পটল আর একটু ঘেঁষে বসল।
বিষ্ণুপদ দূর অতীতের দিকে ধূসর চোখে চেয়ে থেকে ধরা গলায় বলে, জঙ্গলটা মাঝ বরাবর এসেছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম খুব কাছ থেকে কে যেন বলে উঠল, বিষ্ণুপদ, একটু তাড়াতাড়ি যা বাবা। আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। গলাটা খুব চেনা। আমার বাবার গলা। কিন্তু বাবা এখানে এই জঙ্গলে আসবে কি করে? তার তো বিছানা ছেড়ে ওঠারই সামর্থ্য নেই। আমি চারদিকে চেয়ে দেখলাম, কোথাও কেউ নেই। চাপ অন্ধকার আর কুয়াশায় সব ঢাকা। বললুম, কে? কে আপনি? কেউ জবাব দিল না। শুধু একটা পেঁচা ডেকে উঠল আর হুড়ুস করে একটা বাদুড় উড়ে গেল আকাশে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। কথাটা স্পষ্ট শুনেছি। ভুল নেই। কিছুক্ষণ হাত পা সব কাঠ হয়ে রই। তারপর হঠাৎ মনে হল, গলাটা বাবারই। হয়তো বাবা আর নেই। মনে হতেই প্রায় ছুটতে শুরু করলাম। মাইলটাক পথ পার হয়ে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কান্নার রোল শুনতে পেলাম। এসে দেখি, বাবা আর নেই।
তারপর কী করলে?
বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, কী আর করব! যা সবাই করে, তাই করলাম সব। তবে ওই একবারই একটা ঘটনা ঘটেছিল। তাই মনে হয়, মরে গিয়েও মানুষের কিছু থাকে। সবটা শেষ হয় না। কিছু একটা থেকে যায়।
সেটাই কি ভূত দাদু?
তা হতেও পারে। তবে আমার আর কতটুকু জানা আছে বল ভাই! কত কী আছে চারদিকে। টের পাই, কিন্তু ধরতে পারি না।
০২২. প্লেন চলেছে ভোরের দিকে
প্লেন চলেছে ভোরের দিকে। আলোর দিকে। পূর্বাচলে। নিচে অন্ধকার পৃথিবী। আলো ঝলমল নোম ছেড়ে একটু আগেই আবার কালো আকাশে উঠে এল তারা। লন্ডন থেকে অনেক ইতালিয়ান উঠেছিল, রোমে তারা নেমে যাওয়ায় প্লেন এখন ফাঁকা। আইন সীটের হ্যান্ডরেস্ট তুলে দিয়ে অনেকে লম্বা হয়ে ঘুমোচ্ছ। কৃষ্ণজীবন কখনও প্লেনে ঘুমোতে পারে না। বছরে দু তিনবার সে বিদেশে যায়, সারা বছর দেশের এ-শহর ও-শহর উড়ে বেড়ায়, অজস্র মিটিং সেমিনার, কনফারেন্স উপলক্ষে। তবু প্লেনে ঘুমোতে গেলেই এখনও তার একটা গ্রাম্য ভয় এসে বাধা দেয়। প্লেন যদি হঠাৎ ক্র্যাশ করে। প্লেন ক্র্যাশ করলে জাগা বা ঘুমোনো দুটোই যে সমান তা কি কৃষ্ণজীবন জানে না? তার ভয়টা বড়ই অযৌক্তিক, তাই গ্রাম্য। এত ওপরে ওঠার তো কথা ছিল না তার। বোধহয় তাই আজ পতনের ভয়।
আর একটা গ্রাম্যতা আছে তার। প্লেনের উইন্ডাে সীটে বসবার লোভ। এই লোভে সে এয়ারপোর্টে চলে আসে খুব তাড়াতাড়ি। যদি জাম্বা জেট অনেক ওপর দিয়ে যায় এবং নিচে নিমেঘ আকাশ ও দিনের আলোতেও তেমন কিছু দেখা যায় না, শুধু রিলিফ ম্যাপের মতো ভূমিখণ্ড বা নিজীব সমুদ্র ছাড়া। তবু সে জানালার ধারে বসতে চায় এবং উদগ্র আগ্রহ নিয়ে বাইরে চেয়ে থাকে।
তার ভিতরে এখনও অনেক ছেলেমানুষী আছে, অনেক গ্রাম্যতা আছে, অপরিণামদৰ্শিতা আছে। বৃষ্টি দেখলে তার আজও ভিজতে ইচ্ছে করে। কোঁচড়ে মুড়ি নিয়ে খোসাসমেত শশা দিয়ে খেতে ইচ্ছে করে, মায়ের কাছে বসে শীতের সন্ধেয় আস্কে পিঠে বানানো দেখতে ইচ্ছে করে। নিজের ফ্ল্যাটে বা হোটেলের ঘরে যখন একা হয় তখন হঠাৎ হঠাৎ সে অর্থহীন আগডম বাগড়ম সব শব্দ দিয়ে বেসুরে গান বেঁধে গায় এবং নেচে ওঠে। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলার একটা বড় অভ্যাস তার অনেক দিনের। এইসব নিয়েই সে কৃষ্ণজীবন। সমাজের এক ভারিক্কী মানুষ, গুরুতর মানুষ। অবাক হয়ে সে মাঝে মাঝে ভাবে আমি কি করে এই সব হলাম?
