বাদলা বলে কি আর হাত পা গুটিয়ে বসে আছি নাকি ঘরে? চাষবাস দেখতে হচ্ছে। তা খুব নাকি ক্ষীর খেয়েছে?
খুব রটেছে দেখছি। বলে উঠে বসে বিষ্ণুপদ। মাথাটা একখানা চক্কর মারল।
তা রটেছে। তোমার নাতি গিয়ে বলল, ক্ষীর খেয়ে পেট ছেড়েছে। জরুরি তলব।
বিষ্ণুপদ হেসে বলে, ছেলে শেষ খাওয়া খাওয়াচ্ছে হে। তা আমারই বা আপত্তিটা কিসের?
দিলুম ঠেসে। মরণ-বাঁচন ভগবানের হাত।
সবটাই ভগবানের ওপর ছেড়ে দিও না! মরণ-বাঁচনে তোমার আমারও একটু হাত আছে। কবার হয়েছে? বার পাঁচেক হবে বোধহয়। বমিটমি নেই। খিদে আছে? শোনো পাগল ডাক্তারের কথা! খিদে থাকবে না কেন? এ কি বড়লোকের পেট। গরিবের পেটে সবসময়ে খিদে।
হরি বলো মন! তুমিই যদি গরিব তবে আমরা যাই কোথা! অত বড় বিলেত-ফেরত তালেবর ছেলে থাকতে তুমি গরিব কপচাচ্ছো? এও কি ধর্মে সয়?
বিষ্ণুপদ এক গাল হাসল। পুত্ৰগর্ব বলে একটা ব্যাপারও তো আছে! বলল, ছেলে তালেবর সে তার নিজের গুণে। আমার কোন গুণটা আছে বলো!
পুলিন প্রায় ঘরের লোক। সব খবরই জানে। তাছাড়া বিষ্ণুপুরে সবাই সবাকার সব জানে। তালেবর ছেলে যে বাপমায়ের থেকে তফাত হয়েছে, তা কি আর গুহ্য কথা কোনও। পুলিন তার পেট টিপে দেখতে দেখতে বলল, টাকাপয়সা না হয় না-ই দিল, চোখের দেখা না হয় নাই দেখল, তবু তো ছেলে বটে হে! গত বিশ বছরে এ গাঁয়ে ওরকম ছেলে আর একটাও বেরিয়েছে? টাকাপয়সায় নও হে বাপু, তুমি অন্য দিকে বড়লোক।
একথাটা বিষ্ণুপদর খুব পছন্দ হল। মাথা নেড়ে বলল, সে খুব ঠিক কথা।
পুলিন পেটে আঙুলের খোঁচা দিচ্ছে বটে, কিন্তু সেটা অভ্যাসবশে। আসলে ডাক্তারি পরীক্ষা করছে না কিছুই। তাকে আজ কিছু কথায় পেয়েছে। বলতে লাগল, আমার দশাই কি কিছু ভাল? আগে তবু রুগী-পত্তর আসত, আজকাল ভো ভা। বটতলায় এক হাতুড়ে চেম্বার খুলেছে, হস্তায় দুদিন বসছে এসে। শুধু এম বি বি এস ডিগ্রিটা ছিল বলে সেখানে পাকা কাঁঠালে মাছির মতো ভিড়, নাড়ীজ্ঞান নেই, মোট তেরোখানা ওষুধের নাম জানে, লক্ষণ দেখে রোগ চিনতে পারে না, কিন্তু গায়ের পয়সা বের করে নিয়ে যাচ্ছে। দু-দুটো ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবো বলে ঠিক করে রেখেছিলুম, তাদুটো ষাঁড় ইস্কুল ডিঙোতেই হিমসিম খেয়ে গেল। কপাল! বুঝলে? কপাল! নাও, শুয়ে পড়ো দেখি।
বিষ্ণুপদ শুয়ে পড়ল।
পুলিন পেটে টোকা মেরে দেখল, বুকে পিঠে স্টেথােসকোপ দিল, নাড়ীও পরীক্ষা করল।
বিষ্ণুপদর খিদে পেয়ে রয়েছে। বলল, ওষুধের কথা থাক, পথ্যিটা কী হবে বলে তো! একটু ঝোলভাত খাবো নাকি?
