পাপ হল? তা হোক। ওই ইঁদুরগুলো বড় হয়ে কি মানুষের কম সর্বনাশ করত। পাপের বিচার করে বীণার কাজ নেই। এ সংসারে দুটো মানুষের মধ্যে একটা পাপী, আর একটা সাধু। কিন্তু পাপীটাই সংসার চালায়, আর সাধুটার এক পয়সারও মুবোদ নেই।
গর্তটা বুজিয়ে দিয়ে ওপরটা দুরস্ত করে পুরো ঘটাই গোবরমাটি দিয়ে লেপে ফেলল বীণাপাণি। গর্তের গহীনে রইল মাটির ঘটের ভিতরে ডলার আর পাউন্ডের প্যাকেট। ওপরে কাঠের তক্তা বসিয়ে তার ওপর চাল রাখার মাটির জালাটা বসিয়ে দিল সে। যতদূর সম্ভব নিখুঁত হল বটে কাজটা, কিন্তু ভয়টা রয়েই গেল।
সেই থেকে বীণাপাণি মনে শান্তি নেই। সবচেয়ে বড় অশাস্তির কারণ হয়ে রইল পল্টু। যদি বলে দেয়? কিংবা যদি ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে?
কয়েকদিন অপেক্ষা করল বীণাপাণি। তারপর একদিন নিজেই সন্ধে রিহার্সালের পর বাজারের দিকে গেল। দু-চারটে জিনিস কিনল। তারপর যেন এমনিতেই এসে পড়েছে এমন ভাব দেখিয়ে পল্টর স্টলটার সামনে দাঁড়াল।
এই পল্টু, ভুটান লটারিতে নাকি অনেক প্রাইজ দিচ্ছে?
হ্যাজাকের আলোয় পল্টু বসে একটা বইগোছের কিছু পড়ছিল। লোজন নেই। মুখ তুলে হাসল, হা। এবার ফার্স্ট প্রাইজ এক কোটি। নেবে নাকি টিকিট?
দূর! আমার লটারির কপাল নেই। শুধু পয়সা নষ্ট।
বহু লোকের পয়সা দিয়েই তো দু-চারজন লাখখাপতি কোটিপতি হয়।
পল্টু বেশ ছেলে। বাইশ-তেইশ বছর বয়স, পাতলা ছিপছিপে চেহারা, রংটা ফর্সা, ওর মিস্ত্রী দাদার মতো নয়। চোখে-মুখে লেখাপড়ার ছাপ আছে।
বীণার বুক দুরদুর করছে তবু। কথা খুঁজে পাচ্ছে না। পল্টু কিন্তু সন্দেহ করছে কি না তাও বুঝতে পারছে না। বুকের এই ঢ়িবটিবিনি নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?
বীণা একটু উদাস গলায় বলে, কোটি টাকা প্রাইজ হলে টিকিটেরও তো দাম অনেক।
হ্যাঁ। একশো টাকা করে।
না ভাই, আমাকে বরং একটা লাখ টাকার প্রাইজের টিকিট দে। কেটে দেখি।
আগে তো খুব লটারির টিকিট কিনতে, আজকাল কেনো না তো!
কেটে কেটে হদ্দ হয়ে ছেড়েছি।
পল্টু তার পেতে রাখা টিকিটের সারি থেকে বেছে একখানা দিয়ে বলল, এটা পাঁচ টাকার টিকিট। কাল খেলা। ফার্স্ট প্রাইজ পাঁচ লাখ টাকা।
পাঁচটা টাকা জলে গেল। তবু নিল বীণা। পঙ্গু বোধহয় ডলারের কথা ভুলে গেছে। জয় মা কালী! ওর যেন ব্যাপারটা একদম মুছে যায় মাথা থেকে। কী বোকামির কাজই যে হয়েছিল বনগাঁয়ে ডলার ভাঙানন।
পল্টু বীণার পাঁচটা টাকা নিয়ে আবার বইটা খুলতে যাচ্ছে, বীণাও চলে আসার জন্য পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ পল্টু একটু চাপা গলায় বলল, ডলার আর কত আছে?
বীণা এমন চমকে উঠল যে হৃৎপিণ্ড আর একটু হলেই থেমে যেত। সে ফ্যাকাসে মুখে বলল, কিসের ডলার?
