মলিন আলোটুকু বইতে পড়তে বা লিখতে কাজে লাগে চয়নের। দুপুরে জানালার খাজে বসে কোলে বই বা খাতা নিয়ে সে ড়ুবে যায় নিজের কাজে বা চিন্তায়। ওই গলিপথেই একদিন দুপুরে উদয় হল আশিস বর্ধন।
কি মশাই, চিনতে পারছেন?
চয়নের স্মৃতিশক্তি চমৎকার। কোনও নাম বা মুখ সহজে ভোলে না। সে একটু অবাক হয়ে বলে, চিনতে পারছি। আপনি আশিসবাবু, এল আই সিতে কাজ করেন। মেশিন ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু গলি দিয়ে এলেন কেন? এদিক দিয়ে তো এ বাড়িতে ঢোকার রাস্তা নেই।
সে জানি। তবে আপনার কথা থেকে আঁচ করেছিলাম যে, সদর দিয়ে ঢোকা একটু আনসেফ। ঢোকার দরকারও নেই। এখান থেকেই কথা বলে চলে যাই। বলে প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজের পুরিয়া বের করে এক্সপাডেড মেটালের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিয়ে বলে, ধরুন। কালো তাগায় বেঁধে পরবেন।
কী এটা?
মাদুলি। হাবড়ার এক তান্ত্রিকের দেওয়া।
চয়ন মৃদু একটু হেসে বলে, তাবিজ-কবজ তো অনেক হয়ে গেল। কাজ হয়নি কিছু।
আশিসও হাসল, ওসবে আমারও বিশ্বাস নেই। তবে মানুষ তো সব রকম চেষ্টাই করবে। আমিও যে যা বলে করে যাই, বোনটার জন্য। মৃগী না সারলে বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর বিয়ে না হলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আপনার বোনের কি মাদুলিতে কাজ হয়েছে?
মনে হয় হতেও পারে। গত পনেরো দিন তো অজ্ঞান হয়নি। দেখা যাক।
চয়ন কুষ্ঠিতভাবে বলে, আপনি এত কষ্ট করলেন! দাঁড়ান, আমি জামাটা পরে আসছি।
আশিস বর্ধন জানালার কাছে এসে ঘরের মধ্যে একটু উঁকি দিয়ে বলল, এইটাই বুঝি আপনার আর আপনার মার ঘর? চয়ন মৃদু হেসে বলে, হ্যাঁ। বাদবাকি বড়িটা আমার কাছে নিষিদ্ধ। সেইজন্য—
আরে ব্যস্ত হবেন না। এসব সিচুয়েশন আমার জানা আছে। মা বুঝি ঘুমোচ্ছন! খুব রোগা তো!
সরু চৌকির ওপর পড়ে থাকা মায়ের দিকে একবার তাকায় চয়ন। বলে, হাড় কখানা অবশিষ্ট আছে। মায়ের অনেক রোগ, চিকিৎসা তো হয় না। পড়ে থাকে নির্জীব হয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, মরেটরে গেছে বুঝি।
রোগটা কী?
মার চোখে ছানি। প্রেশার খুব বেশী। হার্টও বোধ হয় ভাল নয়। বাত।
আপনাদের রান্না করে কে?
কিছুদিন আগেও মা পারত। আজকাল আমি করি। একটা কুকার ছিল বাবার আমলের। সেইটে কাজে লাগছে।
দাদা বউদির সঙ্গে সম্পর্কটা এখন কেমন?
সম্পর্ক নেই। দেখা হলেও কথাবার্তা হচ্ছে না।
বকাঝকা বা পরোক্ষ গালাগাল?
চয়ন মৃদু হেসে বলে, আগে হত। আজকাল সেদিক দিয়ে পিসফুল। আপনাকে তো এত কথা বলিনি, জানলেন কি করে?
বেশীর ভাগ অভাবের সংসারের ছবিটা একই রকম কিনা। আমি সেদিন আপনার বাড়ির ঠিকানা চাওয়ায় আপনি একটু দোনোমোনো করেছিলেন এবং অসময়ে আসতে বারণ করেছিলেন, তখনই আন্দাজ করে নিয়েছিলাম। কিছু মনে। করলেন না তো!