তার ঘড়িতে এখনও লন্ডনের সময়। কিন্তু এই সময় অনুযায়ী মধ্যরাতেই দিল্লিতে ভোর হয়ে যাবে। ভোরের আর খুব বেশী দেরীও নেই। তারা চলেছে আলোর দিকে। ভোরের দিকে। এক উন্নত সভ্যতার সীমানা ছাড়িয়ে গরিব দেশের দিকে। দিল্লিগামী এই ফ্লাইটে সে আরও কয়েকবার এসেছে। মধ্য এশিয়ার ওপরেই ভোর হয়ে যায়। তখন এক ঊষর প্রস্তর আর রুক্ষ পাহাড়শ্রেণী দেখতে পায় সে। সবুজের লেশমাত্র নেই। পাথুরে নিরস সেই পর্বতমালার ভিতর দিয়ে একটি সর্পিল রেখার মতো একটিমাত্র পথ কোন দিগন্ত থেকে দিগন্তে চলে গেছে বাক খেয়ে খেয়ে, পাকসাট মেরে। সমস্ত পৃথিবীও কি ওই ঊষরতার পথে? এক অদ্ভুত আংকিক নিয়মে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। খাদ্য, অক্সিজেন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বাসের স্থান, কর্ষণযোগ্য ভূমির সঙ্গে অনুপাত থাকছে না সেই জনসংখ্যার। মানুষের বসতি এগিয়ে গিয়ে গ্রাস করে নিচ্ছে চাষের জমি, জঙ্গল, জলাভূমি। মানুষের কাছে তার সন্তান কতই না আদরের, অথচ পৃথিবীর চোখে সে সন্তান মন্ত বালাই।
প্রকৃতি শোধ নেবে? নির্মম সব রোগ, মহামারী, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস দিয়ে হ্রাস করবে জনসংখ্যা? নাকি মানুষই মারবে মানুষকে বেড়ে যাবে গুপ্তহত্যা, উগ্রবাদ, দাঙ্গা, রাজনৈতিক খুন? মানুষ কি একদিন মানুষেরই মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে? নিজের তিনটি সন্তানকে কোন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে রেখে যাবে কৃষ্ণজীবন।
ঝিমুনি এসেছিল। অস্বস্তিতে হঠাৎ চটকা ভেঙে সোজা হয়ে বসল সে।
প্লেনে ডিনারটি আজ চমৎকার হয়েছিল। বারবার ঝিমুনি আসছে তার। ঝিমুনির মধ্যেই সে স্বপ্ন দেখছিল, পৃথিবীতে জনসংখ্যা কমানোর জন্য নিয়ম হয়েছে, কারও দুটির বেশী সন্তান হলে বাড়তি সন্তানদের কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলা হবে। খবরটা শুনেই ইউনিভার্সিটি ফেলে বাড়িতে ছুটে এসেছে কৃষ্ণজীবন, গলা ফাটিয়ে ডাকছে, রিয়া! রিয়া! শীগগির দোলনকে লুকিয়ে ফেল! লুকিয়ে ফেল! ওরা কেড়ে নিতে আসছে। আদিগন্ত বিশাল এক ফ্ল্যাটে কোথা থেকে যেন আলুথালু রিয়া ছুটে আসছে আর পেঁচিয়ে বলছে, দোলনকে যে সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না।
