এ বয়সে পেট-ছাড়া কি ভাল? কথায় বলে, ছেলে আগে বাড়তে, বুড়ো হাগে মরতে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তাই খারাপ কি? সময় হলে চলে যাওয়াই তো ভাল।
এ কি হাসিঠাট্টার কথা।
আহা, রাগ করো কেন? পানের বাটাখান নিয়ে এখানেই বোসসা। পাহারা দাও।
যমদূত এলে তাড়িয়ে দিও। বিষ্ণুপদ আর একবার গেল। ঘুরে যখন এল তখন আর হাসিখুশি ভাবখানা নেই।
বুঝলে, একটু শোবো।
নয়নতারা উঠে পড়ল। বলল, আগেই ভেবে রেখেছি। বিছানা করাই আছে। শুয়ে পড়বে চলো। রক্তক্ত যাচ্ছে না তো!
না। এখনও ততটা খারাপ নয়।
ঘরে অন্ধকার ঘনিয়ে আছে। বাইরে মেঘলা। বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে খই-ভাজার শব্দ তুলে।
নয়নতারা দাওয়ায় বেরিয়ে পটলকে ডাকল। এইবেলা যা দাদা, পুলিনবাবুকে ডেকে নিয়ে আয়। পেট খারাপের কথা বলিস, ওষুধ যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
পটল ছাতা আর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার সেই–কুকুর সাইকেল। এই নীতিটিকে বড় ভালবাসে নয়নতারা। বড় হলে কেমন হবে কে জানে। কিন্তু এখন অবধি ভারি বাধ্যের, এ বয়সেই বুদ্ধি বিবেচনা খুব হয়েছে, বোবা ভাইটাকে বুকে বুকে আগলে রাখে।
দুই বউ আজকাল আলাদা রাধছে। রান্নাঘরটা রাঙার দখলে। শ্যামলী নিজের ঘরে স্টোভ জ্বেলে বা তোলা উনুনে বেঁধে নিচ্ছে। সেই ঝগড়ার পর থেকেই এই ব্যবস্থা। ভিতরে ভিতরে ভাইয়ে ভাইয়ে জায়ে জায়ে ভাগ হয়েই ছিল। মনের মধ্যেকার ভাগটাই এখন বেরিয়ে পড়েছে। যতদিন যাচ্ছে তত ভাগাভাগিটা যেন বাড়ছে চারদিকে।
নয়নতারা ঘরে এসে দেখতে পায়, চোখ চেয়ে নিঝুম শুয়ে আছে বিষ্ণুপদ। যেন ভাবন-জগতে।
কী হচ্ছে পেটের মধ্যে!
বিষ্ণুপদ বলে, পেটের মধ্যে নয়, মনের মধ্যে। সেখানে অনেক কিছু হচ্ছে।
তোমার তো মন নিয়েই যত জ্বালা। কী যে সারাদিন ভাবো বসে বসে!
তোমার ভাবনাচিন্তা আসে না, না?
তা আসবে না কেন? মেয়েমানুষের মাথায় তেল-নুন, রোগ-ভোগ, সংসারে পাঁচটা ভালমন্দ এইসব ছাড়া আর কী আসবে বলো! এই যে রোগ বাঁধালে এখন এইটেই মাথা জুড়ে থাকবে।
এইমাত্র কী ভাবছিলাম জানো?
কী ভাবছিলে?
ভাবছিলাম কলকাতায় থাকলে এখন বেশ হত। না, কৃষ্ণজীবনের বাড়িতে নয়। সে বড় সাহেব জায়গা। কলকাতার বড় রাস্তার একটি ধারে যদি বসে থাকতে পারতাম সারা দিনমান তাহলে বেশ হত।
রাস্তায় বসে থাকলে আবার ভালটা কী হবে?
এই গাঁয়ে গঞ্জে যেমন সব কিছু থেমে থাকে, নড়াচড়া নেই, কলকাতায় তেমনি আবার সবসময়ে সব কিছু কেবল চলছে। ধুন্ধুমার করে চলছে। কী শব্দ! কী হইচই!
