নিমাই রিক্সায় উঠে বসল। তার বুকে বড় ভয়। বীণাকে এই এত এত টাকা জোগাচ্ছে কে? খুব বড় কোনও বাবু? কথাটা মুখোমুখি জিজ্ঞেস করতেও তত বাধে। কে দিচ্ছে টাকা? তার চেয়েও বড় কথা, কেন দিচ্ছে? সিনেমায় নামার যে কথা শুনছে পাঁচুর মুখে সেইটিই কি সত্যি নাকি? বীণাকে নিয়ে যে এত মাথা ঘামাতে হবে তা জানা ছিল না তার।
কাকার বাড়িতে আজ থমথমে ভাব। বাইরের ঘরখানায় যারা গম্ভীর মুখে বসে আছে কাকাকে ঘিরে, তারা কেউ যাত্রার দলের নয়। এরা কাকার অন্য দিককার লোক। স্মাগলার কাকা আর যাত্ৰাদলের কাকা দেহে এক হলেও দুটো আলাদা। আলাদা মানুষ। এখন যে মানুষটা ঘরে সবার মধ্যমণি হয়ে বসা সে মোটেই যাত্ৰাদলের কাকা নয়। একে দেখলেই বুক দুরদার করে।
কাকার বাড়িখানা পাকা আর দু মহলা। মহল না হলেও দুখানা আলাদা ভাগ আছে। সামনের বৈঠকখানা গোছের ঘরখানা বাড়ি থেকে অন্তত দশ বারো গজ তফাতে। গোটা বাড়ি দেয়ালবন্দী। গাছপালা আছে।
ঘরের ভিতরকার চেহারা বারান্দা থেকেই দেখতে পাচ্ছিল দুজন। গতিক সুবিধের নয়।
একটা ছোকরা এগিয়ে এসে বলল, কী চাই।
পাঁচু বলল, আমাদের মজুরীটা?
এখানেই দাঁড়াও। বলে ছেলেটা ঘরে গেল আর পরমুহূর্তেই বেরিয়ে এসে মজুরীর টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, কাকা বলে দিয়েছে কাল থেকে আর বেরোতে হবে না। এখন যাও।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একশ পুরল না।
বাড়ি যখন ফিরল তখন নিমাইয়ের বুকখানা বড় ভার। অনেক কথার জবাব খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক কথার জবাব সে কখনও পাবেও না।
হাতমুখ ধুয়ে যখন ঘরে ঢুকে বসল তখন বীণাপাণি উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে একটা খাতায় কী যেন লিখছে।
কী লিখছো?
ও কিছু নয়। একটা হিসেব।
নিমাই একটু গলা খাকারি দিয়ে বলল, শুনলুম মহেন্দ্র অনেক টাকা সেলামি চাইছে।
কে মহেন্দ্ৰ?
যার দোকান নেবে বলে ঠিক করেছো!
বীণা মুখ তুলে বলল, নিইনি এখনও। কথা বলছি।
কী দরকার? ছহাজার টাকা কি সোজা কথা? আমাদের অত টাকা তো বেচলেও উঠবে না।
তোমাকে ভাবতে কে বলেছে?
না ভেবে কি পারি? তোমার জন্যই ভাবি আমিও তো তোমার জন্য ভাবি বলেই করছি।
সে খুব জানি। তোমার মতো মেয়ে হয় না। সদ্বংশে জন্মেছো, তোমার ধরনই আলাদা। তবু বলি টাকাপয়সা হাতে রাখো। মহেন্দ্ৰ যা টাকা চাইছে তা আমাদের নাগালের বাইরে। আমার চাকরিটাও আজ থেকে নট হয়ে গেল।
বীণা অবাক হয়ে বলে, কেন? কাকা তো বলছিল আউরঙ্গজেব খুব ঘটা করে নামাবে। দু মাস ধরে মাইকে প্রচার হবে।
কী সব গণ্ডগোর শুনে এলুম।
কিসের গণ্ডগোল।
ওই যে পগা খুন হয়েছিল, তার মহাজন আজ এসেছে পাইক-পেয়াদা নিয়ে। অনেক নাকি সাহেবী টাকা ছিল পগার কাছে। সেই সব খোঁজ-খবর হচ্ছে আর কি!
তাতে কাকার কি?
