ঘুমটা এল আচমকা, নোটস না দিয়ে। ঘুমিয়ে মেলা স্বপ্ন দেখতে লাগল নিমাই। একটা স্বপ্ন ভারি ভাল। তার মা মর্তমান কলা আর দুধ দিয়ে চিড়ে মেখে খুব খাচ্ছে এক ডেলা গুড় দিয়ে।
ও নিমাইচন্দ্র, ওঠো! ওঠো!
নিমাই উঠে বসে। ঘেমে একেবারে চান করে উঠেছে।
ডাকনি কেন?
মেঘ চমকাচ্ছে। নামল বলে।
নিমাই একবার ময়লা কালো আকাশের দিকে চেয়ে বলল, নামলে বাচি। যা পচা গরমটা পড়েছে!
কোনদিক যাবে এবার? আমাদের টাইম কিন্তু শেষ হয়েছে।
তাহলে বাজারপানেই চল। মাইক-টাইক সব বুঝিয়ে ফেরত দিয়ে দিই।
পোকাটা অনেকক্ষণ কুটকুট করে কামড়াচ্ছে। মাথাটা ঠিক নেই, বীণা টাকাটা পাচ্ছে কোথা থেকে?
ব্ৰজবাসীর মাইকের দোকান অবধি পৌছোতে পারল না তারা। তার আগেই রেলগাড়ির মতো একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা এল, আর তার পিছু পিছু রসমুণ্ডির মতো বড় বড় ফোঁটায় হরির লুঠ ছড়াতে ছড়াতে বৃষ্টি।
ভিজে চুব্বস হয়ে ব্ৰজর দোকানে উঠে পড়ল দুজন। ব্ৰজবাসীর ছোকরা কর্মচারী যন্ত্রপাতি তুলে নিল দোকানে। বলল, ভিজিয়ে ফেললে? এসব ইলেকট্রনিক জিনিস, বরবাদ হলে দাম দেবে কে?
নিমাই কথা বলল না। তবে পাঁচু বলল, বৃষ্টি কি আমার বাপের চাকর যে হুকুম মেনে নামবে? অতই যদি তোয়াজের জিনিস তবে ভাড়া দেওয়ার সময় সঙ্গে একটা ঢাকনা দিয়ে দিস না কেন?
ব্ৰজবাসীর দোকানের সামনে একখানা বারান্দা আর তাতে বেঞ্চ আছে। দুজনে বসল পাশাপাশি। বৃষ্টির ছাঁট আসছে, প্রবল বাতাস।
পাঁচু বলল, একটু চা হলে হত, কী বলো!
নিমাই মাঝে মাঝে খায়, তবে নেশা নেই। বীণাপাণির চায়ের নেশা আছে বলেই নিমাইকে মাঝে মাঝে খেতে হয়। নিমাই উদাস গলায় বলে, তা খা না। ওই তো পর দোকানে হচ্ছে।
পাঁচু নড়ল না, বসে রইল। খানিকক্ষণ বাদে বলল, এবার বৃষ্টিটা খুব ভোগাবে, বুঝলে! লক্ষণ ভাল নয়। চাষবাসের বারোটা না বাজে।
চাষবাস নিয়ে নিমাইয়ের ভাববার সময় নেই। তার মাথায় অন্য পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বীণাপাণির ঘরে যদি পরপুরুষ ঢুকেই থাকে তবে এতক্ষণ কি সে আছে? থাকলে এই বৃষ্টিতে সেও বেরোতে পারবে না। টাকাওলা লোক কি? জোয়ানমদা? নাকি বুড়োধুড়ো?
পাপের চিন্তা করলে শরীর কোয়, মন শুকোয়। দুনিয়াটাই শুকিয়ে যায়। এই বৃষ্টি-ভেজা বিকেলটা নিমাইয়ের কাছে ভারি শুকনো ঠেকছে। সে হঠাৎ বলল, হ্যাঁ রে পাঁচু, তুই ভগবান মানিস?
পাঁচু একখানা বিড়ি বের করেছে। দেশলাই রাখে না বলে ধরাতে পারছে না। বলল, তা মানি। শীতলা মানি, কালীঠাকুর মানি। তবে আমরা পাপী-তাপী লোক, ভগবানের কথা আর ভাবতে পারি কই বলো!
