ফটিকের চোখকে অবশ্য ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা পশ্রম। কারণ ফটিক সকালে ঘর ঝটপাট দিতে আসে। ঘরের জিনিসপত্র তার সবই দেখা এবং গোনা। নতুন কিছু দেখলেই সে ঝাঁটা ফেলে খেল্ দেখতে বসে যায়, ই কি নতুন কিনলেন দাদাবাবু? তা দ্রব্যটা কি? একটু চালিয়ে ভেলকি দেখিয়ে দিন তো।
ফটিক ছাড়া আর দেখবেটাই বা কে? সুতরাং সৌরচুল্পি আর ওয়াটার ফিল্টার চালু করে দেখাল হেমাঙ্গ।
ফটিক মুগ্ধ। বাক্যহারা। অনেকক্ষণ বাদে বলল, এ বাড়ির বউদিমণির খুব সুবিধে হয়ে যাচ্ছে। কাজকর্ম আর বাকি থাকছে না কিছু। সব কলকজাই সেরে দেবে। পাউডার লিপস্টিক মেখে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন শুধু।
বউদিমণিটা আবার কে রে?
আপনার যিনি বউ হবেন তার কথাই বলছি।
কেউ হবেন না। কস্মিনকালেও না।
ফটিক খুব রহস্যের হাসি হাসে। ভাবখানা যেন, ঠাট্টা ইয়ার্কি হচ্ছে। তারপর জিজ্ঞেস করে, তা কত দাম পড়ল দাদাবাবু?
হেমাঙ্গ মাথাটাথা চুলকোয়। সঠিক দাম থেকে অর্ধেক কমিয়ে বলে। তাতেও ফটিকের চোখ রসগোল্লার মতো হয়ে যায় বিস্ময়ে, অবিশ্বাসে। বলে, দেশের বাড়িতে এ টাকায় যে একখানা ঘর উঠে যায়!
হেমাঙ্গ সেটা জানে। আর জানে বলেই আর একদফা পাপবোধ এসে ভালুকের মতো চেপে ধরে তাকে।
এই পাপবোধ থেকে বেরোনোর একটা বন্ধু খুঁজছিল অনেকদিন ধরে। সুযোগটা পেল রবিবার। পিন্টুর জন্মদিন।
চারুশীলা যখনই যা করে তা বেহেড বাড়াবাড়ি রকমের। বরের টাকা আছে, যথেষ্টর চেয়েও বেশী আছে। ঠিক কথা। কিন্তু টাকা যে এরকম পাগলের মতো ওড়ানো যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস হত না। পুঁচকে একটা সাত বছরের ছেলের জন্মদিন মাত্র, বিয়ে-শাদিও নয়। তবু সারা বাড়িতে আলোকসজ্জা, স্টিরিওতে সানাই। নামী ক্যাটারার ডাকা হয়েছে। ছোটো করে ককটেল পার্টি দেওয়া হচ্ছে। হলঘরে বেলুন, রঙিন কাগজের শিকলি, ফুল আর মালা, নানা বর্ণের আলোয় ছয়লাপ। একটা ক্ষুদে স্টেজের ওপর চলছে কুইজ কন্টেন্ট, অন্তাক্ষরী, ম্যাজিক শো, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি। অন্তত পঞ্চাশ জন বাচ্চা আর শ দেড়েক মেয়ে-পুরুষ এসেছে নেমন্তন্ন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, ক্যাটারার একশ দশ টাকা করে প্লেট নিচ্ছে।
উত্তেজিত হেমাঙ্গ চারুশীলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ধরা মুশকিল। সবচেয়ে মুশকিল মেয়েদের দঙ্গলে ঢুকে ওকে টেনে আনা। মহিলাদের সমাবেশের ধারে কাছে কখনও যায় না হেমাঙ্গ। সুতরাং সে তর্কে তত্ত্বে রইল। এটা ফুটফুটে অচেনা যুবতী মেয়ে তার হাতে একটা ঠাণ্ডা নরম পানীয় ধরিয়ে দিয়ে গেছে কখন। হেমাঙ্গ সেটাতে একবারের বেশী চুমুক দিতে পারেনি অন্যমনস্কতায়।
