হেমাঙ্গ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের কাচের শার্সির ভিতর দিয়ে দেখল, বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। বন্ধ অফিসঘরে কৃত্রিম আলোয় এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। ভেজা মেয়েটির নিশ্চয়ই ঘরের ঠাণ্ডাটা সহ্য হয়নি। ইস, আপনি যে ভিজে গেছেন।
রোগা চেহারার মেয়েটি সলজ্জ মুখে মৃদু স্বরে বলল, হ্যাঁ। একটু ভিজেছি। ছাতাটা ভুল করে সঙ্গে আনিনি।
হেমাঙ্গ উঠে এয়ারকণ্ডিশনারটা বন্ধ করে দিল। বলল, সরি। আমি এতক্ষণ লক্ষ করিনি যে আপনি ভিজে গেছেন। তোয়ালে দেবো?
মেয়েটি মাথা নেড়ে ভীষণ লজ্জার সঙ্গে বলে, না, তার দরকার নেই।
মুখটা চেনা-চেনা লাগছে হেমাঙ্গর। কোথায় দেখেছে একে? তার স্মৃতিশক্তি চমৎকার। কিন্তু মনে করতে সময় লাগবে। মুখখানার মধ্যে একটা ধারাল সৌন্দর্য আছে। মাথায় মেঘের মতো চুল।
আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি বলুন তো!
দেখেছেন, তবে মনে থাকবার কথা নয়।
কোথায় বলুন তো!
নন্দনাদের বাড়িতে। সেদিন ওর ভাইয়ের জন্মদিন ছিল। আমি অবশ্য আপনাকে চিনি।
হেমাঙ্গর টক করে মনে পড়ল। এই মেয়েটি তাকে একটা কোল্ড ড্রিংক দিয়েছিল। সঙ্গে একটু হাসি। হেমাঙ্গর মাথায় একটা টিকটিক ডাকছিল। সে বলল, ওদের বাড়িতে কি আপনার যাতায়াত আছে?
হ্যাঁ। আমরা প্রতিবেশী।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, কিন্তু ভূনি জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কি করে? উনি তো সল্ট লেক-এ থাকেন।
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলে, পরিচয় নেই তো।
তাহলে এই চিঠিটা?
ওটা তো চারুমাসী এনে দিয়েছে।
মাই গড! তাহলে তো আপনি আসরে আমার ওই বিন্দু দিদিটির রেফারেন্সেই এসেছেন। কিন্তু ও নিজে চিঠি দিল না। কেন? ফোনও করতে পারত।
মেয়েটি সলজ্জ একটু হেসে বলে, উনি বলছিলেন আপনি ওকে বেশী পাত্তা দেন না। তাই কোন এক আত্মীয়ের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে এসে দিলেন। আপনি কিছু মনে করেননি তো! কনসৃপিরেসিটায় কিন্তু আমি ছিলাম না।
বুঝেছি। আমার ওই দিদিটিকে আমি ভালই চিনি। এনিওয়ে, আমি দরখাস্তটা রেখে দিচ্ছি। এই ভেজা অবস্থায় আপনার আর বেশীক্ষণ থাকা উচিত নয়। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান।
মেয়েটি দরজার কাছ অবধি চলে দিয়েছিল। হেমাঙ্গ আর এবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বাইরেটা বৃষ্টির তোড়ে সাদা হয়ে গেছে। এ বৃষ্টিতে এ মেয়েটি তো কোথাও যেতে পারবে না। নিশ্চয়ই গাড়ি কমে এসেছে রাস্তায়। আর বাসে এখন সাঙ্তিক ভিড় হবে।
শুনুন। আপনি বরং একটু অপেক্ষা করে যান। এই বৃষ্টিতে বেরোতে পারবেন না।
আমি ঠিক চলে যেতে পারব।
পারবেন না। রাস্তায় জল জমে গেছে। বেশী বৃষ্টি হলে কলকাতার অবস্থা কী হয় তা আমি জানি।
আমি জল ভেঙেই এসেছি।
এইরকম দুর্যোগের দিনে না আসাই ভাল ছিল। বসুন। সর্দি তো বোধ হয় লেগেই গেছে। আর নতুন করে লাগবে না।
মেয়েটি জড়সড় হয়ে বসল। খুব সংকোচ।
আপনি কি খুব নিডি? চাকরি খুঁজছেন কেন?
