মারব থাপ্পড়! কে অজ্ঞাতকুলশীল রে; ঝুমকিকে আমি খুব ভাল চিনি।
কিন্তু জ্যাঠামশাই চেনে না।
আমি চিনলেই হবে। ভুনি মামার চেনার তো দরকার নেই।
এইসব মিথ্যাচারের জন্য তোর নরকবাসের মেয়াদ কত বেড়ে যাচ্ছে তা জানিস। ভাল চাস তো এখনও অন্তরটা। পরিষ্কার কর। ঝাটা বালতি নিয়ে লেগে যা। তোর মনে অনেক ময়লা জমে আছে।
০২১. পুলিন ডাক্তার সব বিদ্যেই জানে
দাদুর কাছে পটল শুনেছে, পুলিন ডাক্তার সব বিদ্যেই জানে। হোমওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, কবরেজি, এমন কি চাসী অবধি। অথচ পুলিন ডাক্তারের একটা পাশ করা নেই। ধরা পড়লে ডাক্তার দাদুর জেল-জরিমানা সবই হতে পারে।
দুই বুড়ো মানুষে কথা হচ্ছিল একদিন, তখন পটল শুনেছে। ডাক্তারদাদু বড়াই করে বলল, আমি না থাকলে বিষ্টুপুর শীতলাতলা কবে ওলাবিবির গরাস হয়ে যেত তা জানো? ম্যালেরিয়া, মা শীতলার দয়া, সান্নিপাতিক, সন্ন্যাস মানুষের কোন রোগ-ভোগ সামাল দিইনি বলো! পাশ-করা ডাক্তার তখন কোথায় ছিল সব। আমি অ্যালোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি আলাদা করে ধরি না বাপু, রোগে পড়লে যার যা সয় দিই। গাঁ গঞ্জে সব রকমই লাগে। অনেকের অ্যালোপ্যাথি ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না, অনেকের সহ্য হয় না, অনেকে আবার কবরেজির ভক্ত। সব বন্দোবস্ত রাখতে হয়েছিল সেইজন্যই।
পটল বিদ্যের ব্যাপারটা বোঝে না। তবে ডাক্তার দাদুকে তার বেশ লাগে। মজার মানুষ। বাইরে দিকে পাকা একখানা ঘরে ডিসপেনসারি। চারটে বড় বড় আলমারি ভর্তি ওষুধ। মদন কম্পাউন্ডার লোকটিও ভাল। সন্ধেবেলায় বটতলায় হারুর সাইকেলের দোকানে বসে গাঁজা খায় বটে, কিন্তু এমনিতে ভারি হাসিখুশি। কাউকে চটায় না, ঝগড়া করে না। ডিসপেনসারিতে নানা লোক আছে। রুগী তেমন কেউ না এলেও, গল্প করতে মেলা লোক আসে। বুড়ে মানুষই বেশী। তাদের কেউ কেউ ডাক্তার দাদুকে দিয়ে ব্লাড প্ৰেশার মাপিয়ে নেয়, কেউ বুকটা একটু এমনিই পরীক্ষা করিয়ে নেয়। বাদবাকি সময় গল্প হয়।
পটল মাঝে মাঝে গোপালকে নিয়ে এসে বসে থাকে এক ধারটায়, কাঠের বেঞ্চে। ডাক্তারা অনেকদিন আগেই বলে দিয়েছে, ও হল জন্মের রোগ। ও কি সারে রে!
কত অসুখের তো কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে দাদু। পেনিসিলিন, আরও সব কী যেন!
দুনিয়ায় কত বোরা-কালা আছে জানিস? ওষুধ থাকলে কবে সবাই ভাল হয়ে যেত।
তাহলে গোপালের কী হবে?