চারুশীলার বাড়িটা বিশাল। আর্কিটেক্ট স্বামী মনের মুখে বানিয়েছে। অজস্র খাজ-খোঁজ, গুপ্ত জায়গা, আচমকা দু ধাপ সিঁড়ি বা একটি ডিপ্রেসন। এ সব কেন কে জানে! তবে ডাইনিং হলের মাঝখানে দিয়ে একটা নারকেল গাছের কাণ্ড সিলিং ভেদ করে ওপরে উঠে গেছে। প্ল্যানে বাড়ির মধ্যেই পড়েছিল গাছটা। সুব্রত–অর্থাৎ চারুশীলার বর সেটা কাটেনি। চাদে উঠলে একদম হাতের নাগালে নারকেল ফলে থাকে। হাত দিয়েই পাড়া যায়।
নানা জায়গায় চেয়ার পাতা। বসবার জন্য একটা আড়াল খুঁজছিল হেমাঙ্গ। হলঘরটায় বড় হল্লা। পাশের ঘরে ককটেল সেখানেও শান্তি নেই। আর প্রায় সর্বত্রই মেয়েদের জটলা। হেমাঙ্গ হলঘরের লাগোয়া বারান্দাটা ফাঁকা পেয়ে গেল। একটু অন্ধকার মস্ত বারান্দায় সার দিয়ে মমান্ডেড চেয়ার পাতা।
বসতে গিয়ে একটু চমকাল হেমাঙ্গ। না, ফাঁক নয়। একদম কোণের দিকে দুজন মানুষ খুব কাছাকাছি বসা। নিচু গলায় গুনগুন করে কথা কইছে।
হেমাঙ্গ সামান্য অস্বস্তি বোধ করল। কেউ প্রেমট্রেম করছে নাকি? তাহলে মূর্তিমান রসভঙ্গের মতো তার এখানে থাকার দরকার কী? উঠতেই যাচ্ছিল, হঠাৎ মনে হল, এজন বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে একজন কিশোরী মাত্র। প্রেম কি? নাও হতে পারে।
হঠাৎ কিশোরীটিই আধো অন্ধকার থেকে হেমাঙ্গকে চমকে দিয়ে ইংরজিতে বলে উঠল, উই আর টকিং অ্যাবাউট পলিউশনস।
কথাটা বুঝল না হেমাঙ্গ। তবু বলল, দ্যাটস ফাইন, ক্যারি অন।
কিন্তু জুটিটা ভেঙে গেল। বোধ হয় হেমাঙ্গর জন্যই ভাঙল। মেয়েটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে পুরুষটিকে বলল, অলরাইট, সি ইউ এগেন।
তারপর দৌড়পায়ে চলে গেল হলঘরে।
মেয়েটাকে চিনল না, কিন্তু দু তিনবার তাকাতেই পুরুষটিকে চিনতে পারল হেমাঙ্গ। তার মতোই ভীরু-ভীরু, গ্যাঞ্জাম-ভীতু, দার্শনিক টাইপের লোকটি কৃষ্ণজীবন, রিয়ার স্বামী। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে এ লোকটি বিশেষ রকমের বিখ্যাত। স্বয়ং সরকার ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এর পরামর্শ নেয়।
আরে, কী খবর? বলে দেয়ার বদল করে লোকটার একটু কাছাকাছি বসল হেমাঙ্গ।
লোকটা কম কথা বলে, মোটেই ভাল আজ্ঞাবাজ নয়, পেঁয়ো টাইপের এবং মুখচোরা। কিন্তু কৃষ্ণজীবন ওই কিশোরীটির সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলছিল এতক্ষণ। পলিউশন, গ্লোব ওয়ার্মিং, ওজোন হোল, ডিফরেস্টেশন, সমুদ্রের জলস্তরে স্ফীতি? কিশোরী বয়স কি অত জ্ঞান ধারণ করার বয়স? বিশেষ করে যখন লাগোয়া হলঘরে চলছে ম্যাজিক শশা, অন্তাক্ষরী, কুইজ কন্টেস্ট এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত!
হেমাঙ্গ আলাপ জমানোর জন্য ততটা নয়, একটা চাপা উদ্বেগ নিরসনের জন্যই হঠাৎ প্রশ্ন করল, হ্যাঁ ভাল কথা, আপনাদের সেই প্রাইভেট টিউটর চয়ন কেমন আছে বলুন তো!
