একখানা রিক্সা ট্যাঙস ট্যাঙস করতে করতে চলেছে। তাতে মাইক ফিট করা। ফাটা গলায় চিহি সুরে প্রচার চলছে। বিশ্ববিজয় অপেরার আগামী পালা আউরঙ্গজে–ব! আউরঙ্গজে–ব!
পালা নামতে এখনও পাক্কা দুটি মাস। বর্ষা না গেলে, ক্ষেতের কাজ শেষ না হলে নামবার কথাও নয়। আহাম্মক ছাড়া এবাবে কেউ গাঁটগচ্চা দেয়?
বটতলায় রিক্সা থামিয়ে পাঁচু সিট থেকে নেমে গামছায় মুখের ঘাম মুছল। নিমাই প্লাস্টিকের বোতল থেকে ঢকঢ়ক করে জল খাচ্ছিল। নিম-গরম জলে তেষ্টা যেতে চায় না। যা গরমটা পড়েছে, জলের কি ঠাণ্ডা থাকার জো আছে? টিপকল থেকে যখন ভরেছিল তখন ভারি ঠাণ্ডা ছিল।
পাঁচু বলল, একটু জিরিয়ে নাও নিমাইদাদা। আমি একটু বিড়ি টেনে নিই। নইলে জুত হচ্ছে না।
নিমাইয়ের তাতে বিশেষ আপত্তি নেই। এই দুপুরে ঘুরে ঘুরে বিশ্ববিজয়ের পালার কথা বলে তেমন লাভও তো হচ্ছে না। শুনছে কি কেউ? শুনলেও গা করছে বলে মনে হয় না। রিক্সা আর মাইকের দিনভর ভাড়া, নিমাইয়ের মজুরি মিলে টাকা কিছু কম যাচ্ছে না। তবে কাকা লোকটাই অমনি। চাপল বাই তো কটক যাই। যত্র আয়, তত্র ব্যয়।
নিমাই নেমে বটতলার বাঁধানো তলায় বসতে গিয়ে আঁতকে উঠল। শান তেতে আছে। রোদ নেই, তবু যে কেন তাতে কে জানে বাবা!
পাঁচু আড়চোখে কাণ্ডটা দেখে বলল, রিক্সার সীটটা নামিয়ে ওটা পেতে বোসসা। আমি মকবুলের দোকান থেকে বিড়িটা ধরিয়ে আসছি।
সীটটা পেতেই বসল নিমাই। পাঁচু শিগগির আসবে না। অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে রিক্সা টেনেছে। হাঁপাচ্ছে। মালিকের আগেরটা দিয়ে কটা টাকাই বা থাকবে হাতে? মাস দুয়েক আগে টিবি থেকে সেরে উঠেছে। আবার হয়তো শিগগিরই রোগে পড়বে। গরিব মানুষদের বাঁচাও যা, মরাও তা।
নিমাই বিড়িটিড়ি খায় না। শরীরে সয় না তো বটেই, তাছাড়া ওসব তার কাছে বাবুগিরির সামিল। দিনে দশটা করে টাকা আসছে, এটাকে সে টুক টুক করে জমাচ্ছে। বাজারে একখানা দোকানঘর নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখনো বন্দোবস্ত হয়নি। এই ফাঁকে কাকাকে বলে এ কাজে তাকে বহাল করেছে বীণাপাণি। কাজটা খাটুনির নয়। তবে এই গরমে বড় কষ্ট।
কষ্টটাকে গায়ে না মেখে টাকাটা রাখছে নিমাই। শতখানেক হলেই পালপাড়ায় গিয়ে বাবার হাতে তুলে দেবে। আর তখন বুড়োবুড়ির মুখে যে হাসিখানা ফুটবে সেটাতেই জুড়িয়ে যাবে তার প্রাণ। ওই বোকাসোকা দুটো বুড়োবুড়ির জন্য নিমাই না পারে হেন কাজ নেই। কিন্তু কাজই জুটতে চায় না মোটে। দোকানটা হলে বাঁচোয়া। একখানা দোকান হলে সারা দিনমান খদ্দের সামলে সন্ধের পর একখানা কীর্তনের আসরে গিয়ে বসবে এর চেয়ে বেশি নিমাই আর কিছু চায় না। তার ইচ্ছে ছিল, কীর্তন করে তা থেকে যা জোটে তাই দিয়েই চালিয়ে নেবে। পয়সা না থাক, বুকভরা আনন্দ তো আছে। গলায় সুর ছিল তার। কিন্তু আজকাল গলার আওয়াজটা তার নিজের কানেই ভাল ঠেকছে না। বুকে দমেরও যেন ঘাটতি হচ্ছে।
