ছোটলোকে যা ভাবে তাই বলে, সবসময়ে মাথা খাঁটিয়ে তো বলে না। নিমাই তাই চুপ করে থাকে।
পাঁচু নিজে থেকেই বলে, অবিশ্যি সিনেমায় নামলে অন্য কথা। তখন তো সোনার খাটে মাথা, রুপোর খাটে না। গাড়ি, বাড়ি, টাকায় ভাসাভাসি। টাকা থাকলে তখন আর পাপটাপ অৰ্শায় না। রাবণরাজার কথা তো জানো, স্বয়ং শিবঠাকুর তার বাড়ি চৌকি দিত।
বীণাপাণি সিনেমায় নামবে কিনা তা নিমাই জানে না। তবে ছেলেপুলে যে এখনই চায় না সেটা নিৰ্মাই জানে। স্টেজে উঠে মেলা নাচন কৌদন করতে হয়, গলা তুলতে হয় সপ্তমে, ওসব করতে গেলে শরীরের তাগদ চাই। ছেলেপুলে হয়ে পড়লে অসুবিধে আছে। আর নিমাই-ই বা কোন মুখে চাপাচাপি করবে। নিজেই যে দাড়ের পাখি হয়ে আছে।
বৃষ্টিটা ছাড়ল না। তবে চাপটা একটু কমল। চারদিকটা যেমন ধোঁয়াটে হয়ে গিয়েছিল তেমনটা আর নেই।
নিমাই বলল, চল, কাকার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে বাড়ি যাই।
পাঁচু নড়ল না। বলল, অত তাড়া কিসের? আজ টাকা পেতে দেরি হবে। হাঙ্গামা আছে।
কিসের হাঙ্গামা?
বটতলায় একটা ছেলে খুন হল না সেদিন? সেটা নিয়েই কী সব হচ্ছে-টচ্ছে।
সে তো পগা।
পগাই বটে নামটা। ডলার আর পাউন্ড বিকিকিনি করত।
সে শুনেছি।
তা তার মহাজন কলকাতা থেকে লোকজন নিয়ে এসেছে। পগার কাছে নাকি মেলা সাহেবী টাকা ছিল।
হ্যাঁ, মাঝে মাঝে … বলতেই যেন ভগবান জিবখানা টেনে ধরলেন। সে বলে ফেরতে যাচ্ছিল যে, বীণাপাণির কাছেও মাঝে মাঝে টাকা গচ্ছিত রেখে যেত। কথাটা পাঁচকান হওয়া ভাল নয়।
পাঁচু উদাস গলায় বলল, বড় বড় বানরের বড় বড় লেজ। কত খুনখারাপি হচ্ছে কেউ গা করে না। পগা মহাজনের লোক বলে এখন নাড়াঘাটা পড়েছে।
তাতে কাকার হাঙ্গামা হচ্ছে কেন?
কে জানে বাপু কি বৃত্তান্ত, নাম-ধাম শুনতে চেও না, তবে শোনা যাচ্ছে খুনটা যারা করেছে তারা কাকার দলের হোকরা সব।
আজকের দশটি টাকা পেলে নিমাইয়ের সত্তরটা টাকা হয়। আর তিনটে ক্ষেপ মারতে পারলে পুরো একশ। একশ হলেই পালপাড়া। মা-বাবার মুখে হাসির ঢল। নিমাইয়ের নিজের রোজগার বলে টাকাটার দামও কি একটু বেশী? কে খুন হল, সে সেটা করল আর কারা তার তত্ত্বতালাশ করতে এসেছে এসব নিয়ে নিমাইয়ের মাথাব্যথা নেই। তার ভাবনা হল, হাঙ্গামায় টাকাটা যদি আজ কাকা না দেয় তা হলে কাল এই বকেয়া টাকাটা দিতে কাকা ভুলে যাবে না তো? নাটক-পাগল লোক, ভুললে দোষ কি? তবে সমস্যা হল, মুখ ফুটে সেটা চাইতে পারবে না নিমাই। দিনের হিসেব দিনকে মিটে গেলেই ভাল।
দোকানটা কবে খুলছো?
নিমাই বেজার মুখ করে বলে, হবে।
হবে সে আমিও জানি। তবে মহেন্দ্ৰ মোটা টাকা ঘেঁকে বসেছে তো। ছহাজারের নিচে নামতে চাইছে না, না?
