বলে হিহি করে হাসল অনু। তারপর বলল, যাই।
হেমাঙ্গর হাত থেকে মুর্গির ঠ্যাংটা পড়েই যাচ্ছিল।
০১৬. বিষ্ণুপদর পেটটা একটু নেমেছে
বিষ্ণুপদর পেটটা একটু নেমেছে। সকাল থেকে বার চারেক দাস্ত, পেটটা ভার। একটা বিশেষ বয়সের পর শাস্ত্রে আছে মলভাণ্ডং ন চালয়েৎ। চালাতে হয়নি, ইদানীং খাওয়া-দাওয়াটা একটু বেহিসেবী মতো হওয়ায় সামাল দিতে পারা যায়নি। রামজীবন খাওয়াচ্ছে খুব। পরশু কোথা থেকে ক্ষীর নিয়ে এল এক ভাড়। থকথকে ক্ষীর, সরে ননীতে একেবারে মাখামাখি, ভাঁড়টা একবার তাকে শুকিয়ে নিয়েছিল রামজীবন। আহা, কী মিঠে গন্ধ! প্ৰাণ জুড়িয়ে জিব রসস্থ হয়ে পড়ল। ইদানীং নোলাটা যে বেড়েছে তা বিষ্ণুপদ নিজেই টের পায়। কাল যখন ডাকে, তখন এরকমই হয়। নোলা বাড়ে।
ক্ষীর দেখে নয়নতারা চেঁচামেচি শুরু করল, ওই বুড়ো মানুষটাকে এই বিষ গেলাবি নাকি রে বাবা? এ কি ওর পেটে সইবে!
রামজীবন উদার গলায় বলে, আহা, খাক না মা। সাধ মিটিয়ে খাক। ভালমন্দ অত হিসেব করার কি বয়স এটা? এখন প্রাণ খুলে সাধ মিটিয়ে যা খুশি খেয়ে হরি বলে চলে যাওয়া।
নয়নতারা রাগ করে বলল, আমি বাপু তোদের মতো করে বুঝি না। আমি বুঝি যতদিন রাখা যায় ধরে বেঁধে ততদিনই রাখলাম। ওই ঘন পাকের জিনিস হজম হবে না বাবা। তোরা বরং ভাগজোগ করে খেয়ে নে। আমি একটা ফেঁটা বুঝেসুঝে দেবোখন তোর বাপকে।
রামজীবন জিব কেটে বলে, তা কি হয়! বাবার নাম করে এনেছি, বাবাই খাবে। এতে ভাগজোগ চলবে না।
বিষ্ণুপদ বারান্দায় বসে শুনছিল। শুনে মনে মনে খুব বাহবা দিল রামজীবনকে। এ তার বিদ্বান ছেলে নয়, দোষঘাটওলা মুখ ছেলে, কিন্তু বাপ-মায়ে ভক্তি এর কাছ থেকে লোকে শিখতে পারে। আর নয়নতারার তারিফও না করে পারে না বিষ্ণুপদ। ওই একটা মানুষই তার ভালমন্দর কথা ভাবে।
নাড়ে পরশু রাত্তিরে একটু ক্ষীর পড়ল। রামজীবন একেবারে সামনে খাড়া দাড়িয়ে, দেখল, কম দেওয়া হচ্ছে কিনা। সাদা বাতাসা গুঁড়িয়ে দিল রাঙা, সঙ্গে পাকা একখানা মর্তমান কলা। নয়নতারা একটু আবড়াল থেকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল, বুঝেসুঝে খেও গো। মরা পেট, ওসব খাওয়ার অব্যেস নেই তো। পেটে ঢুকে কী হুলুস্থল বাধায় কে জানে বাবা!
রামজীবন একটু অসন্তোষের গলায় বলল, খাওয়ার সময় অমন টিকটিক কোরো না তো মা!
