পগা আমার খুব দোস্ত ছিল, জানো বীণাদি! যেদিন খুন হল সেদিনও সন্ধের পর কিছুক্ষণ আড্ডা মেরেছিল আমার দোকানে এসে। টিপ টপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল বলে বেশিক্ষণ কথা হয়নি। তারপর খুব ঝনঝম করে নামল। আমি দোকান গুটিয়ে ফেলেছিলাম। চায়ের দোকানে গিয়ে আজ্ঞা দিতে লাগলাম, আর পগা গেল জুয়ার আজ্ঞায়।
বীণার বুকে তোলপাড় হচ্ছে। পগা কি ওকে কিছু বলেছিল? বলেছিল কি যে, বীণার বাড়ি গিয়েছিল। বীণার গলা যেন আটকে আসতে চাইছে। তবু অভিনয়ের জোরে পেরিয়ে যেতে চাইল বিপদটা, ইস্! যদি তোর সঙ্গে থাকত তা হলে হয়তো বেঁচে যেত।
পল্টু মাথা নেড়ে বলে, বাঁচত না। হয়তো সেদিন বেঁচে যেত, পরদিন মরত। ওকে দেগে রেখেছিল যে। তোমার সঙ্গে ওর কেমন ভাব ছিল?
ভাব! ভাব আবার কি? কী যে বলিস। মাঝে মাঝে যেত, চেনাজানা ছিল। সে তত কত লোকের সঙ্গে আছে।
পল্টু একটু বিরস মুখে বলল, সে দিন অনেক ডলার ছিল ওর কাছে।
কাঁপা বুকে বীণা বলে, কি করে জানলি?
কি করে আবার! এই বলছিল।
বীণার চোখের সামনে একটা পর্দা নেমে এল যেন। আর অভিনয় করে কী হবে? পল্টু বোধহয় সব জানে।
কিন্তু সম্পূর্ণ বেহাল মাথা নিয়েও বীণা অভিনয় করে যেতে ছাড়ল না, আর বলিস না। এখন ডলার শুনলেই আমার ভয় করে।
পল্টু হাসল। কেমন যেন হাসিটা।
বীণার বুকের কাপন রয়ে গেল। ঘুম হতে চায় না। খেতে বসলে ভিতরটা কেমন যেন ঘুলিয়ে ওঠে। অম্বলের অসুখ তো ছিলই। সেটা যেন বাড়ল।
পরদিন রাতে পাশাপাশি শুয়ে একটু সাহাগের ভাব করল নিমাইয়ের সঙ্গে। তারপর বলল, জানো, আমি একটা লটারির টিকিট কিনেছি।
তাই নাকি? ও কিনে কী হয়?
যদি ফার্স্ট প্রাইজটা পেয়ে যাই তা হলে?
নিমাই বলে, ওই লোভানিই তো মানুষকে দিয়ে কত অকাজ করিয়ে নিচ্ছে।
আহা, আমি বুঝি লোভী?
আমরা সবাই কম-বেশি লোভী। সে কথা বলছি না। কেটেছে বেশ করেছে। তবে প্রাইজের আশায় বসে থেকে না। পল্টু বলল তাই কিনলাম। আচ্ছা, পৰ্টু ছেলেটা কেমন বলে তো!
কেন, ভালই।
কতটা ভাল?
নিমাই হাই তুলে বলে, ওই যেরকম হয় আর কি! ভাল থাকতে চায়, পারে না। চারদিকে নানা লোভানি তো।
তোমার সঙ্গে খুব ভাব বুঝি?
আছে একটু।
কিছু বলে-টলে তোমাকে।
অবাক হয়ে নিমাই বলে, কী বলবে? কিসের কথা বলছো?
এই আমাদের কথা-টথা!
তা কত কথা হয়। সব আগড়ম-বাগড়ম কথা। এক-এক দিন এক-একটা বিষয় উঠে পড়ে। তাই নিয়ে খানিক কথা হয়।
লটারির টিকিট ছাড়া ওর আর কিসের ব্যবসা?
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, চোরাই কারবার আছে। যখন যেটা পরে করে। লটারির টিকিটে আর কপয়সা হয়।
হয় না?