নিডি। তবে আমার বাবা খুব ভাল চাকরি করেন। কিন্তু বাবার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। ম্যাসিভ অ্যাটাক। এখন আমাদের অবস্থা কিছুটা আনসার্টেন। চাকরিটা সেই জন্যই দরকার।
মেয়েটা আর একবার হাঁচল এবং ভীষণ লজ্জা পেল। রুমালে নাক মুখ চাপা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও আরও তিনবার হাঁচতে হল তাকে।
বাবার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের কথা সেদিন আরও একটা মেয়ে বলছিল না? হেমাঙ্গ একটু ভাবতেই বছর পনেরোর কিশোরীটিকে মনে করতে পারল। কিশোরীটি বড্ড বেশী স্মার্ট।
মৃদু হাসি মুখে হেমাঙ্গ বলে, সেদিন পার্টিতে কি আপনার একটি ছোট বোনও ছিল? নিয়ার অ্যাবাউট ফিফটিন!
নাক থেকে রুমাল সরিয়ে মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, অনু। আপনার সঙ্গে নাকি তার খুব ভাব হয়ে গেছে। বলছিল।
এটি আর একটি বিচ্ছ, তাই না!
মেয়েটি হাসল। কিছু বলল না।
হেমাঙ্গ দরখাস্তটা তার ব্যক্তিগত ফাইলে রেখে দিয়ে বলে, আমাদের কোম্পানি ছোট, আমরা চারজন পার্টনার এটা চালাই। আমাদের এখানে স্টাফ খুব কম দরকার হয়। কম্পিউটারেও লোক আছে। আপনার জন্য অন্য কোনও ক্লায়েন্টকে বলে একটা কিছু করার চেষ্টা করব। কম্পিউটার ট্রেনিং থাকলে কাজ পাওয়া সহজ।
মেয়েটা আবার হাঁচি দিতেই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে হেমাঙ্গ। এর তো ভালরকম ঠাণ্ডা লেগেছে। দেখা যাচ্ছে। অথচ বাইরে প্রবল থেকে প্রবলতর বৃষ্টি হচ্ছে। অকালেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। রাস্তায় বোধ হয় এখন হাঁটুজল এবং প্রবল জ্যাম। বৃষ্টি হলেই একটা দুটো গাড়ি ব্রেকডাউন হয়ে রাস্তা আটকে রাখে। কলকাতা অচল হয়ে পড়ে।
মেয়েটা আর একবার উঠবার চেষ্টা করতেই হেমাঙ্গ একটু কড়া গলায় বলে, কোথায় যাচ্ছেন?
বাড়ি যেতে হবে যে।
যেতে তো সবাইকেই হবে। কিন্তু কলকাতায় কেউ কখনও সময়মতো কোথাও পৌছোতে পারে কি? আপনি বরং টেলিফোনে বাড়িতে খবর দিতে পারেন। বাড়িতে কি টেলিফোন আছে?
আছে।
তাহলে টেলিফোন করে দিন। বলে হেমাঙ্গ যন্ত্রটা এগিয়ে দিল।
মেয়েটা এই বদান্যতায় যেন মরমে মরে যাচ্ছে। খুব সংকোচের সঙ্গে বোতাম টিপল। বারতিনেকের চেষ্টায় লাইন পেয়ে মৃদুস্বরে বলল, মা, বৃষ্টিতে আটকে গেছি। ফিরতে দেরি হবে একটু।
সংলাপটা শুনবে না বলেই হেমাঙ্গ উঠে এসে জানালার একটা পাল্লা খুলে দিল। এয়ার কন্ডিশনারটা বন্ধ করায় ঘরটা একটু ভেপে উঠছে। জানালা দিয়ে অবশ্য প্রবল বৃষ্টির ঘাট এল। তবু উঁকি মেরে নিচের অবস্থাটা একটু দেখে নিল হেমাঙ্গ। পথঘাট দেখা যাচ্ছে না বৃষ্টিতে।
