সেদিন এক চুলের জন্য বেঁচে গেছে বীণাপাণি। শেষ রাত্তিরে যখন কাকা তার স্মাগলার কয়েকজন সাকরে নিয়ে এসে হাজির হল সেদিনই হয়ে গিয়েছিল বীণার। ভয়ে সে দরজা খুলবে কি, নিমাইয়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে ফেলেছিল, আমার বড় ভয় করছে।
নিমাই অবাক হয়ে বলল, ভয়ের কী ও তো কাকার গলা।
তবু করছে। তুমি দরজা খুলো না।
নিমাই ডবল অবাক হয়ে বলে, খুলবো না! বলে কী? কাকা আমাদের অন্নদাতা, কোন বিপদে পড়ে এসেছে, দরজা না খুললে কি হয়? বলে নিমাই সাড়া দিয়ে বলল, কাকা নাকি? এই খুলছি।
দরজার শব্দ বন্ধ হল।
নিমাই যখন মশারি তুলে বেরোচ্ছে, তখন বীণাও চৌকির অন্য পাশ দিয়ে নামল। তারপর নিচু হয়ে চৌকির তলা থেকে কাপড়ে বাঁধা একটা পুঁটলি টেনে পট করে পিছনের জানালা গলিয়ে কচুবনে ফেলে দিল।
কাজটা ভেবেচিন্তে করেনি বীণা। তবে খুব বিবেচনার কাজই হয়েছিল।
নিমাই দরজা খুলতেই কাকা বলল, কিছু মনে কোরো না ভাই, আমরা বড় জরুরি কাজে এসেছি। বীণাকে ডাকো।
বীণার বুকের ঢিবঢ়িব সেই থেকে শুরু। সে ঘুমকাতুরে মুখ নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল, কী কাকা? এত সকালে কী ব্যাপার গো? কোনও বিপদ নাকি?
কাকা গম্ভীর মুখে বলল, কিছু লুকিও না। পগা কি তোমার কাছে মাঝে মাঝে বিদেশী টাকা রেখে যেত?
বীণা একটু হ করে চেয়ে বলল, বিদেশী টাকা? তা কি করে বলব! মাঝে মাঝে একটা প্যাকেটমটে কি যেন রাখতে দিত। খুলে তো দেখিনি। হেরোইন-টেরোইন ভেবে ভয়ে আধকানা হয়ে থেকেছি।
পগা যে রাতে মারা যায় সে রাতের কথা মনে করে দেখ তো!
মনে করার কি আছে?
সেই রাতে কিছু রেখে গিয়েছিল তোমার কাছে?
না তো! তার এক মাস আগে থেকেই তার সঙ্গে দেখা নেই।
ভাল করে ভেবে দেখ। ব্যাপারটা কিন্তু খুব সিরিয়াস।
বীণা মাথা নেড়ে বলে, ভাববার কিছু নেই। আমার স্মরণশক্তি খুব ভাল। তবে সে কিন্তু আরও দু-একজনের কাছেও প্যাকেট রাখত।
সব জানি। লক্ষ্মী আর সনাতন। তাদের কাছেও খোঁজ নিতে হবে। একটা কথা বলি, রাগ করতে পারবে না।
আবার কি কথা?
