মোটেই দারুণ নয়।
আমার কাছে কিন্তু খুব থ্রিলিং লাগে। ইন ফ্যাক্ট, আমি মাঝে মাঝে চুপ করে বসে ভাবি যে, আমার আসল মা-বাবা এরা নয়, অন্য কেউ। আমাকে এরা কোনও ডেস্টিটিট, হোম থেকে বা অন্য কোন জায়গায় কুড়িয়ে পেয়েছে। আই অ্যাম অলরাইট হিয়ার, নো প্রবলেম। কিন্তু অন্য কোথাও আমার আসল মা-বাবা আমার কথা দিনরাত ভাবছে, আমাকে খুঁজছে, আমার জন্য কাঁদছে। কী ইম্পৰ্ট্যান্ট ওদের কাছে এই লস্ট আমিঃ রিয়েল পেরেন্টরা তো একটু বোরিং। কিন্তু লস্ট পেরেন্টরা ভীষণ রোমান্টিক, তাই না?
ঝুমকি চুপ করে রইল। তবে তার মুখে একটু স্মিত হাসি।
অনু মৃদু স্বরে বলে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোকে? ডোন্ট প্লে বিগ সিস্টার, প্লীজ! তোর কোনও বয়ফ্রেন্ড হয়নি?
ঝুমকির মুখ এ কথায় সামান্য কঠোর হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে চাপা গলায় বলল, আমার কেন ওসব হবে? আমার তো কিছু নেই। না রূপ, না গুণ।
ডোন্ট ন্যাগ দিদি। সবাই জানে তুই কেমন।
আমি কেমন?
কোয়াইট অল রাইট। ইউ আর বিউটিফুল ইন ইওর ওন ওয়ে। কিন্তু তুই ভীষণ মেজাজী। আজকালকার ছেলেরা রাগী মেয়েদের ভয় পায়।
রাগী! কই আমি তো রাগী নই।
ভীষণ রাগী। তার মানে ইউ হ্যাভ এ পারসোনালিটি। ওটা সকলের থাকে না। রেয়ার। পারসোনালিটি মিনস স্ট্রং লাইকস্ অ্যান্ড ডিজলাইকস্। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে, আমার মধ্যে বা দাদার মধ্যে পারসোনালিটি কিছু নেই।
খুব কথা শিখেছিস।
আমি যখন বড় হবো, ঠিক তোর মতো হবে। একটু মব, একটু অহংকারী, একটু দেমাক আর মেজাজ হবে। কেউ চট করে কাছে ঘেঁষতে পারবে না। তবে তখন একটা প্রবলেম হবে।
কি প্রবলেম?
যারা স্ট্রং পারসোনালিটির হয় তারা কিন্তু একটু লোনলি। চট করে কারও সঙ্গে মিশতে পারে না তো। তাই দে আর ন্যাচারালি লোনলি সোলস্।
খুব পেকেছিস তো।
আমি এসব নিয়ে খুব ভাবি। পিপল অ্যান্ড দেয়ার ক্যারেকটারিস্টিকস।
তোর কোনও ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ভাব নেই তো!
অনু এ প্রশ্ন শুনে খিলখিল করে হাসল, সেই তো দিদিগিরি শুরু হল। বিগ সিস্টার, আমি তো কোড-এ পড়ি। দেয়ার আর বয়েজ অ্যান্ড বয়েজ। কিন্তু ফ্রেন্ড একটাও নয়।
কেন?
আমার কনটেম্পোরারি ছেলেগুলোর ডেপথ্ ভীষণ কম। মগজ নেই। মনে হয় অল আর কম্পিউটার।
ঝুমকি কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, তাহলে তোর কী হবে রে?
কেন, আমার তো একটু এজেড, একটু এরুইট, একটু ফিলজফিক পুরুষকে বেশী ভাল লাগে। মানে মেন উইথ পারসোনালিটি। তোর?
ঝুমকি বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলে, আমার যে কী ভাল লাগে, আমি বুঝতেই পারি না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্য একটা ফ্যামিলিতে গিয়ে–মানে বিয়ের পর—একটু অন্যরকম লাগতে পারে।
অনু চোখ বড় বড় করে বলে, তুই এখনই বিয়ের কথা ভাবছিস? সত্যি!
