বেলা অনেক হয়েছে। গোপাল নানারকম ঘোৎ ঘৎ শব্দ করছে। তার খিদে পেয়েছে। খিদে পেলে অমন করে।
টিনের চালে একটা সুপুরির ডোঙা ভেঙে পড়ল। ছাগলটা ম্যা করে মিহি সুরে ডাকল। হঠাৎ তখন ইস্কুলবাড়ির ভূতের কথা মনে পড়ল পটলের। সবাই জানে। ভূতটা হল কমল ঘোষের। এই ইস্কুল তারই তৈরি করা। মরার পরও মায়া ছাড়তে পারেননি বলে ছুটির দিনে নিৰ্জন দুপুরে আর গভীর রাতে নাকি ঘুরে ঘুরে ক্লাসগুলো দেখেন। অনেকেই দেখেছে।
পটল আর দাঁড়াল না। গোপালকে টানতে টানতে বৃষ্টির মধ্যেই ফের বেরিয়ে পড়ল।
ঘোষপাড়ার রাস্তার পড়ে একবার ফিরে তাকাল পটল। বৃষ্টিতে আবছা ইস্কুলবাড়ির বারান্দার কি কমল ঘোষ দাঁড়িয়ে আছে! লক্ষ করছে তাদের? গোপালকে টানতে টানতে আরও জোরে দৌড়োতে থাকে পটল। ঘঘাষপাড়ার পুকুরে দুটো হেলে গামছা দিয়ে মাছ ধরছে। অনেকক্ষণ বাদে মানুষ দেখে বুকে ফের সাহস ফিরে এল।
বাড়ির মধ্যে একমাত্র দাদুরই কোনও কাজ নেই। মানুষ বুড়ো হলে তাকে আর লেখাপড়া করতে হয় না, ডাক্তার বা মাস্টার হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না, চুপচাপ বসে থাকতে হয়। দাদুকে দেখে তাই মনে হয় পটলের। কি করে যে দাদু শুধু বসে থাকে, তা ভেবে পায় না পটল। সে তো দু মিনিট চুপ করে থাকতে পারে না, কী যেন কুটকুট করে কামড়ার তাকে, তাড়িয়ে বেড়ায়।
আজ সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বাজ পড়ছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে চলল, বৃষ্টির থামবার লক্ষণ নেই। উঠোন, বাগান, মাঠঘাট সব একাকার হয়ে গেল জলে। আজ আর কোথাও বেরোনোর নেই পটলের। সারা দুপুর বই কোলে করে বসে থেকেছে পটল। পড়েনি একটা লাইনও। ভেবেছে। বড় হয়ে সে কত বড় ধন্বন্তরী ডাক্তার হবে, জ্যাঠামশাইয়ের মতো কেমন দুনিয়া চষে বেড়াবে, সেইসব ভেবে ভেবেই মাথাটা ভার হয়েছে খুব। বিকেলে একটু ফুটবল খেললে হত। কিন্তু ফিরিঙ্গির মাঠে আজ একহাঁটু জল। ফুটবল নামেইনি। আকাশ আরও ঘোরালো হয়েছে। এ বৃষ্টি সহজে ছাড়বার নয়।
ঘরময় জল। নানা ফুটোফাটা দিয়ে জল পড়ে। ব্যাং, পোকামাকড়, সাপখোপ অবধি ঢুকে পড়তে থাকে ঘরের মধ্যে। দেয়ালে বড় বড় কেঁচো বেয়ে বেড়ায়। ঘরের মধ্যে বড় হাঁফ ধরে যায় পটলের।
দুপুরের ঘুম থেকে উঠে দাদু দাওয়ায় বসেছে। গায়ে মোটা একখানা কথা জড়ানন। চেয়ে আছে সুমুখের দিকে। কী যে দেখার আছে, তা বুঝতে পারে না পটল।
নিজেদের ঘরের দাওয়া থেকে দাদুর দাওয়ার তফাত তিন হাতের বেশী হবে না। পটল সেটা লাফ মেরে ডিঙিয়ে গেল।
ও দাদু!
দাদু গম্ভীর মুখখানা তার দিকে ফিরিয়ে বলে, কি রে? ইস্কুলে যাসনি?
আজ, রোববার না!
রোববার বুঝি!
দাদু ওইরকম। বার মাস কিছু খেয়াল থাকে না।
কি করছ বসে বসে?
এই বসে আছি। কি আর করব?
তোমার বসে থাকতে ভাল লাগে?
খারাপ লাগে না। শরীর নেড়ে কিছু তো করার নেই আমার। মনটা সচল রাখতে চেষ্টা করি।
মা যে বলে, অত বসে থাকলে বাত হয়।
তা হয় হয়তো। এখন ডঙ্কা বেজে গেছে, বাতকে আর ভয় কি?
ডঙ্কা বেজে গেছে কেন?
চলে যাওয়ার লগ্ন এসে গেছে রে ভাই।
তুমি কি মরে যাবে দাদু?
তা আর বলতে! পা বাড়িয়ে আছি।
মরে কোথায় যাবে?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, মানুষের বিদ্যেতে এত কিছু আছে, অথচ এ প্রশ্নটার জবাব নেই রে ভাই। কোথায় সে যায়। নাকি কিছুই থাকে না। কে জানে!
