লোকটা এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে, এটা একদমই জানা ছিল না হেমাঙ্গর। বরং সে শুনেছে, লোকটা গ্রাম্য, মুখচোরা, একটু ক্ষ্যাপাটে এবং আনমনা, হয়তো তাই। হয়তো শুধু নিজের গবেষণা ও উপলব্ধির ক্ষেত্রেই লোকটা সহজ ও বাপটু। সে একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলে, ইউ আর পারহ্যাপস রাইট।
আই অ্যাম রাইট। আমি ফিকশ্যনাল সায়েন্সে বিশ্বাস করি না, ডেট্রাকটিভ সায়েন্সে বিশ্বাস করি না, ওয়েলফেয়ার সায়েন্সে বিশ্বাস করি। সভ্যতায় অনেক কদম এগিয়ে গিয়েও যখন মানুষকে বর্বর, আহাম্মক, নির্বোধ আর উদাসীন দেখি তখন মনে হয়, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি-নির্ভর সভ্যতার কোনও দাম নেই। আমাদের কোন সৎ শিক্ষাই এই সভ্যতা দিচ্ছে না। চাকা সুতরাং উল্টোদিকে ঘোরাতেই হবে।
বারান্দার ঝাঁঝালো বাতিটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই চমকে গেল হেমাঙ্গ।
এই অলম্বুস! বলেই জিব কাটল চারুশীলা, আরে, আপনিও এখানে! বলে কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে হেসে ফেলল।
হেমাঙ্গ গম্ভীর হয়ে বলে, যা ততা। এখন কাজের কথা হচ্ছে।
সে কি! খাবি না? ডিনার শুরু হচ্ছে যে!
আরও পরে খাবো।
চারুশীলা কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে বলে, প্লীজ, আপনি আসুন। রিয়া খুঁজছে আপনাকে। আপনার নাকি আজ রাত বারোটায় প্লেন ধরতে হবে।
আজ্ঞে হ্যাঁ। বলে কৃষ্ণজীবন উঠে দাঁড়ায়। ভারী আপ্যায়িত ভঙ্গি।
হেমাঙ্গ বলে, কোথায় যাচ্ছেন রাত বারোটার প্লেনে?
লন্ডন। এমনভাবে বলল, যেন লিলুয়া-টিলুয়া কোথাও যাচ্ছে।
একা বারান্দায় আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে হেমাঙ্গ। পৃথিবীর আসন্ন বিপদ নিয়ে মোটেই দুশ্চিন্তা নেই তার। কৃষ্ণজীবন যতই বলুক, সে জানে পৃথিবীর ভাল করার কথা যারা ভাবছে, তারা ঠিকই ভাল করবে। ঘুরেফিরে তার কেবলই একটা প্রশ্ন আসছে মনে, ওই কিশোরী মেয়েটি এইসব গুরুতর কথাই কি চুপ করে শুনছিল কৃষ্ণজীবনের কাছ ঘেঁষে বসে? কে মেয়েটা?
চারুশীলা আবার এল, কী হচ্ছে বল তো? খাবি না নাকি?
নাও খেতে পারি। প্রতিবাদ হিসেবে।
তার মানে!
এই গরিব দেশে এত খরচ করে কেউ ছেলের জন্মদিন করে? এই অপচয়ের মানে হয় কোনও?
ওঃ, তাহলে এই হল ব্যাপার! আর তুই যে আজেবাজে জিনিস কিনে রোজ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছি।
তোর মাথায় ঘিলু বলে পদার্থটা নেই বলেই বলছিস। জিনিস কিনলে টাকার অপচয় হয় না, টাকাটা জিনিসে কনভার্টেড হয় এবং ঘরে থাকে।
ওটা তো আই-ওয়াশ। জিনিসগুলো বেচলে ফের পুরো টাকাটা কখনও ফেরত পাবি?