আমার খুব ভগবানের কথা মনে হয়। একটু শাস্তর জানা থাকলে, মন্ত্র নেওয়া থাকলে বেশ হত। কিছু হল না। সংসারের প্যাঁচে পড়ে গেছি।
পাঁচু তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, তোমার আবার সংসার টোনাটুনি মিলে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আছে। পাঁচখানা ছেলেপুলে নিয়ে আমার মতো ফাঁদে পড়তে তো বুঝতে!
বিয়ে কি সকলের সয় রে! সংসার আমার জন্য নয়। ইচ্ছে ছিল সারাদিন কাজটাজ করব, সন্ধেবেলা প্রাণভরে কীর্তন করব। তা আর হল কই?
তোমার একটু সাধু-সাধু ভাব আছে বটে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির ঘোরে চারদিকটা ছাইরঙা হয়ে গেল। দুৰ্জয় গরমটা উড়ে গেল কোথায়। ভেজা গায়ে বাতাস লেগে একটু শীতশীত করছে। আগে সঙ্গে সবসময়ে একখানা গামছা থাকত। তাতে ভারি সুবিধে। কিন্তু আজকাল বীণাপাণি গামছা নিতে দেয় না। ওটা নাকি ভারি ছোটলোকি ব্যাপার। পাঁচু দিব্যি তার গামছাখানায় ভেজা মাথা আর মুখ মুছে নিয়ে বসে আছে। নিমাইয়ের সে সুবিধে নেই। পকেটে একখানা বুমাল আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে গামছার কাজ চলে না। পাঁচুর গামছাখানা ধার নিতেও ইচ্ছে যায় না। বড় নোংরা।
গা গরম করতেই গুনগুন করে একখানা গান ধরেছিল নিৰ্মাই। কিন্তু কপালের এমনই ফের, যে গানটা মনে এল সেটার মধ্যেই বিষ মেশানো। আমার বন্ধুয়া আন-বাড়ি যায় আমার আঙ্গিনা দিয়া…। নিয়মিতই হবে। নইলে এ গানখানাই ভুস করে মাথায় ভেসে উঠল কেন? গান ধরতেই মনটা কু গেয়ে উঠল, বীণাপানির ওসব দোষ আছে কি? নিমাই তো ঝাঁঝালো পুরুষ নয়, পয়সার জোরও নেই। বীণার আর দোষ কী?
মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুর কী জানিস পাঁচু?
পাঁচু একটু রাগ করে বলে, গানটা গাইছিলে তাই গাও না। বেশ তো শুনতে লাগছিল। এর মধ্যে আবার ওসব গন্ধমাদন কথা কেন?
না, বলছিলাম আর কি! মানুষের সব চেয়ে বড় শত্তুর হল তার মন।
আরে, ওসব জানি। ওসব হল তত্ত্বকথা। আমর মতো গরিবের মন কোথায় থাকে জানো? পেটে আর অণ্ডমোষে। সারাদিন রিক্সা টেনে মুখে রক্ত তুলতে তো বুঝতে, মনটন সব কোথায় গিয়ে সেঁধোয়। বরং গানটা গাও। কীৰ্তন শুনলে একটু ভাব আসে আমার।
নিমাই ফের গানটা ধরল। গলাটা খেলছে না ভাল। কিন্তু পাঁচু চোখ বুজে শুনছে গানটা শেষ করে নিমাই বলল, মন ভাল থাকলে দুনিয়াটা ভারি ভাল, আর মন বিগড়লে পরমান্নও তেতো।
আমি বলি কি, ছেলেপুলে করে ফেল এইবেলা। মনটন সব কায় এসে যাবেখন। সবাই বলে বীণাপাণি সিনেমায় নামবে বলে চেহারা রাখছে। তাই ছেলেপুলে হচ্ছে না। সত্যি নাকি?
নিমাইয়ের কান একটু গরম হল। বীণাপাণিকে নিয়ে বেশ কথা হয় এ অঞ্চলে।
পাঁচু দূরের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ওটাও অর্ধর্ম হচ্ছে, বুঝলে? আত্মারা সব চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের জন্মাতে না দেওয়াটাও পাপ।
