জানালাটা বন্ধ করে চেয়ারে এসে বসল হেমাঙ্গ।
মেয়েটা নিজের সর্দির নাক সামলাতে ব্যস্ত।
হেমাঙ্গর এবার মেয়েটির দিকে অকপটে তাকাতে বাধা হল না। সে বলল, আপনাদের সংসার কি বড়?
আমরা তিন ভাই বোন। মা আর বাবা।
ভাই কি করে?
পড়ছে।
আপনার বাবা এখন কেমন আছেন?
একটু ভাল। কাল বাবাকে বাড়িতে আনা হবে।
একটা কাজ করুন। রাস্তায় জল জমে আছে, আমার ছোট গাড়ি ফেঁসে যাবে। একটু যদি অপেক্ষা করেন তো আমি আপনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারি।
এই বদান্যতায় মেয়েটা ভীষণ হকচকিয়ে গিয়ে বলল, না না! তার দরকার নেই।
এই মধ্যবিত্ত সংকোচের কোনও মানেই হয় না। এটা হল সুযোগসন্ধানীদের যুগ। কোনও সুযোগ বা সুবিধা প্রত্যাখ্যান করতে নেই। কিন্তু এই মেয়েটির এখনও সেইসব কার্যকরী শিক্ষা হয়নি। কিংবা একা পুরুষের সঙ্গে গাড়িতে যাওয়া কি এর কাছে সতীত্ব বিরোধী ব্যাপার? কে জানে কি! মেয়েদের চরিত্ৰ ভাল করে জানে না হেমাঙ্গ।
সে বলল, দরকার না থাকলেও বসুন। এই বৃষ্টিতে যেতে পারবেন না। বরং একটু গরম চা বা কফি খান। আপত্তি নেই তো?
মেয়েটি আবার হাঁচল। লজ্জা পেল। ফর্সা রংটা লালও হয়ে গেল একটু। বলল, দরকার নেই।
কেন যে এত সংকোচ করছেন। বলে বেল বাজিয়ে বেয়ারা ডেকে দু কাপ কফির কথা বলে দিল।
লজ্জায় মরে যাচ্ছে মেয়েটি। যেন চাকরির উমেদারিতে এসে এই আপ্যায়ন গ্রহণ করাটা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে।
কফি এল। দেখা গেল মেয়েটি কফিটা খুব উপভোগ করছে। দু হাতে কাপটা ধরে আছে সাবধানে। লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু ওর মুখ বলছে, কফিটা ওর খুব দরকার ছিল।
বৃষ্টিটা ঝপ করে অনেকটা কমে গেল কফি খাওয়ার দশ মিনিট পর। ধরেনি অবশ্য। তবে ঝিঁঝির করে পড়ছে। উদ্দাম নাগা-নৃত্যটা বন্ধ হয়েছে। আর একটু অপেক্ষা করতে পারলে রাস্তার জলও কিছুটা সরে যাবে। হেমাঙ্গর ভয় তার ছোট গাড়িটা নিয়ে। ইঞ্জিনে জল ঢুকে মোটর বন্ধ হয়ে গেলে ঠেলাঠেলির অনেক ঝামেলা।
কফি খেয়ে মেয়েটা সত্যিই উঠল, এবার আমি যাবো।
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, ঠিক আছে। আসুন।
মেয়েটা চলে যাওয়ার পর হেমাঙ্গ তার কাজকর্মে একটু ব্যস্ত রইল। কয়েকটা বিষয়কৰ্মজনিত ফোন এল। পার্টনার চঞ্চল বোসের সঙ্গে একটু আজ্ঞা হল। ঘন্টা দেড়েক বাদে বুঝতে পারল রাস্তার জল নেমেছে। যাওয়া যাবে।
গাড়ি স্টার্ট নিল একবারেই। রাস্তায় কোনও ঝাঁট হল না।
ফোনটা এল রাত আটটার পর। বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছে। বিছানায় খুব আলস্যে এলিয়ে আধশোয়া হয়ে টিভি-তে একটা সিরিয়াল দেখছিল হেমাঙ্গ।
ফোনটা কানে তুলতেই হ্যালোর বদলে মেয়েলী গলায় শোনা গেল, ছিঃ!
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হাঁচলি নাকি?
ছিঃ ছিঃ! তোর লজ্জা করে না?