কি আর হবে! বোবা-কালাদেরও ব্যবস্থা আছে। ডিফ অ্যান্ড ডাম্বদের ইস্কুল আছে, লেখাপড়া শিখতে পারে।
হোমিওপ্যাথিতে তো কত মরো-রো মানুষও বেঁচে ওঠে। নেই ওরকম কোনও ওষুধ? থাকলে কি বসে থাকতুম রে! মানুষকে ভগবান অনেক বিদ্যে দিয়েছেন বটে, কিন্তু সবটুকু তো আর দেননি। মানুষ যে ভগবান নয়, এটা যাতে সর্বদা মনে রাখে, সেইজন্যই দেননি।
কথাটা পটলের বিশ্বাস হয় না। ডাক্তারদাদুকে ছেড়ে মাঝে মাঝে মদন কম্পাউডারের কাছেও ব্যাপারটা বলেছে, দাও না একটা ওষুধ মদনকাকা। গোপালের জন্য একটা ওষুধ ঠিক পাওয়া যাবে। ভাল করে খুঁজে দেখ।
মদন অবশ্য সরাসরি না করে দেয় না। এক-আধটা পুরিয়া দিয়ে বলে, দেখ খাইয়ে। ঠাকুরের নাম করে খাওয়াস। শাস্ত্রে বলেছে, মূকং করনীতি বাঁচালং। দেখ কী হয়।
হয়নি। গোপাল এখনও কানে শোনে না। কথাও বলে না।
বটতলায় আগে বুধবার হাট বসত। হাটেই গায়ের মানুষ হস্তার বাজার করে রাখত। আজকাল আর সেই দুঃখ নেই। বটতলায় পাকা বাজার বসে গেছে। তবে বুধবারের হাট এখনও হয়। মেলা ব্যাপার আসে। তাদের মধ্যে এক জড়িবুটিওয়ালাও আছে। নানারকম হাড়গোড়, তেল, ভস্ম, ডো, পাথর সব থাকে তার কাছে। ভিড়ও হয়। তার কাছ থেকেও ওষুধ নিয়েছিল পটল। একটা গাছের শেকড় মধু দিয়ে বেটে খাওয়তে হয়েছিল। কাজ হয়নি।
কিসে কাজ হবে, পটল তা নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবে। আকাশে এরোপ্লেন ওড়ে, চাদে মানুষ যায়, অ্যাটম বোমা, টেলিফোন কত কী তৈরি করেছে মানুষ, আর গোপালকে কথা কওয়াতে পারবে না? সে একবার তার বড় জ্যাঠাকে চিঠিতে লিখেছিল, আপনি তো বিলেত আমেরিকা যান। গোপালের জন্য ওষুধ এনে দেবেন? সে চিঠির জবাবে জ্যাঠামশাই লিখেছিল, এর কোনও চিকিৎসা নেই। তবে তুমি বড় হয়ে এটা নিয়ে গবেষণা কোরো। মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে।
সাধু-সন্ন্যাসীরা হয়তো পারে। কিন্তু জটাজুটলা লোক দেখলেই পটল ভয় খায়। তান্ত্রিক শুনলেই তার বুক হিম হয়ে যায়। গোপালের জন্য আজও সে কোনও সাধুকে ধরতে পারেনি। তবে জলপড়া, চরণামৃত খাইয়েছে অনেক।
গোপাল যদি কথা বলতে পারত তাহলে তাতে দাদা বলে ডাকত। দুই ভাইয়ে কত প্রাণের কথা হত। সে যখন কথা বলে তখন গোপাল একদৃষ্টে তার মুখের দিতে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকলে গোপাল খানিকটা তার কথা বুঝতেও পারে। পেনসিল, বই, এক গেলাস জল, মাদুর, ঘটি এসব আনতে বলতে ঠিক এনে দেয়। কিন্তু না তাকালে বুঝতে পারে না।
পটল মনে মনে ঠিক করে রেখেছে বড় হয়ে সে ডাক্তার হবে। ডাক্তার হওয়া শক্ত। পড়াশুনো খুব কঠিন। তার আগে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় খুব ভাল ফল হওয়া চাই। তাই সে আজকাল খুব কষে পড়ে। কিন্তু পড়ার ঝেকটা বজায় রাখতে পারে না। দুদিন খুব পড়ল তো চারদিন আর রোখটা রইল না।
ডাক্তারদাদু যে পাশ-করা ডাক্তার নয়, তা সে জানে। তবু আজ বৃষ্টি-ভেজা সকালে ভাইকে নিয়ে সে এসে বসেছে ডিসপেনসারিতে। ডাক্তারদাদু একবার চোখ তুলে তাকে দেখে বলল, কী ব্যাপার রে? তোর দাদুর কিছু হল নাকি আবার!
