কাকে চাই।
কৃষ্ণজীবনবাবু কি আছেন? বীণা বলল। এই কি তার সেই ভাইঝি? চেনেও না তো বীণা।
বাবা! বাবা তো ইংল্যান্ডে।
বীণার প্রায় বসে পড়ার মতো অবস্থা। দাদা না থাকলে তো এ বাড়িতে তার কোনও অভ্যর্থনাই নেই।
বীণা মলিন হেসে বলল, তুমি বুঝি মোহিনী?
হ্যাঁ। আপনারা কোথা থেকে আসছেন।
বনগাঁ। আমি তোমার পিসি হই। ছোটো পিসি। পিসি?
মাই গড! তা হলে আসুন ভিতরে, মাকে ডাকছি।
ব্যস্ত হয়ো না। আমরা বেশিক্ষণ থাকব না। বিকেলের গাড়ি ধরে ফিরে যাবো।
আসুন তো ভিতরে। মা আছে।
রিয়া ছিল। ওদের সাজানো গোছানো মস্ত লিভিং কাম ড্ৰয়িং রুমে উজবুকের মতো কিছুক্ষণ বসে থাকার পর রিয়া
এল।
কে, তুমি বীণাপাণি না?
হ্যাঁ বউদি। বলে দুজনে উঠে প্রণাম করল।
রিয়া যে খুব অপ্রসন্ন হয় তা নয়। তবে একটু আলগোছ ভাব। বলল, ও তো নেই।
শুনলাম। আমরা এমনি দেখা করতে এসেছিলাম। তোমরা ভাল তো!
ভালই।
দু-চারটে কথাবার্তা, চা আর সন্দেশ খাওয়ার পর বাইরের লোকের মতোই চলে এল তারা। আর ফেরত এল সব দুশ্চিন্তার আকর সেই ডলার বান্ডিলও।
০১৯. এনি সার্জারি অন মাই হার্ট
ওয়াজ দেয়ার এনি সার্জারি অন মাই হার্ট, সিস্টার?
সার্জারি? ও? নো স্যার, দেয়ার ওয়াজ নো ওপেন হার্ট সার্জারি। ওনলি মেডিসিন।
আই ফিল এ সর্ট অফ নাম্বনেস ইন মাই হার্ট। ইজ দ্যাট ও. কে?
ইউ আর নাউ ও. কে স্যার।
মণীশ কিছু অবিশ্বাসের চোখে পবিত্র সাদা পোশাক পরা তরুণী নার্সটিকে দেখছিল। কেরলের মেয়ে। খ্ৰীষ্টান, কালো, হাস্যময়ী। ব্রেকফাস্টের ভূক্তাবশেষ ট্রে গুছিয়ে নিচ্ছে। ডানদিকের পর্দাটা সরানো। আজও মেঘলা বিষণ্ণ আকাশ। গোমড়া। ভোর। মণীশের দিন কি ভাবে কাটছে কে তার হিসেব রেখেছে। গুনতির দিন একরকম। কিন্তু ব্যথার দিনগুলি? সংজ্ঞাহীনতার দিনগুলি? দুশ্চিন্তার দিনগুলি? সব কি একরকম? ব্যথাতুর দিন সবচেয়ে ধীরে কাটে। কাটতেই চায় না। এক একটা সেকেন্ড যেন একটি একটি ঘন্টা। এক একটি ঘন্টাই যেন এক একটি দিন বা মাস। আর দিন যেন বছর বা দশক বা কল্পান্ত।
অনেক ঘুমিয়েছে মণীশ। শুধু ঘুম আর ঘুম। জাগলেই ডাক্তার আবার সস্নেহে ঘুম পাড়িয়ে দিত। তার ধারণা হয়েছিল, ওইভাবে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেই তার হৃৎপিণ্ডে ছুরি চালিয়েছে ডাক্তার।
জ্ঞান ফেরার পর সে অবশ্য ভাল করে খুঁজে দেখেছে, তার বুকে কোন কাটা দাগ নেই। তবে বুকের ভিতরটা অন্যরকম। মাঝে মাঝে খিল ধরে থাকে। মনে হয়, হার্ট থেকে আছে। ধুকধুক নেই।
পৃথিবী হারিয়ে গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। হারিয়ে গিয়েছিল তার প্রাণাধিক প্ৰিয় পুত্ৰ-কন্যা। তার বউ। তার চাকরি। তার সুখ-দুঃখ আনন্দ। ওই কটা দিন আর ফিরে পাবে না মণীশ। চিরকালের মতো হারিয়ে রইল।
মে আই হ্যাভ এ নিউজপেপার?
