চিরকালের অভ্যাস ছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠেই সিগারেট ধরানো। তারপর চা। তারপর খবরের কাগজ। তারপর …
দয়ার দান হিসেবে আয়ু ফিরে পাওয়া গেল। কিন্তু কত দিন? কতদিনের এক্সটেনশন? আবার ব্যথা আসবে। অন্ধকার আসবে। হারিয়ে যাবে পৃথিবী। একদিন মণীশ আর এক্সটেনশন পাবে না।
জানালার গায়ে মৃদু টোকার মতো শব্দে চোখ চায় মণীশ। ইস! বৃষ্টি হচ্ছে। ঝাপসা হয়ে গেল কলকাতার আকাশরেখা। এই বৃষ্টিতে ভিজিটিং আওয়ার্সে কেউ আসবে কি? বুকা, ঝুমকি, অনু বা অপৰ্ণা? সবাই একসঙ্গে আসে না। একে এক, দুইয়ে দুইয়ে আসে। কিন্তু ওদের সবাইকে একসঙ্গে দেখতে বড় ইচ্ছে করে মণীশের।
সিস্টার, ক্যান ইউ টেল মি একজ্যাক্টলি হোয়েন আই উইল বি রিলিজড?
ভেরি সুন স্যার।
আই ওয়ান্ট এ ডেট।
প্লীজ আঙ্ক দি ডক্টর স্যার।
আজ সকালে কে আসবে? ভাবতে ভাবতে চোখ বুজল মণীশ।
অনেকদিন আগে এক মেঘলা দুপুরে এক ক্ষিপ্ত জনতার ওপর পুলিস লাঠি চার্জ করছিল। এসপ্ল্যানেড ইস্টে। কার্জন পার্কের ফেনসিং-এ উঠে একজন ফ্রি লান্স ফটোগ্রাফার দৃশ্যটা তুলছিল। একজন পুলিশ হঠাৎ তেড়ে এল তার দিকে। হাঁটুতে খটাং করে এসে পড়ল লাঠি। ফটোগ্রাফারটি ব্যথায় চিৎকার করে পড়ে গেল, তারপর অন্য পায়ে পুলিসটাকে একটা লাথি কষিয়ে দিল। খুবই সাহসের কাজ। পুলিসটা পিস্তলে হাত দিয়েছিল। হয়তো মেরে ফেলত। কিন্তু সেই সময়ে মার-খাওয়া কিছু লোক ছিটকে এল এদিকে। তাদের বেপরোয়া হতচকিত ধাক্কায় পুলিশটা সরে গেল। ফটোগ্রাফারটি উঠে দাঁড়াল। হাঁটুতে সাঘাতিক ব্যথা, চোখে জল আসছে, ঠিক সেই সময়ে দুটো গুলির আওয়াজ। আর্তচিৎকার।
সেই দুপুরে পুলিস ঠিক দু রাউন্ড গুলিই চালিয়েছিল। তাতে চলন্ত ট্রামের মধ্যে বসে থাকা একটি লোক মারা যায়। ফটোগ্রাফারটি তার জল-ভরা চোখেও দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছিল। অন্য ফটোগ্রাফাররা দেখেছিল একটু দেরিতে।
ফটোগ্রাফারটি তার জখম না নিয়ে কাছ-ঘেঁষা ট্রামটায় উঠে পড়ল। তখন হুড়োহুড়ি করে যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে। আর জখম লোকটা গোঙাচ্ছে, জল! জল! তখনও পড়ে যায়নি। তবে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ট্রামগাড়ির সীট, মেঝে। চকাচক দুতিনটে ফটো তুলে নিল সে। আর দেখতে পেল, লেডীজ সীটে সাদা মুখে একটি মেয়ে বসে আছে। এত ভয় পেয়েছিল যে, পালাতে অবধি পারেনি।
আরে! পালান, পালান। আসুন শিগগিরই বলে ফটোগ্রাফার গিয়ে মেয়েটির হাত ধরে টেনে নামিয়ে নিয়েছিল ট্রাম থেকে। বাইরে টিয়ার গ্যাসের ধোয়া, লোকজন পালাচ্ছে, পুলিস তেড়ে যাচ্ছে যাকে পাচ্ছে সামনে তার দিকে। দমাস দমাস করে লাঠি পড়ছে।
অন্তত তিনজন পুলিশ লাঠি তুলেছিল। সঙ্গে মেয়েটি ছিল বলে বেঁচে গেল ফটোগ্রাফারটি। পুলিশ মেয়ে দেখে মারেনি।
তীব্র টিয়ার গ্যাসে প্রায় অন্ধ চোখে ছুটতে ছুটতে তারা রেড রোডের দিকে চলে যেতে পেরেছিল। কোথায় থাকেন আপনি?