কাকার সঙ্গেই তো গণ্ডগোল। খুনটা নাকি তার দলের ছেলেরাই করেছে।
সন্ধের মরা আলোতেও দেখা গেল বীণাপাণির মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। লেখা ছেড়ে উঠে বসল সে, আর কী শুনে এলে?
এইটুকুই। কাকার ঘরে আজ সব ষণ্ডারা জুটেছে। শলাপরামর্শ হচ্ছে।
তোমাকে কে বলল?
বাতাসে কথা উড়ছে। রিক্সাওলাটা অবধি সব জানে।
বীণা হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর আর দুঃখী হয়ে বসে রইল। এ সময়টায় নিমাই ফিরলে উঠে রুটি বা মুড়ি চানাচুর যা হোক কিছু দেয়। আজ নড়ল না।
নিমাই বিছানার একধারে পা তুলে বসল। বলল, আজ ঠাণ্ডা লেগেছে। যা আচমকা বৃষ্টিটা এল।
বীণা হঠাৎ তার দিকে চেয়ে বলল, কাল সকালে বিষ্টুপুর যাই চলো।
বিষ্টুপুর। সেখানে কেন?
মা দেখতে চেয়েছে আমাকে। বাবার চিঠি এসেছে আজ।
তা আমার আর কাজ কি? গেলেই হয়। বাড়ি দেখবে কে?
দেখার লোক আছে। এখনই গোছগাছ করে নিই চলে। সকালের বাস ধরব।
গোছগাছ বেশী নয়। একখানা সুটকেসে সবই এঁটে যায়। বীণা তবু আর একখানা টিনের বাক্স নিল। তারপর হঠাৎ বলল, দোকান থেকে একটু মিষ্টিটিস্টি কিনে আনো তো! বাবা খুব গুজিয়া ভালবাসে।
গুজিয়া এনে নিমাই দেখল, গোছানো শেষ।
খেয়েদেয়ে সকাল সকালই বিছানায় গেল দুজন।
সকালের বাস পাঁচটায়। ভোরে না উঠলে হবে না।
কত রাত হবে কে জানে, হঠাৎ দরজায় ধাক্কা পড়ল।
বীণা? এই বীণা? দরজা খোলো!
দুজনেই উঠে বসল। ভয়ে সিটিয়ে থেকে বীণা বলল, কে?
আমি কাকা। দরকার আছে। দরজা খোলা।
অন্ধকারে বীণা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে নিমাইয়ের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে চাপা গলায় বলল, বড় ভয় করছে।
০১৪. মায়ের সঙ্গে ঝুমকির বোঝাপড়ার অভাব
মায়ের সঙ্গে ঝুমকির বোঝাপড়ার অভাবটা অনেক দিনের পুরনো। এতই পুরনো যে এখন ব্যাপারটা তার গা-সওয়া, অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কি থেকে কি হয়, কেমন করে হয় তা জানে না ঝুমকি। শুধু জানে, তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সেই মায়ের সবচেয়ে অপছন্দের সন্তান। সে বড়, সে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েনি, সে একটু অলস, একটু প্রতিবাদী—এগুলো দোষ কিনা কে বলবে? কিন্তু তার মা অপর্ণার চোখে সবটাই তার দোষ। তার সব কিছুর মধ্যে দোষ। এ সংসারে মোট পাঁচ জনের মধ্যে ঝুমকির পক্ষে আছে একমাত্র তার বাবা।
তার বাবার হার্ট অ্যাটাকের পর এ বাড়িতে চলে গেল ভূতের হাতে। শোক, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ পাথরের মতো চেপে বসল বাড়িটার ওপর। মায়ের সঙ্গে ঝুমকির ব্যক্তিত্বের সংঘাত কটা দিন নিরুদ্দেশ ছিল। বাড়িটা নিঝুম আর চুপচাপ হয়ে রইল কিছুদিন।
বাবার সামাতিক বিপদের অবস্থাটা খানিকটা সামাল দেওয়া গেছে। হার্টের ব্যাপার অবশ্য সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। সুস্থ হয়ে ওঠার পরই হয়তো আর একটা মারাত্মক অ্যাটাক এসে সব হিসেব ওলটপালট করে দেয়। তবু সংকট কাটিয়ে উঠছে তার বাবা। ব্যথা নেই, ঘুমের ওষুধ কম দেওয়া হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যেই ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে কেবিনে স্থানান্তরিত করা হবে তাকে।