কেরলের মেয়েটি ছোটো করে মাথা নাড়ল, নো স্যার। সরি। দি ওনার্ল্ড ইজ লস্ট টু মি। আই ওয়ান্ট টু বি আপডেটেড। আঙ্ক দি ডক্টর স্যার, প্লীজ।
থ্যাংক ইউ।
পৃথিবীর কোনও খবরই রাখে না মণীশ। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে কত কী না জানি ঘটে যাচ্ছে। ঘটে গেছে! অন্তহীন ঘুমের মধ্যে পৃথিবী কতবার পাশ ফিরল! খবরের কাগজে এমন কী থাকবে, যাতে তার হৃৎপিণ্ড চাপ পড়তে পারে?
মে আই হ্যাভ এ বুক?
এনি বুক স্যার? আই ক্যান গিভ ইউ এ বাইবেল। আই হ্যাভ ওয়ান উইথ মি।
ইউ ড়ু ক্যারি এ বাইবেল?
মেয়েটি লাজুক হাসে, আই ড়ু স্যার।
ইউ আর এ রিলিজিয়াস পারসন।
ইট ইজ এ গুড কম্পান।
দেন, গিভ ইট টু মি। ইট উইল ড়ু।
মেয়েটি ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে চলে গেল। ফিরে এল একখানা কালো মলাটের বাইবেল নিয়ে। এরকম বাইবেল বড় বড় হোটলের ঘরে ড্রয়ারে রেখে দেওয়া হয়। ইচ্ছে করলে যে-কেউ নিয়েও যেতে পারে। বাইবেল চুরি করলেও দোষ হয় না। পৃথিবীময় বাইবেল ছড়িয়ে দেওয়ার এ এক চমত্তার কায়দা।
মণীশ অবসন্ন হাতে বাইবেলখানা বালিশের পাশে রেখে দিল। একটু জল খেল।
মে আই টক নাউ ফ্রিলি?
নট টু মাচ স্যার। ইফ ইউ উইশ, আই মে রীড দি বাইবেল টু ইউ।
বাইবেল ইজ অ্যান ওল্ড বুক। আই ওয়ান্ট সামথিং নিউ। সামথিং মোর আপ-টু-ডেট।
বাইবেল ইজ নেবার ওল্ড স্যার। ইউ ইজ অলওয়েজ নিউ।
অল রাইট। রীড ইট টু মি অ্যানাদার টাইম। ইজ দি সামার ওভার?
নো স্যার। দি মনসুন ইজ দেয়ার। ভেরি হেভী মনসুন।
ড়ু ইউ নো এনিথিং অ্যাবাউট দি ক্যালকাটা ফুটবল লীগ?
মেয়েটি হাসে, নো স্যার। আই অ্যাম নট স্পোর্টিং এনাফ।
টেল মি হোয়াট হ্যাপন ইন দি ওয়ার্ল্ড হোয়েন আই ওয়াজ ইন স্লিপ।
নার্থিং মাচ।
এনি গ্রেট লীডার ডেড অর কিলড্?
নো স্যার।
এনি বিগ প্লেন ক্র্যাশ।
নো স্যার।
এনি আর্থকোয়েক?
নো স্যার।
ইউ কেপ্ট দি ওয়ার্ল্ড ইন অর্ডার হোয়েন আই ওয়াজ অ্যাস্লিপ?
মেয়েটি খিলখিল করে হাসে, ইট ওয়াজ ইন অর্ডার।
ওনলি মি আইট অফ অর্ডার?
নট ভেরি মাচ। ইউ হ্যাড এ স্মল অ্যাটাক।
ইউ আর লাইং। আই হ্যাড এ ম্যাসিভ অ্যাটাক।
নো স্যার।
ডিড আই বিহেভ ওয়েল হোয়েন ইন পেইন?
ইউ ওয়্যার নাইস স্যার।
ওয়াজ আই ইন ডেলিরিয়াম?
নো স্যার।
আই হ্যাড ড্রিমস, ইউ নো। ব্যাড ড্রিমস।
ঘরটার দুটো ভাগ। একটা যেন বেডরুম, অন্যটা যেন বসবার। বসবার ঘরে তাজা ফুল সাজিয়ে রাখা, সোফা সেট পাতা। এয়ারকন্ডিশনড় ঘরে কোনও শব্দ নেই। ভারি ঝকঝকে তকতকে। তার শ্লিপিং স্যুটের বুকপকেটে একটা ভারী যন্ত্র রাখা। রিমোট কন্ট্রোলে চব্বিশ ঘন্টা ই সি জি হচ্ছে বোধ হয়। কে জানে কী!
