদার করলে কত সুবিধে বলুন তো!
