একজন মহাপুরুষ বলেছেন, কর মানে হাত। কর দেওয়া মানে হাতে হাত মেলানো। রাজা ও প্রজার করমর্দন। সরকার ও জনসাধারণের সহযোগিতার শুরু তার বদলে হেমাঙ্গ বা হেমাঙ্গর মতো লোকরা যা করছে তা হল অনেকটা বেড়াল-কুকুরের মল বা মৃত্রের ওপর ছাই চাপা দিয়ে রাখা, যেমনটা তার মাকে সে ছেলেবেলায় করতে দেখেছে। গত বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা ট্যাক্স বাঁচাতে বি পি সাহাকে সাহায্য করেছে হেমাঙ্গর কোম্পানি। এবং কাজটা করে যথেষ্ট আত্মগৌরব বোধ করেছে।.বি পি সাহার মতত ক্লায়েন্টদের সর্বমোট কত ট্যাক্স বাঁচিয়ে দিয়েছে তার কোম্পানি তার হিসেব করলে যে-কারও মাথা ঘুরে যাবে। আর এই ছাই-চাপা দেওয়ার কাজ দেশ জুড়ে যারা করছে তারা মোট কত ট্যাক্স সরকারের ঘরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে তার হিসেব করলে গোটা কয়েক পাঁচসালা পরিকল্পনার মূল বিনিয়োগ উঠে আসবে না কি? হিসেটা করা হয় না, এই যা।
খুব মনোযোগর ভান করে বি পি সাহার কাগজপত্র দেখছে হেমাঙ্গ। আদতে দেখছে না। গন্ধের বেলুনে চড়ে এখনও সে অনেক ওপরে। ইনস্যাট বি-এর কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে সাহার বিষয়ী মুখটার দিকে তাকাচ্ছে। মুখখানা গোলপানা, গোফ আছে, নাকটা একটু মোটা, ঐ ঘন, কপাল ছোট এবং চুল খুব ঘেঁষ। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশের মধ্যে। গত বছর তিন কোটি টাকার কাছাকাছি ট্যাক্স দিয়েছে। সাফল্য কি একেই বলে? অঘোষিত সাফল্য অবশ্য আরও অনেক বেশি।
বি পি সাহার মুখে হাসি নেই। আহা, এই লোকটা যদি এই আফটার শেভ লোশনটা একটু মাখত!
খানিকক্ষণ কাগজপত্র দেখার চেষ্টা করে হেমাঙ্গ বলল, ইটস্ ও. কে. মিস্টার সাহা।
বি পি সাহা একটা অস্পষ্ট থ্যাংক ইউ বলে উঠে গেল। দরজাটা বন্ধ হল। ঘরে হেমাঙ্গ একা।
মাঝে মাঝে কাজ করতে তার ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে তার অনেক দিনের ছুটি নিয়ে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। কিছুক্ষণ চোখ বুজে চুপ করে বসে সে কোনও একটা সুন্দর বেড়ানোর জায়গার কথা ভাবল। কিন্তু তেমন আকৰ্ষক কিছুই মনে পড়ল না। পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র সে কি অনেক দেখেনি। খুবই আশ্চর্যের বিষয় এবং লোকে শুনলে হয়তো আসবেও—তার প্রিয় বেড়ানোর জায়গা হল বড় বড় দোকান, যেখানে অজস্র জিনিসের সম্ভার। নতুন নতুন জিনিস। গ্যাজেটস। ইলেকট্রনিকস।
বেশীক্ষণ বিষয়কর্মকে প্রত্যাখ্যান করে থাকা গেল না। একটু বাদেই বেয়ারার চিরকুট। তার কিছুক্ষণ পরেই বি পি সাহার কার্বন কপি আর একজন বিষয়ী লোক। তারপর, আরও একজন। তারপর ইনকাম ট্যাক্স-এর একটা হিয়ারিং সেরে আসতে হল।
তিনটের পর কফি খাওয়ার সময় গন্ধটা সম্পূৰ্ণ লোপাট হয়ে গেল। অন্তত ততটা রইল না, যতটায় ইনস্যাট বি-এর কাছাকাছি উঠে থাকা যায়।
মেয়েটা এল বিকেলের দিকে। আর এক ঘন্টা পরে এলেই হত। তখন থাকত না হেমাঙ্গ। দেখা না করেও উপায় নেই। তার এক জ্যাঠার চিঠি নিয়ে এসেছে। ভূনি জ্যাঠা তার বাবার খুড়তুতো দাদা। এক সময়ে কোলিয়ারি ছিল। এখন ব্যবসা না থাক, টাকা আছে।
মেয়েদের মুখের দিকে চট করে তাকায় না হেমাঙ্গ। তাকালেই নানা বখেরা। মুখটা নিচু রেখেই বলল, চাকরি চান? কোয়ালিফিকেশন কী?