মেয়েটি কোনও জবাব দিতে পারেনি। শুধু কাঁপছিল। ভয়ে, অবিশ্বাসে।
নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে ঘাসে বসাল ফটোগ্রাফারটি! জিরোতে দিল। দুজনেরই চোখ ফুলে ঢোল। দুজনেই হাফাচ্ছে।
অনেকক্ষণ বাদে মেয়েটি তার ঠিকানা বলতে পারল।
একা যেতে পারবেন?
না। ভীষণ ভয় করছে।
কিন্তু আমাকে যে পত্রিকা-অফিসে যেতে হবে। এই ফটো কাল কাগজে বেরোবে।
মেয়েটা কাঁদছিলও। কিছু বলল না।
ঠিক সেই সময়ে আকাশ যুঁড়ে বৃষ্টি নেমেছিল। খুব বৃষ্টি। সাঙ্ঘাতিক বৃষ্টি।
আরে, ভিজবেন যে! উন! দৌড়োন! ময়দানে কোনও ক্লাবের টেন্টে ঢুকে পড়তে হবে।
মেয়েটি ওঠেনি। ছোটেওনি। বসে রইল মুখ নিচু করে। ক্যামেরা ভিজছিল।
ফটোগ্রাফারটি চলে যেত পারত। যায়নি শেষ পর্যন্ত। মেয়েটির সঙ্গে সেও ভিজেছিল ক্যামেরা সমেত।
সেই বিকেলে বৃষ্টি আর থামেনি। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আন্দোলন থেমে গেল, পুলিসের হামলা বন্ধ হল, জনসাধারণ পালাল নিরাপদ আশ্রয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই মেয়েটিতে তার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিল তরুণ ফটোগ্রাফার। খানিকটা বাসে, খানিকটা হেঁটে।
তার ফটো পরদিন বেরিয়েছিল কাগজে। নাম সমেত। আরো অনেকেই ফটো তুলেছিল সেদিনকার হাঙ্গামার। তবে গুলি-খাওয়া লোটার অমন নিখুঁত ছবি আর কেউ পায়নি। বেশ নাম হয়েছিল তার। পায়ের জখম সারতে কয়েকদিন সময় লেগেছিল।
অফিসের ঠিকানায় প্রায় সাত দিন বাদে চিঠিটা এল। মেয়েলি হস্তাক্ষর, আমি সেই মেয়েটি, যে সেদিন চোখের সামনে লোকটাকে মরতে দেখে পাথর হয়ে গিয়েছিল। বোধ হয় আমার হার্টফেল হয়ে যেত, আপনি আমাকে জোর করে ট্রাম থেকে নামিয়ে না আনলে। আমার বোধ হয় জ্ঞানও ছিল না। কিরকম যে হয়ে গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে আমার জ্বর হয়েছিল, জানেন? তবু ওই বৃষ্টিটাও বোধ হয় দরকার ছিল। ভিজে ভিজে মাথা ঠাণ্ডা হয়েছিল, শরীরে সাড়া ফিরে এসেছিল। আপনার সঙ্গে আর একবার দেখা হতে পারে কি? আমার যে মুখোমুখি একবার ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার আপনাকে! আর কী অভদ্র আমি সেদিন তো এক কাপ চাও অফার করা হয়নি আপনাকে?
ফটোগ্রাফারের সময় হয়েছিল আরও সাত দিন বাদে। তারপর আর সময়ের অভাব হয়নি।
আজ সামান্য একটা উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলে মণীশ সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল। সেই ভয় খাওয়া মুখ। সেরকমই সুন্দর আছে আজও।
কেমন আছে আজ।
মণীশ হাসল, একটা কিরকম থাকা বলো তো? ডাক্তার ছুটি দিচ্ছে না কেন?
এবার দেবে।
