সেটাও তো চারদিন ধরে শুনছি। আর কবে?
অপর্ণা খুব কাছে ঘেঁষে চেয়ারে বসল। বড় ভালবাসায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। শান্তিনিকেতন থেকে সেবার একটা গাড়ি ভাড়া করে তাঁতিপাড়া গিয়েছিল তারা। এক জোড়া তসরের থান কিনেছিল অপর্ণা। পরে কাঁথাফোঁড়ের কাজ করিয়ে নেয়। সেই শাড়িরই একটা আজ পরে এসেছে। একটু সেজেও এসেছে।
মণীশ অপর্ণার হাতটা নিজের কপালে চেপে ধরে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, খুব ভয় পেয়েছিলে তোমরা?
পাবো না!
হোয়ট অ্যাবাউট দি ইয়ং রোগ? ওদের কী অবস্থা হয়েছিল?
বুঝতেই তো পারো। বাবা ছাড়া ওদের কি আর অস্তিত্ব আছে?
বুবকা?
পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। নিশুত রাতে অবধি এসে বসে থাকত নিচে। রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে জ্বালাতন করত ওদের।
বড্ড বাচ্চা রয়ে গেছে ছেলেটা। অ্যাডাল্ট হচ্ছে না কেন বলো তো!
তুমি ওকে অ্যাডাল্ট হতে দিচ্ছো কই? এখনও এমনভাবে আদর দাও যেন কোলের ছেলে। আঠারো বছর বয়স হল, এখন ওকে তোমার একটু ছেড়ে দেওয়া উচিত।
মণীশ একটা শ্বাস ফেলে বলে, ছেড়ে তো দিতেই হবে। বড় হচ্ছে, কত দিকে ইন্টারেস্ট দেখা দেবে, বাবা নিয়ে কি পড়ে থাকবে তখন?
মণীশের মনটা প্রশান্তিতে ভরে আছে। বুকার জগৎ এখনও সে অনেকটা দখল করে আছে। যতদিন পারবে মণীশ ততদিন এই নোংরা পৃথিবীকে অনুপ্রবেশ করতে দেবে না ছেলে এবং মেয়েদের ভিতরে।
কিন্তু পারবে কি মণীশ? আর পারবে কি?
এখানে আমার বড় হাফ ধরে যাচ্ছে। ডাক্তার কিছু বলছে না এখনও!
হয়তো আর দু-এক দিন।
মণীশ সবেগে মাথা নেড়ে বলে, অসম্ভব। আমি আর পারছি না। এখানে থাকলে আমার আবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
ডাক্তার যদি বারণ করে?
আমি সাবধানে থাকব। এখানে থেকেও তো কিছু হচ্ছে না। শুধু পড়ে থাকা। আমি পারছি না অপৰ্ণা। ছেলেমেয়ে ছাড়া আমি আর পারছি না।
অপর্ণা নিজ্জের মতোই তার মাথাটা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে। বলে, ওরকম করতে হয় নাকি? আমরাও তো তোমাকে ছাড়া যেন ডাঙার মাছ। ছেলেমেয়েগুলো অর্ধেক হয়ে গেছে দুশ্চিন্তায়।
ওরা কখন আসবে?
অনু আসছে। তুমি গতকাল খবরের কাগজ পড়তে চেয়েছিলে, এরা নাকি দেয়নি। ও চুরি করে খবরের কাগজ দিয়ে যাবে বলে কাগজ কিনতে গেছে।
মণীশ একটু হাসল, খুব বিচ্ছু, না?
খুব।
সারাক্ষণ তোমরা কি আমার চিন্তা করো?
শুধু চিন্তা! ধ্যান বলতে পারো।
তাহলে মাঝে মাঝে অসুখ করা তো ভালই। না?
ভাল, তবে পালা করে। এবার আমার হার্ট অ্যাটাক হোক আর তোমরা আমাকে নিয়ে ভাবো, কেমন?
ও বাবা, দরকার নেই। আচ্ছা, মহিলাদের হার্ট অ্যাটাক খুব কম হয়, না? কই, বেশী শুনি না তো!
হয় মশাই, হয়। হার্ট অ্যাটাক হয়, ক্যানসার হয়, সব হয়।
অনু আসছে না কেন?
