এই তাহলে-টা নিয়েই হল মুশকিল। তাহলে কী করবে অপর্ণা? ওকে ধরে মারবে, না আরও বকবে? কিন্তু লাভ হবে তাতে? আরও শক্ত, আরও গোঁজ, আরও গুটি পাকিয়ে যাবে। না হলে ঝগড়া করবে। অথচ ঝুমকিকে নিয়ে তার চিন্তার অর্ধেক ব্যাপৃত থাকে সবসময়ে। এই মেয়েটাকে কিছুতেই বুঝতে পারে না সে। একদম খোলামেলা নয়, অপর্ণার সঙ্গে বসে কখনও গল্প করে না। থাকে একটেরে। আলগোছ। কথা যেটুকু বলে তা বাবার সঙ্গে।
মণীশের প্রাণাধিক তিনজনই। ঝুমকি, বুবকা, অনু। তবু বুঝি ঝুমকিরই কিছু বেশী বশীভূত সে। বোগা, দুর্বল, অ্যালার্জিক এই মেয়েটিকে শাসন-টাসন করা একদম পছন্দ করে না মণীশ। বলে, ওকে ওর মতো থাকতে দাও। কোনও ব্যাপারে জোর জবরদস্তি কোরো না।
মণীশের বুদ্ধি পাকা নয় বলেই বলে। জবরদস্তি না করলে কি বাঁচিয়ে রাখা যেত ওকে এতদিন! উপপাস করেই তো মরে যেত।
ডাক্তাররা বলে, খেতে না চাইলে খেতে দেবেন না। একদিন দুদিন তিনদিন যদি খাওয়া নিয়ে পেশার না দেন তাহলে আপনা থেকেই খাবে।
ওসব ডাক্তারি বিদ্যেতে বিশ্বাস নেই অপর্ণার। মেয়ে তো আর ডাক্তারের নয়, তার। সে জানে, মেয়ে না খেয়ে থাকলে মায়ের ভিতরটা কেমন হয়।
পনেরো মিনিট পার করে অপর্ণা প্রস্তুত হল। আর একবার বকুনি দেওয়া দরকার। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মাংসটা চাপা দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল অপৰ্ণা। মাথাটা গরম।
ঝুমকির ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল সে। চোয়াল ও ঠোঁট কঠিন।
অনু তাকে দেখে এক গল হেসে হাত বাড়িয়ে বলল, কম অন মম, জয়েন দা ক্রাউড।
আমি জানতে চাই, এসব আর কতক্ষণ চলবে।
মাংস হলেই দিদি ভাত খাবে।
অপর্ণাকে দেখেই ঝুমকি জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। অপর্ণা বলল, কথাটা আমি ওর মুখে শুনতে চাই।
অনু একটা ঠেলা দিয়ে বলে, দিদি, বল না। বলব না।
অনু কবুণ চোখে মায়ের দিকে চেয়ে বলে, মা, ইটস নাউ এ প্রেস্টিজ ইস্যু। দিদি এখন কমিট করলে ওর ইগো একটু উন্ডেড হবে। তোমার রান্না কি রেডি?
হয়ে এসেছে।
তাহলে যাও না, আমি দিদিকে ঠিক নিয়ে যাব।
অপর্ণা সামান্য শান্ত হল। বলল, যতক্ষণ রেডি না হচ্ছে ততক্ষণ এক কাপ দুধ খেয়ে নিতে বল।
অনু চোখ বড় বড় করে বলে, দুধ! মাই গড, দুধ আবার কবে দিদি খায়। মা, ইউ আর গোয়িং টু ফার। মাংসটা হোক, দিদি খাবে।
আমি কোনওকালে শুনিনি যে, বাচ্চারা দুধ খায় না। সব বাড়িতেই একটা নিয়ম আছে। মা যা দেয়, ছেলেমেয়েরা তাই খায়। শুধু এ বাড়িতেই উল্টো।
অনু হাসছিল। বলল, আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ দুধ-টাপ খায় না মা। সব বাড়িতেই এ নিয়ে খুব ফাইট হয়।
খুব জ্ঞান হয়েছে দেখছি।
তবে অপর্ণা আর কথা বাড়াল না। যদি খায় তবেই বাপের ভাগ্যি। সংসারটা আজও অপর্ণা বুঝতে পারে না, ঠিক কেমন। ভাল না মন্দ? প্রয়োজন, নাকি না হলেও চলে? মণীশের সঙ্গে যখন তার ভালবাসা হল তখন মণীশ প্রায়ই বলত, তাদের এক ডজন ছেলেপুলে হবে। দি মোর দি মেরিয়ার।
অপর্ণা বলত, তাহলে তোমাকে পুলিশে দেবো।
কোন অপরাধে। ছেলেপুলে হওয়া তো বে-আইনি নয়।
না হলেই কি? পুলিশের কাছে বলব, এ লোকটা অত্যাচারী। জোর করে—
