তার চেয়ে বাপকে একটু সেঁকো বিষ এনে দে। ল্যাঠা চুকে যায়।
বিষ্ণুপদ গলাটা নামিয়ে রামজীবনকে বলল, অত সোরগোলের দরকার নেই। বউমাকে বলিস, তেলঝাল দিয়ে বেঁধে রাখতে। এক ফাঁকে কাল ঠিক খেয়ে নেবো। মুলো দিয়ে শোল অমৃত। তা এ তো মুলোর সময় নয়।
মুলো দিয়ে যাবেন বাবা! আজকাল সব সময়ে সব কিছু পাওয়া যায়। কাল ভোরে গিয়ে জাগুলিয়া থেকে নিয়ে আসব।
আধা ঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিটকতক্ষণ কে জানে বিষ্ণুপদর আজকাল আর সময়ের হিসেব থাকে নারামজীবন পা দুখানা বুকে চেপে ধরে রইল। তারপর নয়নতারা আর পটল মিলে প্রায় জোর করে তুলে নিয়ে গেল রামজীবনকে। তারপরও বিষ্ণুপদ শুনতে পেল, নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে রামজীবন মেলা কান্নাকাটি করছে। নানা দুঃখ উথলে উঠছে। এখন তার। হঠাৎ বৃষ্টি নেমে সব শব্দ ড়ুবিয়ে দিল।
সারা রাত ধরে তুমুল বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেল বিষ্ণুপদ। আজকাল মাঝে মাঝে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে বায়ু চড়া হয়ে সময়েও ঘুম আসতে চায় না। আজ রাতে বায়ু চড়েছে।
খুব ভোরে, ভাল করে আলো ফোটবার আগেই বিষ্ণুপদ দাওয়ায় এসে বসল। একটু ধরেছে বৃষ্টিটা। তবে আকাশ মুখিয়ে রয়েছে এখনও। উঠোনে হাঁটুজল দাঁড়িয়ে গেছে। ঘরে জল, দাওয়ায় জল। এত জল বহুকাল হয়নি। আগে এই জলে গা ভেসে যেত। আজকাল একটা নিকাশী খালের দরুন ততটা হচ্ছে না। কিন্তু তেমন ভারী জল হলে বিপদ।
রামজীবনের পাকা ঘরের অবস্থাও বড় করুণ। ইরফান সাতদিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছে। এই বাদলায় গাঁথনি থাকছে না, মশলা ধুয়ে যাচ্ছে। ঘরে কয়েক বস্তা সিমেন্ট পড়ে আছে। ভিজেভিজে জমে না পাথর হয়ে যায়।
রোজকার মতো আজও আধখ্যাচড়া ভূতুরে বাড়িটা বিষ্ণুপদকে মুখ ভ্যাঙচায় যেন, কী বুড়ো, থাকবি পাকা ঘরে? আয় থাকাচ্ছি। কালঘড়ি তো আয়ু খেয়ে ফেলল তোর। এরপর যখন ফুরু হয়ে যাবি তখন ঘর কোথা পাবি বুড়ো? খুব ক্ষীর সাঁটাচ্ছিস, শোল গিলছিস, শরীরে আহুতি দিচ্ছি, কদিন পর তো শরীরখানা পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই জলে ভাসিয়ে দেবে? কে খাবে বাবা সোলমুলো, কে থাকবে বাবা পাকা ঘরে?