আমি একটা অ্যাপ্লিকেশন এনেছি। বায়োডাটা দেওয়া আছে।
ভূনি জ্যাঠার ক্যান্ডিডেটকে খুব একটা হেলাফেলা করার উপায় নেই। এই জ্যাঠামশাইটি রাশভারী ব্যক্তিত্ববান মানুষ। তিন ছেলে পুলিশ ও প্রশাসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে। এই তিন দাদাই হেমাঙ্গকে প্রয়োজনে প্রচুর সাহায্য করে থাকে। ভুনি জ্যাঠা কারও অনুগ্রহ নেয় না বড় একটা। আত্মমর্যাদাজ্ঞান খুব টনটনে। কিন্তু এই মেয়েটিকে নিশ্চয়ই বিশেষ কারণেই পাঠিয়েছেন হেমাঙ্গর কাছে। হেমাঙ্গ তার দরখাস্তটা পড়ল। ইলেকট্রিক টাইপ রাইটারে দামী হ্যান্ডমেড কাগজে ছাপা দরখাস্তটা থেকে জানা গেল, মেয়েটির বয়স কুড়ি এখনও পূর্ণ হয়নি। আর্টস গ্র্যাজুয়েট এবং কমপিউটার ট্রেড।
হেমাঙ্গর জীবনে একটা মস্ত বড় ঘাটতির ব্যাপার হল, সে চট করে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বোধ হয় কতগুলো ব্যাপারে সে অত্যন্ত সতর্ক মানুষ বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চারদিক বিচার বিবেচনা করে। মেয়েটির চেয়েও ভুনি জ্যাঠা তার কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাকটর। তারা অর্থাৎ হেমাঙ্গর গোটা পরিবারটিই আসলে পূর্ববঙ্গের। তবে দাদুর আমল থেকেই, অর্থাৎ দেশ ভাগের অনেক আগে থেকেই তারা কলকাতার বাসিন্দা বলে পূর্ববঙ্গের পরিচয়টা প্রায় মুছে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার এখনও তারা বাঙাল। ঘঘারতর বাঙাল। তার মধ্যে একটা হল, আত্মীয় বৎসল। লতায় পাতায় আত্মীয়দেরও উপেক্ষা করার জো নেই। এই ছোট পরিবারের যুগেও তাদের এই রীতিটি বজায়। আছে। আত্মীয়দের উপেক্ষা করা যাবে না। সুতরাং এই মেয়েটির তাদের আত্মীয়া হওয়ার সম্ভাবনা।
হেমাঙ্গ মৃদু স্বরে বলল, কিছু মনে করবেন না, আপনি ভুনি জ্যাঠামশাইয়ের কোনও আত্মীয় নন তো!
এবারও হেমাঙ্গ মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল না। দরখাস্তর দিকে চোখ রেখেই বলল।
মেয়েটি জবাব দেওয়ার আগেই হঠাৎ পর পর দুটো হাঁচি দিল।
হেমাঙ্গ মুখ তুলে দেখল, মেয়েটা রুমালে মুখ চাপা দিয়ে ভীষণ লজ্জার ভঙ্গিতে বসে আছে। আর খুবই উদ্বেগের কথা যে, মেয়েটি আপাদমস্তক সপসপে ভেজা।