পল্টু তেমনি চাপা গলায় বলে, থাকলে দিও। ন্যায্য দাম পাবে। কেউ জানতে পারবে না।
অভিনয় ছাড়া বীণা আর কি পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে অভিনয় করার কথা ভুল হয়ে যায়। বিশেষ করে বিপদে পড়লে। কয়েক লহমার ভুল শুধরে নিল বীণা। একটু মিষ্টি করে হেসে বলল, দুর পাগলা! ডলার কোথায় পাবো? বড়দার সঙ্গে কি আর দেখা হয় নাকি আমার? সেই একবার দেখা, বিয়ে বাবদ আশীর্বাদ দেওয়া হয়নি, পঞ্চাশ ডলার দিয়ে বলেছিল, ভাঙিয়ে কিনে নিস কিছু। মানিব্যাগে টাকা তখন ছিল না ডলার ছিল। সদ্য বিলেত থেকে ফিরেছে তখন।
ডায়ালগ যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল বীণা।
পল্টু বিশ্বাস করল কি না মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। বলল, তোমার বড়দার কথা খুব শুনি। খুব নামকরা লোক নাকি?
কার কাছে শুনিস? বড়দা তো আর নেতা নয়।
শুনি নিমাইদার কাছে। মাঝে মাঝে নিমাইদা এসে আজ্ঞা দিয়ে যায়। তার মুখেই শুনেছি, তোমার বড়দা সাংঘাতিক লোক।
বীণা মলিন মুখে বলে, হ্যাঁ।
তা হলে তোমার এইখানে পচে মরার দরকার কি? বড়দাকে বললে নিমাইদার একটা কাজও তো হয়ে যায় বোধহয়।
কে বলবে বাবা! আর তোর নিমাইদারই বা কোন বিদ্যে আছে?
আর কিছু না হোক, নিমাইদা তো বিশ্বাসী লোক।
ওইটুকুই।
ওটা কি কিছু কম হল? আজকাল বিশ্বাসী মানুষ কোথায় পাবে?
এটা যে কলিকাল তা জানিস? এখন যত পাজি লোক তত তার কদর।
পল্টু একটু হাসল। তারপর বলল, ঠিক আছে, বড়দার কাছ থেকে ফের যদি ডলার পাও তো দিও।
তুই ডলার নিয়ে কী করিস?
পল্টু মৃদু মৃদু হাসছিল। বলল, যা সবাই করে। খদ্দের আছে গো। ডলার এখন দুনিয়াটাকে চালাচ্ছে।
বীণা এবার হঠাৎ খুব দুঃসাহসী একটা কাজ করে বসল। ভাবল, সন্দেহভঞ্জন করার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর আসবে না। যা হওয়ার হবে। সে বুক ঠুকে বলল, ডলার নিয়ে যা কাণ্ড হয়ে গেল! ও বাবা, ওই নাম শুনলেই ভয় করে।
কী কাণ্ড। কেন, পগা খুন হল না।
পল্টু মাথা নেড়ে বলে, সেটা মোটেই ডলারের জন্য নয়। ওদের জুয়ার আড্ডার পুরনো কাজিয়া। খুনটা আমার সামনেই হয়, ওই বটতলায়। দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার আগে আমরা তিন বন্ধু বনমালীর দোকানে চা খাচ্ছিলাম।
দেখেছিস?
স্পষ্ট। তবে খুনিয়াদের নাম-টাম জানতে চেও না। ওসব বলতে পারব না।
না বাবা, জানতে চাই না। তবে মাঝে মাঝে পগা আমার কাছে একটা প্যাকেট রেখে আসত। তাতে কী থাকত কে। জানে বাবা! ভয়ে তো কখনও খুলে দেখিনি। এখন শুনছি তাতে নাকি ডলার থাকত। তাই নিয়ে কত হাঙ্গামা, ঘর সার্চ হয়ে গেল।
তাই নাকি?
যা ভয় পেয়েছিলাম!
পল্টু হঠাৎ কেমন একটা গলায় বলল, তোমার কাছে ছিল না বুঝি?
আবার চমৎকার ভালমানুষের পার্ট করে গেল বীণা, কোথা থেকে থাকবে। তার এক মাস আগে থেকেই যে পগার সঙ্গে দেখা নেই।