সাধে কি বলি বাবা, ভুগতে তো হবে আমাকেই।
ক্ষীরটা আজও যেন জিবে লেগে আছে। যেমন স্বাদ, তেমনই গন্ধ। দুহাতার একটু বেশীই খেয়ে ফেলল বিষ্ণুপদ। ঢেঁকুরখানায় অবধি ক্ষীরের গন্ধ আসছিল।
ভুটভাট শুরু হল শেষ রাতে। কাল সারাদিন থম ধরে রইল পেট। খিদেই হল না। আজ সকাল থেকে নেমেছে। বর্ষা ঋতুটা এমনিতেই ভাল নয়। রোগ সহজে ছাড়তে চায় না। ছাতা মাথায় দিয়ে বার বার ঘটি নিয়ে দৌড়োত হচ্ছে পুকুরধারে। এ তো আর কৃষ্ণজীবনের সাততলার ফ্ল্যাটবাড়ির পাকা ঝা চকচকে পায়খানা নয়। নিতান্তই চট দিয়ে ঘেরা কাঁচা ব্যাপার। ওপরে কোনও ছাউনিও নেই। তবে রামজীবনের পাকা ঘরখানা হলে তাতে সব বন্দোবস্ত থাকবে। লাগোয়া না হলেও, কাছেই বারান্দার শেষ দিকটায় স্যানিটারি হচ্ছে। বাবা-মায়ের জন্য জান-কবুল করে লেগেছে ছেলেটা।
চারবার হয়ে গেল। লক্ষণ ভাল বুঝছে না বিষ্ণুপদ। শরীরটা কাহিল লাগছে, সিটিয়ে যাচ্ছে যেন। জিবটা খসখসে, বিম্বাদ নয়নতারা এসে বলল, কবার হল।
চারবার।
আরও হবে?
বলি কি করে?
বুঝছো কেমন?
ভয় খাওয়ার মতো কিছু নয়।
থানকুনি আর গ্যাঁদাল রস করে রেখেছি। খাও। বমির ভাব নেই তো!
না।
নয়নতারা গেলাসে রসটা নিয়ে এল। বিষ্ণুপদ ঢক করে রসটা খেয়ে বরল, সব ভাল যার শেষ ভাল।
দাসীর কথা বাসি হলে তবে কানে যায়। পিচকিরি যে ছুটবে সে তো তখনই বুঝতে পেরেছিলাম।
বিষ্ণুপদ কাহিল হাসি হেসে বলল, লোভে পিপ, পাপে মৃত্যু। কিন্তু লোভের ক্ষমতা কি কিছু কম। শয়তানের গায়ে মেলা জোর। তার সঙ্গে আমরা পেরে উঠব কেন? তবে যদি এখন কলেরা হয়ে মরি তবে দুঃখ থাকবে না। একখানা জম্পে জিনিস খাওয়াল বটে রামজীবন। তুমিও একটু চেখে দেখেছো তো!
সে খোঁজ আর নিলে কোথায়?
খোঁজ নিইনি বটে। দোষই হয়েছে। তবে মনে হয় তুমিও একটু জিভে ঠেকিয়েছে, তাই না?
কী পুরুষের সঙ্গেই জীবনটা কাটল! বলি, দুধ সর ক্ষীর কবে মুখে তুলতে দেখেছে আমায়? আমার হল সাদা-পাতা খাওয়া পচা মুখ, ওসব ভাল ভাল জিনিস কি সয় আমার?
তাও বটে। তুমি তো সত্যি দুধটুধ খাও না। তবে এটা একটু খেয়ে দেখলে পারতে। বড় খাঁটি জিনিস।
ধোঁয়াটে গন্ধ পাওনি?
না তো! ছিল নাকি?
আমি তো ভাঁড় শুঁকেই পেয়েছি। মোষের দুধের ক্ষীর।
মোষের দুধে কি ধোঁয়াটে গন্ধ হয়?
তাই তো জানি।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, আমাদের আর গরু মোষের তফাত করে লাভ কি?
মোষের দুধ তেজী জিনিস। গুরুপাক। পেট ডাকল নাকি? শব্দ পেলাম যেন!
ডাকছে।
তাহলে আবার হবে। টোটকাতে আর ভরসা পাচ্ছি না। ডাক্তার ডাকি।
ব্যস্ত হয়ো না। ধরেও যেতে পারে। আজকালকার অ্যালোপ্যাথি মানেই তো বিষ। বিষে বিষ ক্ষয়। আজকের দিনটা উপোস দিলেই হবে।
আজ খুব সকালে রামজীবন বেরিয়ে গেছে। শুনছি আজ নাও ফিরতে পারে। বামাচরণ তো সম্পর্ক রাখছে না। এখন বিপদ হলে কাকে ডাকি?
বিষ্ণুপদ হাসে, কাউকে ডাকতে হবে না। বিষ্ণুপুরে এতকাল আছি। পাড়া-প্রতিবেশীরা কি আর আসবে না ডাকলে! কিন্তু অত কিছু করতে হবে না।
