তোমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেও তো এরকমই হুড়ুম দুড়ুম কাও করবে সব। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি, লাফ ঝাপ, চেঁচামেচি!
বেঁচে থাকা মানেই তো নিজেকে জানান দেওয়া। নইলে পাথর হয়ে, মনি হয়ে বেঁচে থেকে কী লাভ বলো!
আগেই বলে রাখছি, এখন কিন্তু কিছুদিন চুপটি করে শুয়ে থাকতে হবে বাড়িতে। ওসব হুড়োহুড়ি চলবে না।
মণীশ অপর্ণার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ডাক্তারের বারণ?
হ্যাঁ।
তাহলে কি আমি চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে গেলাম?
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আচ্ছা বাবা, খুব হুড়োহুড়ি কোরা, কিন্তু একটু সামলে!
মণীশ মেয়ের দিকে ফিরে তাকাল। একটু অচেনা লাগছে কি?
মুখখানা দুহাতে ধরে তৃষিতের মতো চেয়ে থেকে বলল, তুই কি খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিস।
কেন বাবা? তুমি তো মমাটেই বাইশ দিন হাসপাতালে।
তবু যেন মনে হচ্ছে বাইশ দিনেই তুই আমার চোখের আড়ালে একটু বড় হয়ে গেছি! কত বয়স হল তো! তেরো না।
অনু হি হি করে হাসে, মেয়েরা বয়স কমায়, কিন্তু বাবারা মেয়েদের বয়স আরও কমিয়ে দেয়, না বাবা? আমি তো ফিফটিন কমপ্লিট করেছি, তুমি যেন জানোনা!
উরে বাবা! ফিফটিন। তার মানে সিক্সটিন হতে তো আর দেরি নেই।
আই অ্যাম রানিং সিক্সটিন।
মাই গড্।
ডান কানে অপর্ণা খুব আস্তে করে বলে, ঋতু হয়। বয়স বসে আছে কিনা!
ওঃ ইউ আর ইমপসিবল।
অপর্ণা হেসে ফেলল খিলখিল করে। মণীশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বলল, তোমার কাছে ওরা কেউ কখনও বড় হবে না। ছেলেমেয়ে ছোটো নেই, শুধু তোমার কাছে এলেই সব ছোটো সাজে।
মণীশ গম্ভীর গলায় বলে, তার মানে কি অ্যাকটিং করে?
একটু করে।
শুনে আমার বুকে ব্যথা হচ্ছে।
মাগো! বলে আর্তনাদ করে ওঠে অপর্ণা, সত্যি নাকি?
মণীশ হাসে, সে ব্যথা নয়। অন্য রকম ব্যথা। দুঃখের ব্যথা।
আচ্ছা বাবা, কান মলছি। আর বলব না।
অনু নিষ্পলক বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে। মণীশ নিবিষ্ট চোখে কচি মুখখানা দেখল। অনুরও পনেরো! কিংবা গড ফরবিড—যোলো! চোখে কি একটু প্রাপ্তবয়স্কায় ছায়া।
মণীশ চোখ বুজল। অনেক বয়স হয়ে গেল বুঝি তার?