আরে না ভাই, ওসব ঠাট্টার কথা। তোমাকে তা বলে কষ্ট দেববা নাকি? কিন্তু আগেকার দিনে তো হত।
তখন ফ্যামিলি প্ল্যানিং ছিল না। বেশী ছেলেপুলে হলে কি হয় তা তো জানো। একটি সন্তানই যথেষ্ট। ভালভাবে মানুষ করা যাবে।
শেষ অবধি তিনটে হল। তাতে অপর্ণার বিশেষ আপত্তি হয়নি। কিন্তু এখন ভাবে, এ তিনজন তাদের দুজনকে তিনরকম দুশ্চিন্তায় রাখছে। একটা তো হল, ঠিকমতো বড় হবে কিনা! অসুখ-বিসুখ অ্যাকসিডেন্ট হবে না তো! মানুষ হবে তো! ড্রাগ-ফাগ ধরবে না তো! চরিত্র ঠিক রাখতে পারবে তো! হাজার রকমের প্রশ্ন আর প্রশ্ন।
এটা কি প্রেমের খাজনা? ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু অচেনা মাত্রাও যোগ হচ্ছে ক্রমে ক্রমে। যত বড় হচ্ছে তত কি নাগালের বাইরে যাচ্ছে। এই অচেনা ভাবটা সহ্য করতে পারে না সে।
ডোর বেল বাজল। দরজা খুলল অনু। বুবকা দরজার কাছ থেকে চেঁচাল, মা! গুড নিউজ! অপর্ণার বুক কেঁপে ওঠে। গুড নিউজ শুনেও ওঠে।
কি হল আবার?
দু ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে বাবার সঙ্গে এক মিনিট কথা বলতে পেরেছি।
কথা বলল। অপর্ণার অন্ধকার অভ্যন্তর যেন আলোয় ভরে গেল হঠাৎ। এ কয়দিন শুধু ঘুমন্ত মণীশকে দেখে এসেছে তারা। এখনও কথা হয়নি। মণীশের কণ্ঠস্বর প্রায় ভুলেই গেছে অপর্ণা।
কী বলল?
বুবকা মাকে দুহাতে ধরে বলল, তুমি কাঁদবে নাকি? চোখ তো টলমল করছে। বাবার কাছে যেতেই দিচ্ছিল না। অনেক ধরে করে যখন গেলাম তখন সেডেটিডের অ্যাকশন বেশী ছিল না। খুব টেনশন ছিল মুখে। আমি যেতেই বলল, তোেরা কেমন আছিস? কি করে চলছে।
গলার স্বর কেমন ওনলি? নরমাল?
নরমাল। তবে একটু হাকি। আমি বললাম, আমরা খুব ভাল আছি। কোনও গণ্ডগোল নেই।
একটু হাসল কি?
একটুখানি। আর কিছু বলার আগেই নার্স বের করে দিল। আর একটা গুড নিউজ হল, বাবা সকালে স্যুপ খেয়েছে। নিজেই। নো হেলপ। আজকেই হয়তো কেবিনে ট্রান্সফার করতে পারে।
অপর্ণার দুচোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ে ভেসে যাচ্ছে বুক। মণীশ ফিরবে। মণীশ ফিরছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশী অপর্ণা আর কী চাইতে পারে?
দুটো পেলব হাত পিছন থেকে তাকে ধরল, মা।
অপর্ণা চোখের জলের ভিতরে দিয়ে ঝুমকির অস্পষ্ট মুখটা দেখতে পেল! মান অভিমান রাগ ভেসে গেল কোথায়। দুহাতে ঝুমকিকে আঁকড়ে ধরে তার বুকেই মাথা গুঁজে দিল সে। যেন সে বাচ্চা মেয়ে, মায়ের বুকে আশ্রয় খুঁজছে।
০১৫. দুদুটো প্রেমে পড়ে গেল হেমাঙ্গ
এক সপ্তাহের পর পর দুদুটো প্রেমে পড়ে গেল হেমাঙ্গ। একেই বলে ইন কুইক সাকসেশন। কুইক সাকসেশন কথাটার সঠিক বাংলা কী হবে? উপর্যুপরি? হা তাই। উপর্যুপরি দুদুটো লাভ অ্যাফেয়ার। এবং কন্যাহরণের মতোই, অবৈধ প্রেমিকার মতোই খুব গোপনে গাড়ি করে বাড়ি নিয়ে এল সে। কিন্তু ঘরে তুলল না ফটিকের ভয়ে। একটু গাঢ় রাত্তিরে দু দিনই সে তার দুটি প্রেমিকাকে গাড়ি থেকে কোলে করে বয়ে আনল ঘরে। একটি সৌরচুল্লি এবং অন্যটি ইলেকট্রনিক ওয়াটার ফিল্টার। চুরি করে নয়, লোক ঠকিয়ে নয়, নগদ দামে কেনা। তবু এইসব জিনিস ঘরে আনার সময় এবং পরে কয়েকটি দিন কেন যে এক অদ্ভুত পাপবোধ কষ্ট পায় সে তা কে জানে!