তা খেতে পারো। পাঁচবার তো। ও কিছু নয়। বেশী করে জলটা খেও। ফুটিয়ে খেলেই ভাল। বর্ষাটা পেটের পক্ষে একেবারে যম। ওষুধটাও খেও। কয়েকটা ট্যাবলেট দিয়ে যাচ্ছি।
নয়নতারার এতক্ষণে সময় হল আসবার। ঘরে ঢুকেই বলল, কেমন দেখলেন মানুষটাকে?
কিছু নয় তেমন। ক্ষীরের দেনা শোধ হচ্ছে। একদিক দিয়ে ভালই, কোষ্ঠটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
বড় নোলা হয়েছে ইদানীং। বারণ করলুম, তবু জোর করে ক্ষীর খেল।
আর বিশেষ খেও না হে বিষ্ণুপদ। কথা কি জানো! বুডোরা যখন একে একে কেটে পড়তে থাকে তখন বেঁচে-থাকা বুড়োদের বড্ড একা লাগে। ভয়-ভয়ও করে। বুঝলে কথাটা?
বুঝেছি।
তুমি যদি এখন টিকিট কাটো, তাহলে আমার দশাটা কেমন হবে জানো? মনে হবে, এই রে, এবার আমার পালা বুঝি।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল। বলল, এমনিতে যাবো না। পোক্ত শরীর। তবে কিনা ডাক এলে তো যেতেই হবে।
সেই কালঘড়ি না কোন গুষ্টির পিণ্ডি দেখেছিলেন, সেই থেকেই মাথা বিগড়েছে!
রামজীবন ফিরল সন্ধেবেলা। বাপের খবর শুনেই চলে এল বিষ্ণুপদর কাছে, বাবা! শেষে কি পিতৃঘাতক হলাম?
মুখ থেকে ভকভক করে কাঁচা মদের গন্ধ আসছে। বড্ড খারাপ গন্ধ। গা গুলোয়। বিষ্ণুপদ বলল, ওরে না! সে ব্যাপার নয়।
রামজীবন দুখানা পা সাপটে ধরল বিষ্ণুপদর। ফুঁপিয়ে খুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি কুলাঙ্গার! নেমকহারাম। একটু কষ্ট করে উঠে আমাকে জুতোপেটা করুন বাবা। দু গালে থাবড়া দিন।
মাতালের মনস্তাপও বড় সাঘাতিক জিনিস। সহজে শেষ হতে চায় না। বিষ্ণুপদ দুখানা পা ছাড়ানোর একটা ক্ষীণ চেষ্টা করতে করতে বলল, আমার তেমন কিছু হয়নি। সকালে দুপুরে মিলিয়ে বার ছ-সাত হয়েছে। তাতে ভালই হয়েছে বাবা। পেটের গাদ নেমে গেছে। এ বেলা শরীর বেশ ঝরঝরে।
কিন্তু এত কথার পরও রামজীবনের কান্না থামে না, আমার মতো পাপী কি আর আছে? শালার এই ভাঙা ঘরে আপনাকে ফেলে রেখেছি! পাকা ঘর তুলে তাতে রাখব বলে কতকাল ধরে চেষ্টা করছি। আপনি মরে গেলে পাকা ঘর দিয়ে আমার কী হবে!
মরার এখনই কি! পুলিন ডাক্তারও দেখে গেছে, বলেছে কিছুই হয়নি। অত ভাবছিস কেন?
কিন্তু রাঙা যে বলল, ক্ষীর খেয়েই নাকি আপনার ভেদবমি শুরু হয়েছে।
ওরে না। ক্ষীর বলে কথা নয়। বর্ষাকালটা এরকমই হয়। নতুন জল তো!
আজ যে আমি জ্যান্ত শোল মাছ এনেছি। সেটা খাবে কে?
শোল মাছের কথায় বিষ্ণুপদ চাঙ্গা হয়ে উঠল। তার অতি প্রিয় মাছ। তেজী গলায় বলল, এনেছি? খুব ভাল করেছিস। আজ তো পেটটা ধরেই গেছে। সঁতলে রাখুক, কাল খাবোখন।
নয়নতারা ঘরে ছিল না। কিন্তু শুনেছে ঠিক। বাইরে থেকেই উঁচু গলায় বলল, শশাল মাছ খাবে! মাথাটা কি একেবারেই গেছে নাকি? তোমার ওই পেটে শোল মাছ সাক্ষাৎ বিষ।
রামজীবন হাহাকার করে উঠল, ও কথা বোলো না মা। শোল মাছ আমি বাবার নাম করে কিনে এনেছি।