হয়ও। মাঝে মাঝে এক-আধটা প্রাইজও লেগে যায়। সে কদাচিৎ। আজকাল লটারিওয়ালাও তত বড় কম নেই।
আচ্ছা আমরা যদি একটা কাজ করি তা হলে কেমন হয়?
কি কাজ।
ধরো যদি বনগাঁ ছেড়ে চলে যাই অন্য কোথাও?
কোথায় যাবে? পালপাড়া নাকি? না বিষ্টুপুর?
যদি ধরে তাই যাই? একেবারে?
সে কী! এখানকাল বাস তুলে দিতে চাও?
কেন, এখানে আমাদের কে আছে?
তোমার যাত্রার দল, তোমার নিজের বাড়ি, এসব কষ্ট করে করলে সে কি ছেড়ে যাওয়ার জন্য?
আমার যে ভাল লাগছে না।
দুর পাগল! বলে নিমাই হাসে, আমাদের কি এত খামখেয়ালি করলে চলে?
বীণা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, তা হলে চলে, কোথা থেকে ঘুরে আসি।
কোথায় যাবে।
কাশী বৃন্দাবন নয় গো, কলকাতা যাবো।
কলকাতা! তা যেতে পারো। উঠবে কোথায়?
উঠব না। সকালে যাবো, বিকেলে চলে আসবে।
তা যেতে পারা যায়।
একটু বড়দার সঙ্গে দেখা করে আসব।
নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলে, সে তো মস্ত কথা। শুনেছি কৃষ্ণজীবনবাবু এখন মস্ত লোক, সাততলায় ফ্ল্যাট।
ঠিকানা আছে।
সে তো আছে। চিনতে চাইবে কি?
মায়ের পেটের বোনকে চিনবে না?
হয়তো চিনবে। সে চেনার কথা বলছি না। বলছি পাত্তা দেবে কি না। একে তো অবস্থার তফাত, তার ওপর তোমরা সব ঝগড়া করে তাড়িয়েছিলে লোকটাকে।
সংসারে ওরকম কত হয়। আবার জোড়াও লাগে সম্পর্ক।
এটা লাগবে কি না কে জানে!
আমার দাদা কিন্তু মানুষটা বড় ভাল। অপমান আমিও করেছি বটে সে বউদির জন্য। বউদি আমাদের এখন ছোটো নজরে দেখত।
এখনও কি তাই দেখবে না?
দাদা দেখবে না। দাদাকে আমি চিনি।
তা হলে যাই চলো একদিন, মানুষটাকে একবার দেখেছিলাম অনেক আগে। কাছ থেকে দেখে একটু পেন্নাম করে আসব। তুমি যে অত বড় একটা মানুষের বোন তা ভাবলে আমার গায়ের রোয়া দাড়িয়ে যায়।
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, অত বড় মানুষ, তায় আপনজন, তবু আমাদের কপালে তাকে আর রাখতে পারলুম কই নিজের জন হিসেবে। ওই রাক্ষুসীই তো গাপ করে নিল।
আহা ওরকম বলতে নেই। সব দিক বিবেচনা করতে হয়। তোমার বউদিও তো আবার লেখাপড়া জানা মেয়ে।
ছাই!
দিন চারেক বাদে তারা সত্যিই গিয়েছিল কলকাতায়। মাটি খুঁড়ে ডলারের বান্ডিল বের করে হাতব্যাগে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বীণাপাণি। তার ইচ্ছে ছিল বড়দাকে ডলারগুলো দেবে। বলবে, তুই বিদেশে যাস, তোর কাজে লাগবে। এর বদলে আমাকে টাকা দে।
দাদা নিরাপদ মানুষ।
ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে তারা যখন পৌঁছলো তখন বিকেল। লিফটে উঠতে ভরসাই হল না তাদের। এ যন্ত্র তারা চালাতে জানে না। দুজনে সাতলায় উঠল হেঁটে, ঘেমে, পসে। ডোরবেলটা অবশ্য বাজাল, তবে ভয়ে ভয়ে।
বীণা যথাসাধ্য সেজে এসেছে, যথেষ্ট ফিটফাট করে এনেছে নিমাইকেও। তবু দরজা খুলে যে সুন্দরপানা মেয়েটা উঁকি দিলে সে যেন খুব অবাক হয়ে দেখল তাদের।