বিবৰ্ণ একটু হেসে চয়ন বলে, না না, আপনি তো সিমপ্যাথাইজার।
একজ্যালি। কারণ আমার দাদা আমাকে আপনার চেয়েও একটি বেশী করেছিল। লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।
চয়ন চেয়ে রইল লোকটার দিকে।
আশিস ম্লান হেসে বলল, অবশ্য দোষটা আমারই ছিল। দাদার জায়গায় আমি হলেও হয়তো তাই করতাম। যাকগে। তবে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াতেই কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে যেতে পেরেছি। নইলে একদম বখে গাড়ায় চলে যেতাম।
দাদার সঙ্গে আপনার আর সম্পর্ক আছে?
পরে রিকনসিলিয়েশন হয়েছিল, তবে সংসার তো আর এক হয়নি। শত্ৰুতাও নেই।
কিন্তু আপনি গলিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, আমার খুব অভদ্রতা হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়ান, জামাটা গায়ে দিয়ে আসছি।
একবার বেরোলে ঢুকতে পারবেন তো! সদর বন্ধ বা খোলার ব্যবস্থা কি আপনার হাতে আছে?
চয়ন মলিন মুখে মাথা নেড়ে বলে, না। বউদি ওপরে ঘুমোচ্ছ। সদর খুলে বেরোলে দরজা টেনে দিলে লেগে যাবে। কিন্তু ফের ঢুকতে হলে তোরবেল বাজাতে হবে। তবে অসময়ে ফিরলে আমি এই জানালায় এসে মাকে ডাকি। মা খুলে দেয়। তবে মার কষ্ট হয়।
তাহলে বেরোনোর দরকার নেই আপনার। আমি যাচ্ছি।
আরে না। আমার টিউশানিতে যাওয়ার সময় তো হয়ে এল।
তাহলে আসুন। আমি রাস্তায় অপেক্ষা করছি।
তার নতুন একজন বন্ধু হল কিনা তা বুঝতে পারছে না চয়ন। আগে ইস্কুল-কলেজে তার অনেক বন্ধু ছিল। আজকাল বিশেষ কেউ নেই। সে কোনওদিন চায়ের দোকানে বা পাড়ার ঠেক-এ আড্ডা দিতে যায়নি। তার শরীর দেয় না, তার সময়ও হয় না। প্রাণপাত বন্ধুত্ব তার সঙ্গে ছিলও না কারও। সে অনেকটাই একা, সঙ্গহীন। আশিস তার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়, তবু যদি বন্ধুত্ব হয় তাহলে খারাপ লাগবে না চয়নের। তার বোধ হয় এখন একজন বন্ধুই দরকার। পোশাক বলতে প্যান্ট, জামা আর চপ্পল।. পরতে দুমিনিট লাগে। বেরোনোর আগে একবার মাকে ডেকে বলে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু মা এত অকাতরে ঘুমোচ্ছ যে, ডাকতে ইচ্ছে হল না। এরকম ঘুমের মধ্যেই মা একদিন চলে যাবে বোধ হয়। সেদিন চয়ন আরও একটু একা হয়ে যাবে।
বাইরে মেঘলা আকাশ। ভ্যাপসা গরম।
আশিস বলল, আজ টিউশনি কোন দিকে? সাউথে কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। গোল পার্কের কাছে, সেদিন যেখানে যাচ্ছিলাম।
ছাত্র না ছাত্রী? ছাত্রীই যেন বলেছিলেন।
হ্যাঁ।
বড়লোক নাকি?
পয়সায় তেমন নয়। তবে ছাত্রীর বাড়া বড় সায়েন্টিস্ট। নাম আছে।
কী নাম বলুন তো!
কৃষ্ণজীবন বিশ্বাস। কাগজে লেখেন-টেখেন। এনভিরনমেন্টের ওপর।
আশিস বর্ধন মাথা নেড়ে বলল, জানি। বিখ্যাত লোক। ইংরজি কাগজে লেখা পড়েছি। কি রকম দেয় আপনাকে?