ঘরখানার সঙ্গে বিষ্ণুপদর একটা আড়াআড়ি আছে। তাকে সইতে পারে না ঘটা। সেই জন্যই কি কাজ আটকে থাকে? এ বড় অলক্ষুণে ব্যাপার হল।
বর্ষাটা ছাড়লে বাড়ি ভাগ হবে। আমি আসবে। মাপজোখ হবে। ছেলেমেয়েরা আসবে। গায়ের মাতব্বর সব সাক্ষী হবে। ছেলে কৃষ্ণজীবন আর দুই মেয়েকে চিঠি দিয়েছে বিষ্ণুপদ। কঠিন হল শিবচরণ। আজ বছর সাত-আট হল সে বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছে। তার কথা আজকাল আর মনে পড়ে না বিশেষ বরাবর কিছু ডাকাবুকো ছিল, লেখাপড়ায় মাথা ছিল না। কিন্তু বড় হওয়ার শখ ছিল খুব। গায়ে থেকে কিছু হচ্ছে না, প্রায়ই বলত। তারপর একদিন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে, বাড়ির কিছু পুরনো কাঁসার বাসন, নয়নতারার দুটি সোনার দুল, ঘটে জমানো পয়সা, রাঙার বিয়েতে পাওয়া রূপোর চুটকি, রামজীবনের ঘড়ি এইসব জিনিস চুরি করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল। খোঁজখবর করা হয়েছে, লাভ হয়নি।
এলেম থাকলে পালিয়ে গিয়ে কেউ কেউ ভাগ্য ফিরিয়ে আসতে পারে। শিবচরণ পারবে কিনা কে জানে। কিন্তু যদি হেরো হয়ে একদিন ফিরে আসে তবে এ বাড়িতে তিষ্ঠোনো মুশকিল হবে।
শিবচরণ সম্পর্কে আর একটা ভাবনাও আছে। মরেটরে যায়নি তো! যদি গিয়ে থাকে তবে খবরটা জীবকালে পেতে চায় না বিষ্ণুপদ। নিরুদ্দেশ থাকাই ভাল। খারাপ খবর-টবর না এলে ধরে নেওয়া যাবে, ভালই আছে। হয়তো করে-কর্মে খাচ্ছে। কে জানে, হয়তো বিয়েও করেছে, ছেলেপুলে হয়েছে।
নয়নতারা আগে খুব কাঁদত শিবচরণের জন্যে। আজকাল বোধহয় ভাটা পড়েছে একটু।
আজ বেহানবেলায় হারানো ছেলের কথা মনে হতে বিষ্ণুপদ ভাবল, এ বাড়িতে তো শিবচরণেরও ভাগ আছে। কথাটা মনে রাখতে হবে।
০১৭. জানালা দুরকম হয়
জানালা দুরকম হয়। কোনও জানালায় দৃশ্য থাকে, কোনটায় থাকে না। চয়নের জানালায় কোনও দৃশ্য নেই। তার একতলার ঘরখানা খুবই অন্ধকার। একটাই দরজা ভিতরদিকে, একটাই জানালা বাইরের দিকে। জানালার ওপাশে একটা সংকীর্ণ গলি, তার ওপাশে দেয়াল। নিরেট দেয়াল, নোনাধরা। জানালার পুরনো শিক আর জং ধরা এক্সপাণ্ডেড মেটাল লাগানো। দিনেই আলো জ্বালতে হয়। তবে এ ঘরে ইলেকট্রিক লাইন কেটে দিয়েছে চয়নের দাদা। বাড়ির পিছন দিককার সবচেয়ে খারাপ, ড্যাম্প ধরা, অন্ধকার ঘরখানায় থাকে চয়ন আর তার মা। চয়ন এ ঘরে পড়াশুনো করতে হলে জানালার ধারে বসে করে। এ ঘরেই স্টোভ জ্বেলে তার আর মায়ের রান্না হয়। এক চিলতে উঠোনে চৌবাচ্চা আছে। তাতে করপোরেশনের জল আসে। জল ব্যবহারের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আছে। সকাল আটটার মধ্যে তাদের স্নান করে নিতে হয়। ছাদে যাওয়া বারণ বলে ভেজা কাপড় শুকোতে হয় ঘরের মধ্যেই। সাবান কাঁচা সম্পূর্ণ নিষেধ।
জানালায় দৃশ্য থাক বা না-থাক, ঘরে থাকলে চয়নের বেশীর ভাগ সময়ই কাটে জানালার ধারে বসে। এ ঘরের যেটুকু আলো তা ওই জানালার সুবাদেই পাওয়া যায়। এই পেছনের গলিটা সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য নয়। আগে খাটা পায়খানার আমলে মেথর আসবার রাস্তা ছিল, আজকাল খিড়কির রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করে অন্য বাড়ির লোক। মাঝখানে গলিতে ময়লা ফেলা শুরু হয়েছিল, সেটা চয়ন চেঁচামেচি করে পাড়ার হস্তক্ষেপে বন্ধ করেছে। তবু কিছু কিছু অশ্লীল জিনিস গলিতে নিক্ষিপ্ত হয়। কাকেরা টানা-হ্যাচড়া করে।