আহা, ভাবতে দোষ কি? ভাবা তো কিছু খারাপ নয়। ভাবা আর করা কি এক?
এনিওয়ে, আমি তো ভাবতেই পারি না।
আমার মতে বয়স হোক, তারপর ভারবি।
অনু ফের হাসে, সেই দিদিগিরি। তুই আমার চেয়ে কতই বা বড়। ইউ আর স্টিল ভেরি টেভার এজেড।
তোর মাথা! মা এখন আমাকে বিয়ে দিয়ে বিয়ে করতে পারলে বাঁচে। আমি শুনেছি, মা প্রায়ই বাবাকে আড়ালে আবড়ালে বলে, ঝুমকির কিন্তু বয়স হল, পাত্র দেখতে থাকে।
হি হি। মা একটু পাগলি আছে, না রে?
একটু সেকেলে।
তুইও একটু সেকেলে। আচ্ছা, মা যখন ওকথা বলে, তখন বাবা কী জবাব দেয়?
বাবা উড়িয়ে দেয়। বলে দুর দুর। এখনই বিয়ের কি!
বাবারা ওরকমই হয়। আচ্ছা দিদি, তোর কি খিদে পায় না? সত্যিই পায় না?
আবার ও কথা! পারলে আমি এ বাড়ির খাওয়া ছেড়েই দিতাম।
আহা, রাগের কথা বলছি না। কিন্তু এমনিতেই দেখি, তোর মিল খুব গ্যাল। একটুখানি করে বাস। চড়াই পাখির মতো। কিন্তু আমি আর দাদা খুব খাই।
আমার স্টমাকটা বোধ হয় ছোটো। খেতে আমার ভাল লাগে না।
কিন্তু তুই খুব ফুচকা খাস, আর তেলেভাজা। তাই না?
ঝুমকি হাসল, খাই। আর অম্বল হয় ভীষণ। তবু খাই।
আমি ফুচকাটা স্ট্যান্ড করতে পারি না। তেলেভাজাও না। ভীষণ আনহাইজিনিক। হাইজিন ভেবে খেলে শুধু শুকতো আর ঝোল খেতে হয়। মা গো!
তুই পাতে ভাত ফেলিস, আমি ফেলি না।
আমিও ফেলতে চাই না। কিন্তু মা যে জোর করে বেশী তাত দেয়।
মা পাগলি আছে। আমার কাছে একটা চকোলেট বার আছে, খাবি?
না।
রাগ করছিস কেন বাবা! আমার সঙ্গে তো ঝগড়া নয়।
রান্নাঘরে উৎকর্ণ হয়ে আছে অপৰ্ণা। দুই বোনে গুনগুন করে কথা হচ্ছে ঘরে। কি কথা হচ্ছে ওদের? ঝুমকি কেন এখনও কিছু খাচ্ছে না? খাওয়া নিয়ে বরাবর ঝুমকির নাক সিঁটকানো। কোনওদিন কোনও খাবার খেয়ে বলে না, উঃ, দারুণ হয়েছে তো! কোনওদিন বলে না, মা ওমুক জিনিসটা রাধবে? খাওয়াটাই যেন ওর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের কাজ। সেই জন্যই রোগা, সেই জন্যই ওর শরীরে হাজারো রোগ। আর সেইজন্যই ওর অপর অপর্ণার এই রাগ। সেই শিশুকাল থেকে ওকে খাওয়াতে হিমসিম খেয়েছে সে, গলদঘর্ম হয়েছে, মেরেছে, বকেছে, কেঁদেছে। আজ অবধি স্বভাব পাল্টাল না। একটা জিনিস চেয়ে খায়, সেটা চা। কিন্তু চা তো কোনও খাদ্য নয়। বরং অনিষ্টকারী। বিশেষ করে খালি পেটে।
অপর্ণার চোখ কড়াইয়ের দিকে। মাংস ফুটছে। কিন্তু তেমন ভাল গন্ধ বেরোচ্ছে না। কী একটা জিনিস দিতে ভুল হয়েছে। কিন্তু মনে করতে পারছে না সে। মেজাজ বিগড়ে আছে, মাথা কাজ করছে না। আরও পনেরো মিনিট দেখবে অপর্ণা। তার মধ্যে ও যদি না যায় তাহলে–
