বিজ্ঞানীরা মুষ্টিমেয়। পৃথিবীর যে সংকট আসছে সে সম্পর্কে অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষেরই ধারণা ভাসা ভাসা। আর অশিক্ষিতরা তো সম্পূর্ণ নির্বিকার। কয়েকদিন আগেই একজন সেন্ট্রাল মিনিস্টার আমাকে ডেকে বলেছেন, আমি যে কলকারখানা কমাতে বলছি তাতে নাকি উৎপাদন ও উন্নয়ন মার খাবে। তাকে আমি বোঝাতে পারিনি, আগে অস্তিত্বকে রক্ষা করা দরকার, নইলে উন্নয়ন আর উৎপাদন কার কাজে লাগবে? আমি পৃথিবীর লোককে বোঝানোর চেষ্টা করছি, সবগুলো রাষ্ট্রের উচিত অন্যসব ইস্যুকে উপেক্ষা করে পৃথিবীর পরিবেশ ও আবহমণ্ডলকে রক্ষা করার জন্য সব রিসোর্সেস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু কে শুনছে বলুন! রাজনীতিকরা তাঁদের কূটকচালিতে বন্দী হয়ে আছেন, আমলারা ব্যস্ত প্রশাসনিক কাজে। সাধারণ মানুষ অন্নবস্ত্রের বাইরে কিছুই ভাবতে চায় না। এই পৃথিবীর জন্য, মাটির জন্য, গাছের জন্য, প্রকৃতির জন্য তাদের যেন কিছুই করার নেই। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে এই উদাসীনতা। নেগলিজেন্স। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি কী করতাম জানেন! কেউ গাছ কাটলে তার ফঁাসির ব্যবস্থা করতাম। সন্তান সংখ্যা যার বেশী হবে তাকে জেল-এ পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম। জল বা বায়ু দূষিত হয় এমন কলকারখানার মালিকদের দেউলিয়া করে ছেড়ে দিতাম।
হেমাঙ্গ সামান্য সপ্রশংস গলায় বলে, আপনাকে দেখে বোঝা যায় না বটে, কিন্তু ইউ আর এ টাফ ম্যান।
কৃষ্ণজীবন একটুও হাসল না। মাথা নেড়ে বলল, না। আমি বড় অসহায় আর দুর্বল। আমি কিছু করতে পারছি না। এ বিটন ওল্ড ম্যান।
ওল্ড কোথায়! আপনি তো দারুণ ইয়ং লুকিং।
বাইরেটা। ভিতরে ভিতরে আমি বুড়িয়ে যাচ্ছি দুশ্চিন্তায়, টেনশনে।
অবস্থাটা কি ততটাই খারাপ?
আপনি যতদূর ভাবতে পারছেন তার চেয়েও বোধ হয় বেশী। আমাদের আর একদম সময় নেই।
তাহলে বৈজ্ঞানিকরা এতদিন কী করল মশাই?
তাদের দিয়ে যা করানো হয়েছে তারা তাই করেছে। তারাও রাজনীতি আর প্রশাসনের শিকার। তাদের মস্তিষ্ক আছে, চরিত্র নেই। তাই তারা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট, মারণাস্ত্র, দূষিত কেমিক্যালস তৈরি করে যাচ্ছে। তাদের লাগানো হচ্ছে কসমেটিক জিনিসপত্র তৈরির কাজে লাগানো হচ্ছে লোককে চমকে দেওয়ার জন্য নানা ম্যাজিক আইটেম বানানোর কাজে। লোককে বোঝানো হচ্ছে, এটা বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরের বিকল্প। বিজ্ঞান দুনিয়ার সব রহস্য ভেদ করতে চলেছে। কিন্তু যারা বিজ্ঞান জানে তারা এ কথা শুনে লজ্জায় জিব কাটে। বিজ্ঞান কোথায় পড়ে আছে তা কি জানেন? লোকে আকাশে রকেট পাঠানো দেখে, স্যাটেলাইটে টিভি দেখে ভাবছে, বিজ্ঞান বুঝি কেল্লা মেরে দিল। কিন্তু আসলে কি তাই! বিজ্ঞানের ঘরে পচা ইঁদুরও কি নেই? মহাকাশের কথা বাদ দিয়ে শুধু এই সোলার সিস্টেমের কথাই ধরুন। এরই এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে যেতে কত সময় লাগছে বলুন তো একটা রকেট বা