কিসের লজ্জা?
একটা মেয়েকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে না দিয়ে বৃষ্টিতে ওভাবে ছেড়ে দিলি? জানিস ওর এখন একশ এক ডিগ্রি টেম্পারেচার!
হেমাঙ্গ অপ্রতিভ হয়ে বলে, ওই ঝুমকি মেয়েটার কথা বলছি নাকি?
তবে আর কার কথা বলছি! তোর মনুষ্যত্ব যে এত কমে গেছে, তুই যে এত হৃদয়হীন হয়ে গেছিস তা তো জানতুম না।
ঝুমকি কি তাই বলেছে তোকে?
বলার আর কী আছে?
আমি ওকে লিফট অফার করিনি একথা বলেছে?
মোটেই তা বলেনি।
তাহলে আমার দোষটা কোথায় বল তো!
ও লজ্জা পেয়েছিল, তাই বলে তুই ওকে জোর করে তে পৌঁছে দিতে পারতিস!
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জোরও করা যায় নাকি? মেয়েটা অমন ভ্যাবাগঙ্গারাম আর লজ্জাবতী পতা হলে আমার কি করার আছে? আমি হিউম্যান পয়েন্টে যতটুকু করার করেছি।
বেচারার কোল্ড অ্যালার্জি আছে। বৃষ্টিতে ভিজে বুকে কনজেশন হয়ে কী অবস্থা তার ওপর ওর বাবা এখন নার্সিং হোমে। তুই কী বল তো!
হেমাঙ্গ একটু চটে গিয়ে বলে, তখন থেকে কেন যে টিকটিক করছি। বললাম তো, মেয়েটাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছি, ও রাজি হয়নি।
একটা ছাতা দিতে পারতিস?
আমার ছাতা কোথায়?
কারও কাছ থেকে ধার করেও তো দিতে হয়। তোর মতো সকলের তো গাড়ি নেই। গরিবদের কথাও দিনের মধ্যে কিছুক্ষণ ভাবতে হয়। পৃথিবীতে কত পারসেন্ট গরিব তা জানিস?
লেকচার দিস না। মেয়েটা মোটেই গরিব নয়। ছাতাটা ভুলে ফেলে এসেছিল। ওরকম আনস্মার্ট, ভুলো মন আর বোকা মেয়েকে আমি কোনও চাকরি দিতে পারব না। সরি।
আহা, চটছিস কেন?
মেয়েটা তোর কাছে গিয়ে চুকলি কেটেছে তো! ঠিক আছে, ওরকম মেয়েকে চাকরি দেওয়ার কোনও দায়িত্বই আমার নেই।
মোটেই চুকলি কাটেনি। ও সেরকম মেয়েই নয়। বোেকা হাঁদাও নয়, আনৰ্টও নয়। তবে লাজুক সেকথা ঠিক। আর তোর মতো ইডিয়ট ছাড়া সবাই জানে যে লজ্জাই ললনার ভূষণ।
ভূষণ মানে জানিস?
কেন জানব না? তোর মতো মূর্খ নাকি? ভূষণ মানে গয়না।
ঠিক কথা। গয়না হল বাহুল্য জিনিস, এ যুগে চলে না। ওয়ার্কিং গার্লরা যেমন গয়না অ্যাভয়েড করে তেমনি সজাও অ্যাভয়েড করতে হয়। নাচতে নেমে ঘোমটা টানলে তো চলবে না। চাকরিও করব, আবার নববধূর মতো মাথা নিচু করে। থাকব তা কি চলে যে? ও হল অচল মাল।
তোর কথাবার্তাগুলো এত জংলি টাইপের। যাক গে, ক্ষমা করে দিচ্ছি। তোকে যে কেন এত ক্ষমা করতে হয় তা বুঝি না বাবা।
ভূনি জ্যাঠামশাইকে এর মধ্যে টেনে নামিয়ে তুই যে কাণ্ডটা করলি সেটা কিন্তু ক্ষমার যোগ্য অপরাধই নয়। জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে আমি জিজ্ঞেস করব ইদানীং তিনি কেন অন্যের কথায় অজ্ঞাতকুলশীল সম্পর্কে ফলস স্টেটমেন্ট এবং রেকমেন্ডেশন দিচ্ছেন।