টাকাপয়সার চিন্তা বড় দৃষিত চিন্তা। মনে ঠাই দিতে নেই। তবে ঘুরেফিরে কথাটা মনে হয়, সে বড় গরিব। বড় টানাটানির মধ্যে সে বড় হয়েছে। খিদের কষ্ট সইতে পারত না ছেলেবেলায়। কাঁদত। তার কান্না দেখে মাও কাঁদত। ফলপাকুড় পেড়ে খাবে তা সেরকম ফলন্ত গাছও ছিল না পালপাড়ায়।
তবে ভগবানের দয়াটা আছেই। খিদের কষ্ট পেতে পেতেই আস্তে আস্তে খিদেটা সয়ে যেতে লাগল। মানুষের দাঁতে ব্যথা হয়, মাথা ধরে, জ্বরজারি হয়, লোকে সয়ে থাকে না সেসব? খিদেটাও সেরকম আধিব্যাধি ঠাউরে নিল সে। ও যেন দাঁতের ব্যথা, পেটের ব্যামো। আজ আর খিদেকে ভয় নেই তার। খাওয়ার কষ্টটাও নেই। ইদানীং বেশ খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে তাদের। গেলবার তো বীণাপাণি একটু সরু চালই কিনে ফেলল। দোবেলা মাছ হচ্ছে। ডালের পাতে পটল বা ঢাড়শ ভাজা জুটে যাচ্ছে। গত দু মাসে না থােক তিনবার মাংস হয়েছে। এ সময়টায় এই অপয়া বর্ষায় বীণাপাণির হাতে বাড়তি টাকা থাকার কথাই নয়। তবে আসছে কোথেকে?
দুপুরের এই ঝিমধরা গরমে প্রশ্নটা নিয়ে খুব ভাবিত হল সে। গালে হাত দিয়ে বসে ভাবতে লাগল। কাকা ভাল লোক, কিন্তু গাড়ল তো নয় যে, এই যাত্রার আকালে বেশী করে টাকা দিচ্ছে বীণাকে!
তবে কি অন্য কেউ দিচ্ছে? দিলে তো বলতে হবে, দেওয়াটা ধৰ্মত ন্যায্যত দিচ্ছে না, ভিতরে মতলব আছে। ধর্মে টাকা নেই, অধর্মে আছে। অধর্মের টাকা বড় হুড় হুড় করে আসে, সামাল দেওয়া যায় না।
পাঁচু একটা বিড়ি শেষ করে আর একখানা ধরিয়ে এসে ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু কনুই চুলকুলো, একটা হাই তুললো, তারপর উদাস গলায় বলল, আরও ঘুরবে নাকি? তার চেয়ে একটু জিরোই চলো। তুমি এদিকটায় গদি মাথায় দিয়ে শোও, আমি ওদিকটায় একটু গড়িয়ে নিই। বেজায় গরম।
নিমাই রাজি হয়ে গেল। বলল, ঘন্টাখানেকের বেশী নয় কিন্তু। বটতলা খারাপ জায়গা, কেউ দেখে ফেলতে পারে।
কেউ দেখবে না। আর দেখলেই কি? মানুষের শরীর তো, নাকি?
নিমাই কথা বাড়াল না। শুয়ে পড়ল। ঘুমটাও আসত। তবে চিন্তাটা বড্ড কুটকুট করছে বলে ঘুমটা চোখের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল। বীণাকে টাকাটা দিচ্ছে কে? এই যে সকাল থেকে বিকেল অবধি মাইক ফুকে বেড়ানোর চাকরিটা বীণা তাকে জোগাড় করে দিয়েছে তার পিছনে মতলব নেই তো! এই ভরদুপুরে কি কেউ আসে-টাসে বীণার কাছে?
মন বড় পাপী। কথাটা মনে হতেই জিব কাটে নিমাই। ছিঃ ছিঃ, বীণা তার জন্য জান কিছু কম চুঁইয়েছে? সে চলে যাচ্ছিল, নিজেই সেধে যেচে রেখেছে। আজ অবধি এই পাপ-মুখে সে বলতে পারবে না যে, বীণার কিছু বেগোছ দেখেছে। তবে কথাটা মনে হচ্ছে কেন? একবার গিয়ে চুপি চুপি হাজির হবে নাকি বাড়িতে? গিয়ে যদি সত্যিই দেখতে পায় যে, বীণা পরপুরুষের সঙ্গ করছে, তাহলে? তাহলেই কি কিছু করতে পারবে নিমাই? দু ঘা কষাতে পারবে লোকটাকে? নাকি পারবে বীণাকেই ধমক চমক করতে? ওসব গণ্ডগোলে না পড়ে যাওয়াটাই তার পক্ষে মঙ্গল। গিয়ে কিছু বেগোছ দেখলে বিপদ তারই।