প্রজেক্টাইলের? কত ফুয়েল খরচ হচ্ছে! কত কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে! দুনিয়ার মানুষকে উপোস, অশিক্ষা আর রোগেভোগ রেখে এই গবেষণা কী দিচ্ছে আমাদের? প্রায় কিছুই নয়। আমাদের নিকটতম নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে চার লাইট ইয়ার দূরে। যদি মানুষ কখনও আলোর গতি অর্জন করতে পারে তাহলেও সেখানে মহাকাশযান পাঠাতে লাগবে চার বছর। যদি না মাঝপথে অ্যাস্টেরয়েডরা সেই মহাকাশযান ধ্বংস করে দেয়। আলোর গতি অর্জন করাও আইনস্টাইনের মতে প্রায় অসম্ভব। সেই ফুয়েল আমাদের নেই এবং ওই গতি কোনও ম্যাটারের পক্ষে অর্জন করা অসম্ভব, বস্তুগত রূপান্তর ছাড়া। আলোর গতি পেলে ম্যাটার হয়ে যাবে এনার্জি, আমি কি একটু বেশী টেকনিক্যাল হয়ে পড়ছি।
আমি বুঝতে পারছি। আজকাল সবাই এসব বোঝে।
কৃষ্ণজীবন হতাশ গলায় বলে, বুঝছে কই? বৈজ্ঞানিকরা আমাদের খেলনা দিয়ে, চুষিকাঠি দিয়ে, রূপকথার গল্প বলে ভুলিয়ে রাখছে। কিন্তু আমরা পচা ইঁদুরের গন্ধ পেতে শুরু করেছি। আমি হিউস্টনে এক বক্তৃতায় বলেছিলাম, আমেরিকা যদি তার একটা বা দুটো রকেট উৎক্ষেপন বন্ধ রেখে টাকাটা ইথিওপিয়ার মরু-প্রকৃতিকে বশে আনতে ব্যয় করে তাহলে পৃথিবীর অনেক বেশী উপকার হবে। আমেরিকানরা তুমুল হাততালি দিল, বাহবা দিল, কিন্তু প্রস্তাবটা কার্যকর করল না।
আপনি কি মহাকাশ গবেষণা বন্ধ করার পক্ষে।
না, আমি ততটা গাধা নই। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, মহাকাশ গবেষণার কলমে কিছু মানুষ বড়লোক হয়ে যাচ্ছে এবং চলছে ওয়াইল্ড গুজ চেজ। আমি বাড়াবাড়ির বিপক্ষে। আমেরিকা যখন চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল তখন সেটা কত বড় হাই রিস্ক ভেনচার ছিল তা কি জানেন? তখনও ফুল-প্রুফ টেকনোলজি ছিল না, শুধু বাহবা পাওয়ার জন্য ওই সাতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। এইসব ইউজলেস কাজ তো বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য নয়। তার উদ্দেশ্য মানুষের মঙ্গল। কিন্তু সে কথাটা মানুষ বুঝছে কই! বিজ্ঞান-পাগল মানুষ বিজ্ঞানকে মাথায় তুলেছে, ঈশ্বরের বিকল্প করে তুলছে, অথচ বাস্তবুদ্ধি থাকলে মানুষের বোঝা উচিত ছিল, বিজ্ঞানের ভূমিকা হল মানুষের ভৃত্যের। যার চাকর হওয়ার কথা তাকে মনিব করে তোলা কি উচিত?
আপনি নিজে বৈজ্ঞানিক, তবে বিজ্ঞানের ওপর ক্ষেপে আছেন কেন?
বিজ্ঞানের ওপর ক্ষেপব কেন! আমার রাগ আহাম্মক মানুষের ওপর। অস্ত্র গবেষণায় কত কোটি কোটি ডলার খরচ হয় তা কি জানেন? এক একটা যুদ্ধে কত কোটি ডলার খরচ বলুন তো! এক একটা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কত, একটা পুওর ম্যান অ্যাটম বোমার? প্রতি মিনিটে কত মিলিয়ন ডলার ছারখার হয়ে যায়? মাটির নিচে তেল ফুরিয়ে আসছে, তবু কিছু আহাম্মক শত্ৰুতা করে জ্বালিয়ে দেয় তেলের খনি। কত তেল পুড়ে গেল! কত ক্ষতি হল মানুষের! কতখানি বিষিয়ে গেল পৃথিবীর বায়ু আর জল! কী হবে আপনার এই বৈজ্ঞানিক সভ্যতা দিয়ে, যা বর্বর, অদূরদর্শী, আত্মঘাতী?
