না, দাদু ঠিক আছে। তবে মায়ের বড় দাতের ব্যথা হচ্ছে।
কিরকম ব্যথা? নড়ছে নাকি?
তা জানি না, ব্যথা হচ্ছে খুব।
ব্যথার ওষুধ খাইয়ে চাপা দিয়ে রাখ। পরে দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে নিস। পেয়ারা পাতা সেদ্ধ করা জলে মুখ ধুতে। বলিস।
ভেজা গায়ে পটল আর গোপাল বেঞ্চে বসে থাকে। ডাক্তারদাদু একটা মোটা বই পড়তে থাকে। মদন তার টুলে চুপ। করে বসে থাকে। আজ আর লোক নেই, রুগী নেই।
ডাক্তার দাদু, একটা কথা বলব?
কি কথা?
ডাক্তার হতে গেলে কী করতে হয়?
কপাল লাগে। কপাল ছাড়া হয় না। আমার দু-দুটো দামড়াকে কত তৈরি করলুম, তা দুটোই ধ্যাড়াল।
খুব পড়তে হয়, না?
না পড়লে কি হয়! পড়াই তো আসল জিনিস। পড়তে হয়, বুঝতে হয়, মাথা খাটাতে হয়। শরীরের মধ্যে কি সোজা যন্ত্রপাতি রে!
একটু দমে যায় পটল। তার তো তেমন মাথা নেই, সে কি পারবে অত শক্ত জিনিস শিখতে। কিন্তু বোরা-কালা ভাইটার মায়ায় মাখানো করুণ মুখখানার দিকে চাইতে তার বুকে একটা জোর এসে পড়ে। তখন মনে হয়, গোপালের জন্যই তাকে ডাক্তার হতে হবে।
ডাক্তারদাদুর বাড়িতে বোধহয় ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে। খুব গন্ধ আসছে। পাশে-বসা গোপাল একটু আনচান করে। তারপর দাদার দিকে মুখ তুলে তাকায়। পটল তার মুখখানার দিকে চেয়েই বুঝতে পারে, ওর খাওয়ার লোত হয়েছে। তার ভাইটা একটু লোভী। খেতে ভালবাসে। কিন্তু চুরি করে খায় না, না দিলে খায় না। লোভ হলে শুধু পটলকে এসে ঝাঁকুনি দেয়।
পটল উঠে পড়ল। বাইরে এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। তবে তারা দুজনেই ভিজে কুস হয়ে আছে, আর ভিজলেও ক্ষতি নেই।
কোথায় চললি রে বৃষ্টি-বাদলায়? মায়ের জন্য ওষুধ নিলি না?
দাও।
চারটে ট্যাবলেটের একটা রাংতার পাতা দিল মদনকাকা।
ডাক্তার দাদু বলল, তোদের ইলেকট্রিক লাইন এসেছে নাকি? পর দিন যেন তার টানতে দেখলাম।
হ্যাঁ। আর দুচারদিনের মধ্যেই এসে যাবে।
হুঁ! খামোখা পয়সা জলে দিচ্ছে রামজীবন। আমার বাড়িতে তো কবে থেকে আছে, তা হস্তায় জ্বলে কদিন? উসা তো সেই হ্যারিকেন লণ্ঠন। আদি সনাতন জিনিস। তা শখ হয়েছে যখন লাগিয়ে নে। রামজীবন পয়সাটা যে কোত্থেকে আসছে!