ফেরত পাওয়ার প্রশ্নই নেই। জিনিসগুলো আমাকে সারভিস দিচ্ছে। ছা
ই দিচ্ছে। আয় বলছি খেতে।
এই গরিব দেশে একশ দশ টাকা প্লেট মূখের মতো অপচয়। বহু খাবার নষ্ট হবে। আই প্রটেস্ট।
মারব থাপ্পড়, কিঙ্কুস কোথাকার। নইলে পিন্টুকে লেলিয়ে দেবো। তখন সুড়সুড় করে যাবি।
তুই পিন্টুটাকে নষ্ট করছিস।
বেশ করছি। আর একটা কথা বলে রাখি, আমার সামনে গরিব কথাটা উচ্চারণ করবি না কখনও। গরিব কথাটাই আমি সহ্য করতে পারি না। গরিবদের দুচোখে দেখতেও পারি না।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, বলতে পারলি কথাটা! জিবে আটকাল না? তুই সত্যি খারাপ হয়ে গেছিস।
তোর চেয়ে খারাপ নই। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। নীলা বলে রোডে ফিরবে। ওর গাড়ি নেই। ওকে নামিয়ে দিয়ে যাবি।
আমার খিদে পাচ্ছে না।
খপ করে তার চুলের মুঠি চেপে ধরল চারুশীলা, খাবি কিনা?
উঃ। যাচ্ছি যাচ্ছি।
খাওয়ার ঘরেই কিশোরীটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। প্লেটে সামান্য একটু মাছের কারি নিয়ে একটু খাওয়ার ভান করছে। এটা খিদের বয়স, কিন্তু এই প্রজন্মের হাই ব্রাও মেয়েরা তেমন খেতে-টেতে চায় না। অন্তত পাবলিকলি নয়।
ভিড়ে মেয়েটার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল হেমাঙ্গ, তুমি কে বলো তো?
মেয়েটা মুখ তুলে তাকে দেখে হাসল, আমি অনু। নন্দনা আমার বন্ধু। আপনি?
আমি! আমি নন্দনার মামা। হেমাঙ্গ। তুমি ওটা কী খাচ্ছো?
মাছ। কিন্তু বিচ্ছিরি খেতে হয়েছে।
তবে খাচ্ছে কেন? অনেক আইটেম আছে, নিয়ে খাও না।
আসলে আমার অ্যাপেটাইট নেই। মাই ড্যাড ইজ সিক। নট ফিলিং হাংরি।
বাবার কী হয়েছে?
হয়েছিল। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। তবে হি ইজ পুলিং থ্রু। ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে পরশু কেবিনে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
তাহলে তো ভাল খবর।
ভালই। তবু কেন যেন বাবার অ্যাটাক হওয়ার পর থেকে খেতে পারি না।
কৃষ্ণজীবনবাবুকে তুমি চেনো?
মেয়েটা টপ করে তার দিকে একবার তাকাল। তারপর স্মার্ট হেসে বলল, উই আর ফ্রেন্ডস।
ফ্রেন্ডস।
ভেরি গুড ফ্রেন্ডস।
হেমাঙ্গ মেয়েটার পাকামিতে একটু হাসল। একটু চিমটি কেটে বলল, পারহ্যাপস নট এ বয় ফ্রেন্ড? অ্যান্ড হোয়াই নট? বলে হিহি করে হাসল মেয়েটা।
মাই গড!
আপনি একটু ওল্ড ফ্যাশনড়, তাই না?
কি জানি! হবে হয়তো।
আসলে ওঁর মেয়ে মোহিনী আমার খুব বন্ধু।
তাই বলো।
উনিও বন্ধু।
হেমাঙ্গ একটা মুর্গির ঠ্যাং সন্তৰ্পণে কামড়ে বলল, হি ইজ ইন লাভ উইথ দিস আর্থ। জানো?
সবাই জানে। হি ইজ এ গুড গাই। জেম অফ এ গাই।
বোধ হয় তুমি ঠিকই বলছো। আফটার অল হি ইজ ট্রাইং টু ড়ু সামথিং ফর ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড দিস প্ল্যানেট।
দ্যাটস হোয়াই আই অ্যাম ইন লাভ উইথ হিম।
এরা যে কী ভাষায় কথা বলে তা ঠিক পায় না হেমাঙ্গ। সে একটু অস্বস্তি বোধ করে চুপ করে রইল।
অনু তার মাছসুদ্ধ প্লেটটা একজন চলন্ত বেয়ারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ড়ু ইউ নো সামথিং অ্যাবাউট ইওরসেলফ?
ইউ আর এ হ্যান্ডসাম ম্যান!