তোমার কথা আমি বিশ্বাস করছি। তবু তোমার ঘরখানা আমরা সার্চ করব। আমরা সিওর হতে চাই।
বীণার ঘর ছোটো, আসবাবপত্রও নেই। সার্চ করতে দশ মিনিটও লাগল না। কচুবন বা বাড়ির আঁদাড়-পদাড় খোজার মতো ধৈর্য এদের নেই।
কিছু না পেয়ে কাকা যেন খুশিই হল। বীণাকে বলর, বাঁচালে! তোমার ঘরে চোরাই ডলার পাওয়া গেলে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যেত।
বীণা খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলে, ওম্ম গো! পাওয়া গেলেই বা মাথা কেন কাটা যেত তোমার। আমি কি ছাই জানতুম যে, কী আছে ওই প্যাকেটে।
তা ঠিক। আমার বড় বিপদ যাচ্ছে বীণা, মাথাটা ঠিক নেই। নন্দী আর রহমান পালিয়ে গেছে। তাদেরও ধরতে পারছি না। খুনের দায়ে ওদের নামে বোধহয় হুলিয়া বেরোবে। আচ্ছা, ঘুমোও। যাই।
নিমাই ব্যাপারটা জানতে ওদের সঙ্গে একটু এগোলো। বীণা সেই ফঁাকে পুঁটলিটা কুড়িয়ে এনে বাক্সবন্দী করল। সুযোগমত ঘটিতে পুরে সরা চাপা দিয়ে মাটির মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে। থাক কিছুদিন। লোকে যখন সব ভুলে যাবে তখন বের করে অল্পে অল্পে বেচে দিলেই হবে।
কিন্তু ভয়ও একটা ছিল। বাজারে লটারির টিকিট বিক্রির স্টল আছে পল্টু নামে একটা ছেলের। বিশ্ববিজয় অপেরার লাইটমিস্ত্রির ভাই। তার কাছে দুদফায় মোট পঞ্চাশ ডলার ভাঙিয়ে বেশ কিছু টাকা পেয়েছিল বীণা। সুতরাং তার কাছে যে ডলার আছে তা পল্টু জানে। বীণা অবশ্য বুদ্ধি করে বলেছিল তার বড়দা কৃষ্ণজীবন বছরে দু-তিনবার বিদেশে যায়, মস্ত মানুষ, সেই দাদাই তাকে ডলার দিয়েছে। কথাটা অবিশ্বাসের নয় হয়তো, কিন্তু তবু মানুষকে বিশ্বাস কি? পল্টু যদি বলে দেয় তা হলে কী হবে তা ভাবতেই পারে না বীণাপাণি। কাকা এমনিতে ভাল কিন্তু বেইমানি দেখলে কি করে কে জানে। পকে বলতে বারণ করতে গেলেও বিপদ আছে, তাতে সন্দেহ বাড়বে।
বীণাপাণি ভয় পেয়ে গেল। খুব ভয়।
কাকাকে এগিয়ে দিয়ে এসে নিমাই গম্ভীর মুখে বলল, হল তো! ওইসব আজেবাজে লোককে প্রশ্রয় দিয়ে কিরকম ঝাঁট হচ্ছে।
বীণাপাণি তার পুরুষটার দিকে চেয়ে রইল। কপাল এমনি যে, জুটল এক ল্যাংটো সাধু। চালচুলো নেই, কিন্তু পাপতাপের নামে একেবারে মূৰ্ছা যায়। এ যদি ডলারের খবর জানতে পারে তা হলে এখনই পাপের ভয়ে বীণাকে ছেড়ে লম্বা দেবে। এর কাছে বুদ্ধি, পরামর্শ চেয়ে লাভ নেই। বরং নিজের পাপ নিজেই বইবে বীণা। সেই ভাল।
বীণা মৃদুস্বরে বলে, কিসের ঝাট? আমরা তো কিছু করিনি।
করিনি, কিন্তু সকালের বাসটা তো ফেল হয়ে গেল। বিষ্ণুপুরের বাস ফের সেই দুপুরে।
থাকগে, আর গিয়ে কাজ নেই। তুমি বরং বাজার-টাজার করে আনো, আমি ঘরের কাজ সারি।
যাবে না।
আজ নয়। একটা বাধা যখন পড়েইছে তখন দুদিন পরেই যাবোখন।
নিমাই একটু ভেবে বলল, সেটা ভাল হবে। হঠাৎ করে চলে গেলে সন্দেহ বাড়ত হয়তো।
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিমাইকে বাজারে রওনা করে দিয়ে সে চারদিকটা ভাল করে দেখে নিল। তার বাড়ির আশেপাশে বসতি নেই বললেই হয়। জংলা জায়গা, উঠোন ঘেঁষে চাষের জমি, ঝোপজঙ্গল। বীণা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভিটের এক জায়গায় একটা ইঁদুরের গর্ত আছে। সেটাই খুঁড়ে ফেলল। একটা মা-হঁদুর কিচমিচ করতে করতে পালাল। কয়েকটা বাচ্চা লালচে রঙের কুষি ইঁদুর জড়ামড়ি করে পড়েছিল। বীণা মায়া করল না। তুলে বাইরে ফেলে দিল। কাক নিয়ে যাবে।