এ বাজারে দরটা আর নামাচ্ছে কে?
তবে তোমার বউ যখন লেগেছে ও হয়ে যাবে।
এ কথাটা নিমাই বুঝল না। বীণাপাণি তো আর বড়লোক নয়। কাকার দয়ায় খেয়ে পরে কোনওক্রমে আছে। একেবারে হাততোলা অবস্থা। শহরের বাইরের দিকটায় এবং ভিতর ভাগে একটুখানি জমি কিনতে দম শেষ হয়ে গিয়েছিল বীণার। বেড়া আর টিন দিয়ে যে ঘরখানা তুলেছে সে টাকার জোরে নয়, মনের জোরে। মহেন্দ্ৰ যে ছহাজার টাকা চেয়েছে সেটা জানতই না নিমাই। এই শুনল। ফলের দোকান এমন কিছু লাভের ব্যবসা নয়। বনগাঁয়ে ফলটা খাবে কে? পুজোআচ্চায় কলাটা শশাটা কিছু বিক্রি হয় আর সিজন ফল। দুহাজার টাকা সেলামি দিলে সে টাকা উসুল করতে নিমাইয়ের বহু বছর চলে যাবে। আজই গিয়ে বীণাকে বারণ করতে হবে।
পাঁচু উদাস মুখে বলল, মনোহারি দোকানেও খরচাও আছে। কম করেও পনেরো বিশ হাজার টাকা লাগসই না করলে হবে না। তার ওপর ধরো কাচের বাক্স, আলমারি এসবেরও খরচ ভালই।
নিমাইয়ের মাথায় ছোটো একটা বজ্ৰাঘাত হল। একদিন ঠাট্টা করে মনোেহরি দোকানের কথা বলেছিল বটে বীণা। তা হলে সে কাণ্ডই হতে যাচ্ছে! নিমাইয়ের চোখটা ঘোলাটে হয়ে এল। এসব হচ্ছেটা কী? বীণার ট্যাকের তত এমন জোর। নেই। আর এসব ঘরের কথা তাকে পাঁচুর মুখেই বা গুনতে হচ্ছে কেন? মনোহারির কথা, ছহাজার সেলামির কথা তো তাকে বলেনি বীণা! এদিকে বাজারে তো চাউর হয়েছে দেখা যাচ্ছে।
পাঁচু তেমনি উদাস মুখে বলে, বিয়ে তোমার সয় না বলছিলে। তা দেখ বাপু, তোমার মতে বউ এ তরাটে এটা লোকের আছে। তোমার মুবোদ না থাক বউ তো দশভুজার মতো আগলাচ্ছে।
কোনও কারণ নেই, তবু নিমাই তাড়াতাড়ি বলল, হ্যাঁ, বীণার মতো মেয়ে হয় না। আসলে বলতে চেয়েছিলুম কি জানিস, বীণার মতো বউ কি আমার কপালে জোটা উচিত। আমি কি একটা মনিষ্যি?
পাঁচু তার ক্ষয়া দাঁতে হাসল, তা যাই বলো বাপু, কার ভিতরে কী আছে ভগবান জানে। তোমার কথা বলতে হয় তো বলি, যখন কীর্তন গাও তখন কিন্তু মনটা ভারি ভিজে যায়। তোমার গলায় যেন হরি এসে বসেন।
নিমাই লজ্জার হাসি হাসল, হরির আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই।
পর পর দুখানা গাড়ি, একখানা জীপ আর একখানা মারুতি বটতলার দিকে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেল।
পাঁচু বলল, ওই যাচ্ছে।
কে রে?
ওই যারা কলকাতা থেকে এসেছে। জিপ আর মারুতি নিয়ে।
এত কথা তোকে কে বল?
সকাল থেকে কাকার বাড়িতে রিক্সা ঠেকিয়ে বসেছিলুম তো। ওখানকারই সুধীর বলল। সে কাকার অপেরার একজন বাজনদার। মুখ-পকা তোক।
চিনি।
কলকাতার বাবুরা চলে গেল বোধ হয়। আবার আসবে ঠিক। একটা গণ্ডগোল পাকাচ্ছে। মারদাঙ্গা লাগবে মনে হয়। যাবে নাকি? গেলে বলো, এখন একটু ফাকায় পাওয়া যাবে তেনাকে।
