কৃষ্ণজীবন যেন কিছুক্ষণ আকাশ হাতড়ে বেড়াল। তারপর বলল, চয়ন! সে কে?
আপনার মেয়ে মোহিনীকে প্রাইভেট পড়ায় যে ছেলেটি! একটু এপিলেপটিক!
ওঃ, চয়ন! বলে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে কৃষ্ণজীবন অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে বলে, জানি না তো! তার সঙ্গে আমার তো দেখাই হয় না। কী হয়েছে তার?
হেমাঙ্গ হেসে বলল, তাহলে না জানাই ভাল। তবে আমার বন্ধু কণাদ চৌধুরী তার চিকিৎসা করছিল।
হবে। আমাকে কেউ কিছু বলে না।
আর আপনার স্ত্রীর মাইগ্রেন?
কৃষ্ণজীবন ফের অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, জানি না। তবে ভালই আছে বোধ হয়। ওই তো আছে ভিতরে, জিজ্ঞেস করুন না!
দরকার নেই। পরে জেনে নেবো। আপনি বোধ হয় ডোমেস্টিক ফ্রন্টের কোনও খবরই রাখেন না।
সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণজীবন বলে রিয়া, আমাকে কিছু বলে না যে।
দেন ইউ আর এ হ্যাপী ম্যান। শুনতে পাই বউদের ঘ্যানঘ্যানানিতে নাকি স্বামীরা জেরবার হয়ে যায়।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল। লোকটা হ্যান্ডসম, হাসলে খুবই ভাল দেখায়। মেহীন, রুক্ষ, ছিপছিপে চেহারায় বয়সের কোনও ছাপই পড়েনি। রিয়ার পাশে একে হয়তো বয়সে কিছু কমই মনে হবে।
হেমাঙ্গ একটু হিংসের গলায় বলে, আপনি কিন্তু বেশ ফিট, তাই না?
কৃষ্ণজীবন এই কমপ্লিমেন্টও নিতে পারল না। অস্বস্তি বোধকরে বলল, আমি কষ্টে মানুষ।
হেমাঙ্গ হেসে ফেলল, কী কথর কী জবাব! এ লোকের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার চেষ্টা বৃথা। প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্যই সে বলল, একটু ককটেল চলবে? ব্যবস্থা আছে কিন্তু!
কৃষ্ণজীবন এ কথায় শঙ্কিত হয়ে বলল, না না, ওসব নয়। আমি খাই না।
হেমাঙ্গ একটা শ্বাস ছেড়ে উদাস গলায় বলে, এইরকম ম্যাসিভ স্কেলে জন্মদিন করার কোনও মানে হয়, বলুন। ক্যাটারীর ককটেল, ডেকোরেশন! এটা কি অপব্যয় নয়?
একথাটা কৃষ্ণজীবনের যেন পছন্দ হল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ, খুবই অপব্যয়। ভীষণ অপব্যয়। আমার বা আমার ভাইবোনদের কখনও জন্মদিনটিন হত না। জন্মের তারিখ জানা ছিল না। স্কুলের খাতায় আন্দাজে জন্মের তারিখ লেখানো হয়েছিল, মনে আছে।
আচ্ছা, আপনার বাড়ি শুনেছি উত্তর চব্বিশ পরগনায়। কোন গ্রাম বলুন তো! আমার ওদিকে একটু যাতায়াত আছে।
বিষ্টুপুর। শীতলাতলা বিষ্টুপুর। স্টেশন থেকে দু মাইল দূর। আগে হেঁটে যাতায়াত করতে হত। আজকাল বাসরাস্তা হয়েছে। ছোট গ্রাম।
নামটা চেনা। ওদিকে গেলে খোঁজ নেবো।
নেবেন। একটেরে জায়গা।
কিছু মনে করবেন না, আপনি তো প্রায় একটা ইন্টারন্যাশনাল ফিগার, তবু এখনও বেশ সহজ সরল আছেন। গাঁয়ের লোক বলেই কি?