যাই বলো বাপু, ও আমার সয় না। কবার তো গেলুম। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, বেলুড়, একবার চিড়িয়াখানা। আমার মনে হয়, বেড়াতে খারাপ নয়, কিন্তু সারাক্ষণ থাকলে মাথা ধরে যাবে।
আমারও কি আর ভাল লাগবে! আমরা হলুম মাটি-ঘেঁষা মানুষ। সে কথা বলছি না। কিন্তু মাঝে মাঝে ইচ্ছে যায়, ওরকম ধুন্ধমার কাণ্ডখানা কিছুক্ষণ বসে দেখি। চারদিকটা যেন বড় জীয়ন্ত মনে হয় কলকাতায়। আর এই বিষ্ণুপুরের বাড়ির দাওয়ায় বসে থেকে থেকে কী মনে হয় জানো? এত নিস্তেজ, এত মরা চারধার যে, হঠাৎ চমকে উঠে ভাবি, ওরে বাবা, আমি মরে যাইনি তো!
পেট ভাঙল বুঝি! শব্দ পেলাম যেন!
অত ভাবছো কেন? বদহজম হলে ওরকম একটু হয়। কলেরা-টলেরা নয়। ভয় নেই। বরং পানের বাটাখানা নিয়ে এইখানে বোসসা। একখানা পান সেজে খাও। দেখি।
পান খাওয়ার আর দেখার কী আছে?
আছে। সবকিছুর মধ্যেই দেখার জিনিস আছে। তুমি যখন পান সাজো তখন ভারি আদর করে, যত্ন করে সাজো। দেখতে বেশ লাগে। ইস্কুলে যখন পড়াতুম তখন একখানা বাংলা গল্প পড়াতে হত। তাতে ছিল, জাপানীরা যখন চা তৈরি করে তখন এত যত্ন নিয়ে করে, এত সুন্দর ভঙ্গিতে যে, সেটাও নাকি চেয়ে দেখার মতো ব্যাপার। তোমার পান সাজার মধ্যেও খানিকটা ওরকম কিছু আছে।
কী যে মাথামুণ্ডু বলো তার ঠিক নেই! সাদা পাতা দিয়ে একটু চুন জেবড়ে মুখে ফেলে দিই। দেখার যে কী আছে বুঝি না!
নয়নতারা পানের বাটা আনতে গেল। কিন্তু সহজে এল না। সংসারী মানুষ, একটা কাজ করতে গেলে সেটার সঙ্গে আর একটা জড়িয়ে পড়ে।
দুর্বল শরীরে একটু ঘুম-ঘুম পাচ্ছিল বিষ্ণুপদর। পেটে হাঁড়িকলসি ভাঙছে, জিব তেতো। শরীরটা জুত-এর নেই মোটেই। চোখ জড়িয়ে যখন এল তখনই হঠাৎ মনে হল, ঘুমও কি ছোট করে মরণ? ঘুমোলে তো শরীরের বোধ মুছে যায়, সমাজ সংসার, আত্মীয়স্বজন সব মুছে যায়। মরণও তাই। তবে কি নিত্যি দিন ঘুমের মধ্যে আমরা একটু একটু করে মরি! মরণের পর কি সব ফব্ধিকারি! মাথায় আজকাল কত কথাই আসে। উড়ুটে সব কথা। বিষ্ণুপদ বৈতরণীর কথা ভাবে, যমরাজার কথা ভাবে, স্বর্গ বা নরকের কথাও ভাবে। ওসব কি আছে বটে? বিষ্ণুপদর তেমন বিশ্বাস হতে চায় না। তবে আছেটা কি? মানুষ জন্মায় বাঁচে, তারপর মরে হারিয়ে যায়? তাহলে তো এর কোনও মানেই হচ্ছে না। বিষ্ণুপদর শাস্ত্রটাস্ত্ৰ পড়া নেই, তবে আজকাল মনে হয়, এই জীবনটার একখানা মানে-বই থাকলে বড় ভাল হত। সহজ করে সব বোঝানো থাকত তাতে।
জানালার সরু সরু শিকরে ওপাশের বর্ষার জল পেয়ে সতেজ পেয়ারা গাছটার ডালপালা আর পাতা উঁকি দিতে। থাকে। গাছ যেন হাসছে। খুব হাসছে। গাছখানার স্বৰ্গ-নরক নেই, কর্মফল নেই। এই ঠাই দিব্যি একটা গোটা জীবন কাটিয়ে যায়।
চটকাটা ভাঙল পুলিন ডাক্তারের ডাকে।
আবার কী বাধালে হে?
এসো ভায়া, বোসসা। তোমাকে আবার এই বাদলায় ছেঁচড়ে আনল কেন?