তুমি কমল ঘোষকে দেখেছে?
কোন কমল ঘোষ।
আমাদের ইস্কুলের হেড মাস্টার ছিল না?
ওঃ, সেই কমল ঘোষ চিনলো না মানে? এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এসে, সে-ই তো প্রথম ইস্কুল খোলার জন্য আদাজল খেয়ে লাগল। কত দৌড়-ঝাঁপ ধরা-করা করে, গাঁটগচ্ছা দিয়ে, তবে ইস্কুল খুলে একটা কাজের মতো কাজ করল। নইলে চার পাঁচ মাইল ঠেঙিয়ে এ গায়ের ছেলেদের ইকুলে যেতে হত। প্রথম দিকে তো প্রায় ভিক্ষে করে ইকুল চালাতে হত, মাস্টারমশাইরা মাইনে-টাইনে যৎসামান্য পেত। খুব দুরবস্থা গেছে। তবে কমল ঘোষ ছাড়েনি, দমেওনি। আমার সঙ্গে তেমন বনিবনা হয়নি অবশ্য। আমার বিদ্যে বেশী নয় বলে ইস্কুলে চাকরি দিল না। আমি ভিন গাঁয়ে মাস্টারি করতে যেতাম।
কমল ঘোষ মরার পর তার ভূত দেখনি?
ভূত! না দাদা, সেরকম কিছু তো দেখিনি!
কমল ঘোষ এখন তো ভূত হয়ে ইস্কুলে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সবাই জানে।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তাহলেও তো একটা সমাধান হয় রে!
কিসের সমাধান দাদু?
ভূত হয়েও যদি থাকা যায়, তো, সেটাও তো মস্ত কথা। থাকাটাই তো আসল কথা, ভূত হয়েই হোক, মানুষ হয়েই থাক।
তুমি কখনও ভূত দেখনি দাদু?
বিষ্ণুপদ একটু বিব্রত হয়ে বলে, লোকে তো দেখে বলে শুনেছি। আছে বোধহয়!
তুমি কখনও দেখনি? বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলে, ভূত কি না জানি না, তবে একবার একটা কাও হয়েছিল। বলবে! বলে উজ্জ্বল মুখে দাদুর কাছে ঘেঁষে বসল পটল।
তখন এ জায়গায় আমরা সবে এসেছি। চালচুলোর কোনও ঠিক নেই। যে যেখানে পারছে ঘর বেঁধে মাথা গোঁজার জায়গা করছে। দাঙ্গা হাঙ্গামাও হচ্ছে, ঝগড়া কাজিয়াও হচ্ছে, সরকারী লোক, পুলিশও আসছে, চোর ডাকাত আড়কাঠিরও অভাব নেই। সে একটা অরাজক অবস্থা। বনগাঁ ক্যাম্প থেকে আমাদের এখানকার ঠিকানা দিয়েছিল সরকারী লোকেরাই। সেই অশান্তির মধ্যে অতি কষ্টে একখানা ঘর খাড়া করে আমরা আট দশটি প্রাণী কোনওরকমে আছি। হাতের টাকা ফুরিয়ে আসছে। মা একখানা করে গয়না খুলে দেয়, আমি বা বাবা গিয়ে সেটা বেচে টাকা নিয়ে আসি, তবে দুটো ভাত জোটে। এক বছর খুব কষ্ট গেছে। মায়ের বিছের বেচে কিছু চাষের জমি কিনে বাবা চাষবাস শুরু করে দিল। কিন্তু বুড়ো বয়সে ধাক্কাটা সইল না। রোগে পড়ল। আমিও চাষ করতাম, কিন্তু সেইসময়ে মাস্টারির চাকরিটা পেয়ে যাই। জমিটা ভাগে বন্দোবস্ত করে চাকরিটা নিয়ে নিলাম। যাই হোক, বাঁধা একটা রোজগার তো। মাস গেলে ষাট সত্তরটা টাকা তো হাতে আসবে। একেবারে নির্জলা উপোস তো নয়! ইকুলটা দূরে। তখনও সাইকেল কেনা হয়নি। হেঁটেই যেতে আসতে হত। তখন শীতকাল। মাঘ মাসই হবে। প্রচণ্ড শীত পড়ত তখন এদিকটায়। মেলা গাছপালা ছিল তো! এত ঘন বসতিও হয়নি তখন। ইস্কুলের শেষ ক্লাস নিয়ে যখন ফিরতাম তখন অন্ধকার হয়ে যেত। জংলা রাস্তা, ফাঁকা মাঠঘাট দিয়ে একাফিরতে একটু গা ছম্ ছম করত। হাক মারলে শোনার লোক নেই। একদিন সন্ধেবেলা ফিরছি। সেদিন কুয়াশাও হয়েছে খুব। রঘুনাথপুরের দহ বয়ে রেখে বিষ্টুপুরের দিকে আসছি। সামনে একটি জংলা জায়গা ছিল, আঁশফলের জঙ্গল। মাঝখানে দিয়ে সরু পথ। একেবারে নিখুত রাতের মতো নিঃঝুম। শুধু ঝিঁঝি ডাকছে।