কৃষ্ণজীবনের একথাটাও পছন্দ হল। আবার একবার হাসল। তারপর মৃদু স্বগতোক্তির মতো বলল, সহজ সরল আর থাকতে দিচ্ছে কই? বুদ্ধিমান মানুষেরা, বিদ্বান মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। ফলে গ্রাম বড় ফাঁক আর অন্ধকার হয়ে যায়। আজেবাজে লোকেরা সেখানে রাজত্ব করে। ভুল শিক্ষা, ভুল রাজনীতি, ভুল ধর্ম, ভুল নৈতিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। আমাদের গ্রামগুলোকে। গাঁয়ে গেলে লক্ষ করবেন, সব সেকেন্ড গ্রেড থার্ড গ্রেড লোক সেখানে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে।
এত কথা কৃষ্ণজীবনের মুখে একসঙ্গে শুনে হেমাঙ্গ অবাক হল। ওই কিশোরী মেয়েটিও কি এ সবই শুনছিল? পলিউশনের কথা বলছিল না।
হেমাঙ্গ বলল, জানি। গ্রামে এখন খুব পলিটিকস। আপনি বোধ হয় বিষ্টুপুর ছেড়ে এসে খুব হ্যাপী নন।
একটুও না। কিন্তু হায়ার এড়ুকেশন, বেটার জব অপরচুনিটি, হায়ার স্ট্যাটাস টেনে আনে মানুষকে। মুশকিল কী জানেন? একবার চলে এলে আর কখনও ফিরে গিয়ে নিজের গ্রামে নিজেকে ট্রানসপ্ল্যান্ট করতে পারবেন না। গাঁয়ের লোকই থাকতে দেবে না আপনাকে। তবু আমি চেষ্টা করব।
হেমাঙ্গ অবাক হলে বলে, কী চেষ্টা করবেন?
ফিরে যেতে। আমি যদি যাই, তাহলে একদম চাষী হয়ে যাবো। নিজের হাতে লাঙ্গল চালাবো, ঘর ছাইব, মিশে যাবো।
হেমাঙ্গ হাসল, পারবেন না। আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন যে, আপনি পারবেন না। আমি মাঝে মাঝে গ্রামে যাই বলেই জানি, আপনার অ্যাসেসমেন্ট হান্ড্রেড পারসেন্ট কারেক্ট।
কৃষ্ণজীবন কি একটু বিষণ্ণ হল? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিষাদ মাখানো গলায় বলল, কিন্তু গ্রামে না ফিরলেও, আমাদের সবাইকেই একদিন গ্রাম্য জীবনে ফিরে যেতেই হবে। এই সব বড় বড় শহর তৈরি করাই ছিল মানুষের মস্ত ভুল। এক জায়গায় এত মানুষকে জড়ো করলে বাতাস বিষিয়ে যায়, জমে ওঠে গাদ, দূষণ। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন আর বাক্সবন্দী হয়ে যায় মানুষ। ভবিষ্যতে একদিন মানুষ নিজেদের ভুল শুধরে নিতে শহর ভাঙবেই। ভাঙ্গবে কলকারখানা, কমিয়ে দেবে রাসায়নিকের ব্যবহার, বহু ভোগ্যপণ্যকে বাতিল করে দেবে।
আপনি জনসংখ্যার দিকটাও ততা ভাববেন!
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল ফের। উদাস গলায় বলল, আগামী কয়েক দশকে প্রকৃতির নিয়মেই লাখো লাখো মানুষ মরবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ ভোগ, যুদ্ধ বা খুন—এ সবই হল জনসংখ্যার সিলিং। একমাত্র এইভাবেই কত মানুষ মরবে তা কি জানেন?
খবরের কাগজে পড়েছি বটে। নাম্বারটা অ্যালার্মিং।
আবহমণ্ডলে ওজোন হোল সৃষ্টি হওয়ায় ক্যানসার মহামারীতে দাড়িয়ে যাবে। ন্যাচারাল রিসোর্স আর জনসংখ্যার মধ্যে রেশিও রক্ষা করতে পার্জিং হবেই। আমি চোখ বুজলে দেখতে পাই পৃথিবী জুড়ে মৃতদেহের গাদি লেগে আছে। সকারের লোক নেই।
হেমাঙ্গ বারান্দার বুঝকো অন্ধকারে লোকটার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়েছিল। সে যতদূর জানে, লোকটা পাগল নয়, বায়ুগ্রস্ত নয়। লোকটা একজন বিশেষজ্ঞ। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরিসংখ্যানের জোরে কথা বলছে। তবু সে স্বগতোক্তির মতো বলল, অতটাই কি হবে! বিজ্ঞানীরা যখন উঠে পড়ে লেগেছে তখন একটা কিছু সমাধান তো হবেই। তাই না?