আসবে।
নার্সটা ঘরে নেই, না?
না তো!
উইল ইউ গিভ মি এ কিস?
এ মা!
ইট উইল বি এ লাইফ সেভিং কিস। প্লীজ!
অপর্ণা সামান্য ঝুঁকে হালকা করে ঠোঁট ছোঁয়াল তার ঠোটে। তারপর বলল, তাড়াতাড়ি ভাল হও তো। মনের জোর করে হও। তোমাকে ছাড়া আমিও আর পারছি না। এই পাগলকে ছাড়া আমি যে পাগল হতে বসেছি।
আজ এখনই কি ভাবছিলাম জানো?
কী?
সেই প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনাটা। আমি তখন ফ্রি লান্স ফটোগ্রাফার, তুমি কলেজের ছাত্রী। সেই ট্রাম, গুলি, টিয়ার গ্যাস।
মাগো!
অথচ কত রোমান্টিক, তাই না?
অপর্ণা স্মিতমুখে হাসল, কী ভীষণ রোমান্টিক!
কতদিন ফটো তুলি না বলে তো! সেই যে বড় চাকরি পেয়ে গেলাম, ফটো প্যাশনটা চলে গেল। ক্যামেরা তিনটে পড়েই আছে।
আর ফটো তুলে কাজ নেই। অনেক হয়েছে।
আচ্ছা, আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে কারও ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ নেই?
সে তো তুমিই জানো। তোমার ছেলেমেয়েকে তুমি ছাড়া আর বেশী কে চেনে?
মণীশ একটু চুপ করে ভাবে। তারপর বলে, বোধ হয় অনুটার হবে। যে কবার ফটো তুলেছে চমৎকার হয়েছে। দাঁড়াও ভাল হয়ে ফিরে ওদের তিনজনকে তিনটে ক্যামেরা দিয়ে বলব, ইচ্ছে মতো ছবি তুলে আনো। যারটা ভাল হবে তাকে প্রাইজ দেবো!
আচ্ছা, সে হবেখন। ভাল হতে না হতেই পাগলামি শুরু হয়েছে তো!
পাগলামি নয়, এটা হল এক ধরনের ইনহেরিটেন্স। আমার প্যাশন, আমার হবি, আমার ট্রেন্ড অফ মাইভ সব কিছু ওদের দিয়ে যেতে না পারলে, ওদের ভিতরে আমি বেঁচে থাকব কি করে বলো? ওদের মধ্যে নিজেকে দেখতে না পেলে আমার যে সেটা মরে যাওয়াই হবে।
আমি তো একটুও আপত্তি করছি না। ওরা তোমার মতোই হোক। তুমি ভাল হও, তারপর সব হবে। ওরা তোমার কিছুই নষ্ট হতে দেবে না। বাবা যে ওদের কাছে কী তা তো জানোই!
মণীশ আবার অনুর খোঁজ নিতে মুখ খুলেছিল, অমনি একটা দুষ্টু হাসি মুখে নিয়ে দরজা ঠেলে অনু ঢুকল। একটু যেন পা টিপে। চারদিক চেয়ে দেখল। তারপর ঢোলা পোশাকের বুকের ভিতর থেকে একটা ইংরিজি কাগজ বের করে ছুটে এল মণীশের কাছে।
বাবা, কাগজ!
মণীশ তার দুর্বল দুটি হাতে মেয়েকে জাপটে নিল বুকের ভিতর। পরমুহূর্তেই ককিয়ে উঠল, উঃ!
অপৰ্ণা আতঙ্কের গলায় বলে, কী হল?
বুক পকেটে যন্ত্রটার কথা মনেই ছিল না। লেগেছে?
একটু।
অপ্ৰস্তুত অনু বলল, এ মা, আমারও মনে ছিল না বাবা। কী হবে? যন্ত্রটা বিগড়ে যায় যদি?
আরে দুর। কিছু হবে না।
তোমার হাৰ্টে তো চাপ পড়ল।
মোটেই না। তুই কাছে আয়।
অপর্ণা উদ্বেগের গলায় বলে কী যে করো না! কিছু ঠিক থাকে না তোমার! আমি তো ভয় খেয়ে গিয়েছিলাম।
আরে না, ভয়ের ব্যাপার নয়। আর বকবে না কিন্তু।