আবার চোখ চাইল।
অনু।
উঁ।
বড় হোসনি মা। এখনই বড় হোসনি। আর কিছুদিন শিশু থাক।
০২০. নতুন আফটার শেভ লোশন
নতুন আফটার শেভ লোশনটা মাখবার পর কিছুক্ষণ যেন আকাশে ভেসে রইল হেমাঙ্গ। এত হালকা লাগল মেজাজ, এত ফুরফুরে লাগল নিজেকে, যেন তার কোনও ভার নেই। সে আকাশে মেঘের মতো ভেসে আছে। গন্ধ যে মানুষকে এমন গ্যাস বেলুন করে দিতে পারে তার কোনও ধারণাই ছিল না হেমাঙ্গর। হল। সুগন্ধ সম্পর্কে তার বরাবরই আগ্রহ আছে। দেশ-বিদেশের কম সেন্ট তার সংগ্রহে নেই। সেগুলো মাখবার জন্য নয়, কারণ বেশী সুগন্ধ মাখলে তার অনেকটা এলার্জির মতো হয়। কিন্তু সে মাঝে মাঝে সাবধানে শিশি খুলে বা বাতাসে একটু স্প্রে করে নিয়ে গন্ধ শোকে। তাতে মনটা ভাল হয়ে যায়। কিন্তু এবার চারুশীলার পতিদেবতাটি এই যে আফটার শেভ লোখনটি এনেছে এটা সবাইকে জুতিয়ে দিয়েছে। এরকম দার্শনিক গন্ধ সে কখনও পায়নি।
সকাল দশটায় নিজের অফিসের চেম্বারে বসে হেমাঙ্গ একজন বিষয়ী লোকের সঙ্গে কথা বলছে। বিষয়ী লোকদের সে একদম পছন্দ করে না, কিন্তু এরাই তার অন্ন-বস্ত্রের যোগানদার। রোজই বিষয়ী লোকদের সঙ্গেই তার শতেক কথাবার্তা হয়। সে এদের আয় ও সম্পদকর বিষয়ক পরামর্শদাতা ও ছোটখাটো একজন ত্ৰাতা। তার সামনে বসে-থাকা লোকটির নাম বিরজু। প্রসাদ সাহা। পদবীটি বাঙালী হলেও লোকটি আসলে ইউ পি-ওয়ালা। স্ক্র্যাপ আয়রন কেনাবেচার ব্যবসাতে কয়েকশো কোটি টাকা খাটছে। লোকটি মোটেই লালাজীদের মতো বুদ্ধিমান, বিদ্যাহীন, ধূর্ত বিনয়ী, মোটা এবং হাত কচলানো টাইপের নয়। এর বাপ-দাদা অবশ্য তাই ছিল। কিন্তু এ রীতিমতো লেখাপড়া জানা স্মার্ট, ট্রিম এবং আধুনিক। ম্যানেজমেন্টে বিলিতি ডিগ্রি আছে। কিন্তু এর মনোজগতে কোথাও কোনও ভাবাবেগ, অলস-চিন্তা, বাহুল্য আনন্দ নেই। এ হল আদ্যন্ত ব্যবসায়ী। বাণিজ্যিক রোবট। এর যা পয়সা আছে তাতে হেমাঙ্গদের গোটা পরিবারকে অন্তত ষাট সত্তর বার কেনাবেচা করতে পারে। এইসব লোকদের খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হয়। একটু বেচাল বেফাঁস কথা বললেই ধরে ফেলবে।
কিন্তু আজ হেমাঙ্গ কোনও কিছুতেই মন দিতে পারছে না। সকাল আটটায় সে দাড়ি কামিয়েছে। অবশ্য আফটার। শেভটা সে দাড়ি কামানোর পরই মাখে না। স্নান করে খেয়ে বেরোনোর সময় মেখে নেয়। তাতে মদির গন্ধটা প্রায় সারাদিন তার মুখমণ্ডলে থেকে যায়। এয়ারকুলার লাগানো ঠাণ্ডা ঘরে গন্ধটা ঝিমঝিম করছে আর তাকে গ্যাস বেলুনের। মতো ওপরে এক স্বপ্নরাজ্যে ঠেলে তুলে দিতে চাইছে। ওঃ, ফরাসীরা গন্ধ চেনে বটে। গন্ধও যে যুগপৎ একটা বিজ্ঞান ও শিল্প সেটা যে এদেশের লোক কেন বোঝ না কে জানে। মিশরের মমিদের কবরে যেসব সুগন্ধের পাত্র পাওয়া গেছে তাতে নাকি এখনও সুগন্ধ পাওয়া যায়! হাজার দুহাজার বছরেও যা নষ্ট হয় না তা কী জিনিস দিয়ে তৈরি কে বলবে?
এ গন্ধটা ততদূর দীর্ঘস্থায়ী নয়। কিন্তু সকাল নটা থেকে লেগে আছে এবং দুপুর গাড়িয়ে বেলা তিনটে সাড়ে তিনটে অবধি থেকে যায়।
বিরজু প্রসাদ সাহা আয়কর সংক্রান্ত একটি বদখত ঝামেলায় পড়েছে, যা প্রতি বছরই পড়ে মিটে যায়। এই ঝামেলা। ও তার সমাধানের মাঝখানে কয়েক হাজার বা কখনও লক্ষ টাকাও হেমাঙ্গর কোম্পানি তুলে নেয়। ফলে এরা অর্থাৎ বি পি সাহার মতো লোকেরা–তাকে অর্থাৎ হেমাঙ্গর মতো লোকদের নিজেদের চাকরবার মনে করে। একটু ভদ্ৰস্থ চাকরযাদের চোখ রাঙানো যায় না বা চটানো যায় না। তবে আক্ষরিক অর্থে চাকরই।