আজকার পটল বড়দের অনেক কথার ভিতরকার অর্থ বুঝতে পারে। আগে পারত না। তার বাবা রামজীবনের যে বাজারে কিছু বদনাম আছে তা সে খুব টের পায়। কিন্তু বাবা বলেই যে, সে গাল বাড়বে, এমন নয়। আসলে বাবাকেও তার বিশেষ পছন্দ হয় না। তার বাবা রামজীবন আগলিং বা চুরি-ডাকাতি গোছেরই কিছু করে বলে, সে আবছা শুনেছে। বটতলায় রামজীবনের যে আচ্ছা আছে, সেখানে খুব খারাপ খারাপ লোকের জমায়েত হয়। তবে বাবার ওপর তার রাগের কারণ সেসব নয়। রাগ হয়, কারণ মাঝে মাঝে মাতাল হয়ে এসে রামজীবন গোপালকে বড় মারে। মারার কোনও কারণই নেই। গোপাল কিছু দুষ্টুমি করে না, দোষঘাট করে না।
বৃষ্টিতে গোপালকে নিয়ে বেরোতেই সামনে ইকুলের মাঠে একটা বাজ পড়ল যেন! নীল চোখ-ধাঁধানো আলো দেখেই কুঁকড়ে গিয়েছিল পটল। শব্দটা এত জোরে হল যেন কেউ টাস করে গালে থাপ্পড় মারল। আর তারপরই কান দুটো যেন তালা লেগে গেল একেবারে।
গোপাল হা করে চেয়ে ছিল পটলের দিকে। অত বড় বাজের শব্দটা ও শুনতেও পায়নি। সবাই বলে, কানে শুনতে পায় না বলেই গোপাল কথা বলতে পারে না। কানটা যদি ভাল হয়ে যায় তাহলেই কথাও কইতে পারবে।
আজ বাজ ঠাকুর ক্ষেপে আছে মনে হয়। বটতলার দিকে একটা আর ঘোষপাড়ার দিকে দুটো বাজ বাতাসে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। ভয় হচ্ছে। এত বাজ তো কখনও পড়ে না। আকাশটা যেন আরও কালছে হয়ে এল। বাতাস বইছে রাবণরাজার মতো অট্টহাসি হেসে। বৃষ্টিতে তলোয়ারের ধার। কাদা-মাখা রাস্তায় গোপালকে নিয়ে দুটতে থাকে পটল।
বাড়ি অবধি যেতে পারল না তারা। বৃষ্টি এত জোরে নাম, আর এত বাতাস যে পথঘাট সব গুলিয়ে গেল। বাজ পড়ছে খুব।
ইস্কুলবাড়ির পাকা দাওয়ায় উঠে পড়ল পটল। গোপাল খুব ঘেঁষ হয়ে দাঁড়ালো তার গায়ের সঙ্গে। ভয় পেলে পটলের সঙ্গে লেপটে থাকে গোপাল।
আজ রবিবার। ইস্কুল বন্ধ। চারদিকটা খ খ করছে। টানা লম্বা দুটো টিনের চালের ঘর নিয়ে ইস্কুল। একটা পাকা দোতলা বাড়ি উঠছিল, সেটার একতলার ছাদ ঢালাই হয়নি, তার আগেই টাকার জন্য কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। চার-পাঁচ বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে, মাঝখানে গাছ উঠেছে, দেয়ালগুলোয় শ্যাওলা। ৯০
ইকুলবাড়ির দরজা জানালা সব ভাঙা, বেশীর ভাগেরই পাল্লা নেই। তারা দুজনে একটা ঘরে ঢুকে দেখল, একটা ছাগল তার দুটো বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিতরে। মেঝেয় ছাগলের নাদি। বৃষ্টির ঝাঁপটায় বেঞ্চগুলো সব ভেজা। পাগলা বাতাসে জানালার দু-তিনটে পাল্লা ঠকাস করে বন্ধ হচ্ছে, ফের মচাক করে খুলে যাচ্ছে।
পটল এই ইস্কুলেই পড়ে। এই ইস্কুল থেকে যারা পাশ করে গেছে তাদের মধ্যে একমাত্র বড় জ্যাঠামশাই ছাড়া আর কেউ বড় মানুষ হয়নি। সে কি পারবে ডাক্তার হতে? তবে বড় জ্যাঠামশাইয়ের কথা ভাবলে তার খুব অহংকার হয়। জ্যাঠামশাই ইকুলের শেষ পরীক্ষায় খুব ভাল ফল করায়, ইস্কুল একদিন বন্ধ দিয়েছিল।
ব্ল্যাকবোর্ড একটা আধখাওয়া অঙ্ক জ্বলজ্বল করছে। মোছা হয়নি। অঙ্কটার দিকে চেয়ে থাকে পটল। বড় ক্লাসের অবু। সে কিছুই বুঝতে পারে না। এখনও এই ইস্কুলেই তাকে অনেক ধাপ পেরোতে হবে। কত কী জানতে হবে, শিখতে হবে। তারপর পাশ করেও আবার নতুন করে অনেক পড়াশুনো। পড়াশুনোর কথা ভাবতে ভাবতে তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম করে।
