বিষ্ণুপদর ঘড়ি নেই। কটা বাজে জানে না। কিন্তু সে ঠিক টের পায়, এইবার নয়নতারা একবার আসবে। এসে দেখে যাবে তাকে। কিছুক্ষণ পর পর এসে তাকে একবার করে দেখে যায় এই কদিন হল। বুড়িটার প্রাণে ভয় ঢুকেছে, বুড়োটা কখন টুকুস করে মরে যায়। এই কালঘড়ি দেখার পর থেকেই ভয়টা খুব ধরেছে বুড়িকে। মানুষের শশাকের একটা বড় কারণ হল, একা হয়ে যাওয়া। বিষ্ণুপদ চলে গেলে বুড়িটা খুব একা হয়ে যাবে। বড্ড আতান্তরে পড়ে যাবে।
ভয়-ডর আরও কত আছে। কাল রাতে যখন দু ভাই সুন্দ উপসুলের লড়াই করছিল তখন বুড়ি ভয়ে সেঁদিয়েছিল ঘরে। ঠাকুর দেবতার কাছে মাথা কুটছিল। কাল রাতে তারা বুড়োবুড়ি কেউ ঘুমোতে পারেনি। নয়নতারা বিস্তর কেঁলেছে। মেলা দুঃখের কথা বলেছে।
নয়নতারার বাবুগিরি হল তামাকপাতা দিয়ে পান খাওয়া। কলাইকরা একখানা বাটিতে তার পান সুপুরি চুন আর খয়ের থাকে ছোটো ছোটো কৌটোয়। সেই বাটিখানা হাতে করে নয়নতারা ঘর থেকে বেরিয়ে নিঃসাড়ে কাছে এসে উবু হয়ে বসল। বর্ষাকালে পান বেজায় সস্তা, তবু ভারি কৃপণের মতো এখানা পানের একটুখানি ছিঁড়ে নিয়ে তাতে চুন দেয়। সুপুরিগাছ বাড়িতেই আছে কয়েকটা। ভাগজোখ হয়েও যা পায় তাতে নয়নতারার বছর চলে যায়। কিন্তু কিছুটা বিক্রি করে দিতে হয় বলে নয়নতারা সুপুরি খায় এক চিমটি। দাঁতের জোর নেই বলে ছছাটো হামানদিস্তায় ফেলে ঔড়ড়া করে নেয়। তাতে খরচাও হয় কম। এক চিলতে কাঁচা তামাকপাতা ঠেসে মুখে পানটা পুরে দেয়। অনেকক্ষণ পানটা মুখেই থেকে যায়, রসস্থ হয়। সারা দিন ওই জিনিসই নয়নতারাকে চাঙ্গা রাখে।
পান সাজা থেকে মুখে দেওয়া অবধি লক্ষ করল বিষ্ণুপদ। দেখতে বেশ ভাল লাগল। কত যত্নে টুকটুক করে ভালবেসে পানটা সজল নয়নতারা! পানের মধ্যেই যেন ওর প্রাণভোমরা।
কিছু বলবে বলে মুখটা তুলল বুড়ি। বিষ্ণুপদ চেয়েই ছিল। একটু হাসল।
নয়নতারা হাসল না। বলল, শ্যামলী আজ ঘর থেকে বেরোলো না। দেখলে?
দেখলাম।
আবার লাগবে বোধ হয়।
তা লেগে যাবে।
রামজীবনের ওই পাকাবাড়িটাই অপয়া। ওটা যখন উঠতে শুরু করল তখন থেকে অশান্তি।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, শান্তি আবার কবে ছিল?
শ্যামলী বলে, বীণাপাণি নাকি নটী হয়ে গেছে। লাইনে নেমেছে। খারাপ খারাপ সব কথা। আমি বলি কি, পাঁচজনের কাছে না শুনে একবার নিজেই খবর নাও না। যাত্রায় নামা কি ভাল?
হঠাৎ বীণার কথা উঠছে কেন?
কাল রাতে তাকে নিয়ে একটা খারাপ স্বপন দেখেছি। কী সব যেন দেখলুম, ভাল মনে নেই। কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ভাল খবর কি আর পাবে? অজান থাকাই তো ভাল।
তুমি এমন করে বলো যে, ভয় খেয়ে যাই।
আর ভয় কিসের! ডাক এসে গেছে। মনটা তুলে নাও।
তুমি ওরকম বোলো না তো!
তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলিনি। আমার কি মনে হয় জানো, ওরা সব আমাদের চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিবিবেচনাওলা মানুষ। আমরা কি দুনিয়াটাকে বুঝি? যা সব ঘটে যাচ্ছে চারদিকে তা বুঝি? এই হাবলা-ভ্যাবলা মাথায় কি সব সেখোয়? আমাদের চেয়ে ওরা বোঝে অনেক ভাল। তা ওরাই দুনিয়াটাকে বুঝে-সুঝে নিক না। আমাদের আমল তো এটা নয়।
সে কথা ঠিক। তবে ভয় হয়, যদি নষ্ট পায়।
সেটাও ওরাই বুঝবে। নষ্ট কি ভাবে পায় তা কি তুমি জানো, নাকি আমিই জানি।
কিন্তু ও কথাও বলি, বীণার বিয়েটা তুমি ভাল দাওনি। নিমাই কি আর তেমন ছেলে? খাওয়াতে পরাতেই তো পারে না। পেটে টান না পড়লে বীণা কি আর যাত্রায় নামত?
ওই কথাই তো বলি, আমি বড় আহাম্মক। তাই আজকাল ভয়ে আর রা কড়ি না। মুখ খুললেই কত কি ভুলভাল বলে ফেলব। বীণার বিয়েটাও তো ওই আহাম্মকিই হল কি না। ছেলেটা দেখলুম বড় সৎ। মা-বাপের ওপর অগাধ ভক্তি। ওই দেখেই বুকটা নেচে উঠল, এ আমলে তো এ জিনিস মেলে না। কিন্তু এখন বুঝি, কত বড় বোকার মতোই কাজটা হল। মেয়ে হয়তো আমাকে কত শাপশাপান্ত করে।
আজ আমার বীণার জন্য বড় মনটা খারাপ লাগছে। স্বপন দেখা ইস্তক বুকটা ভার।
তাহলে একবার রামজীবনকে বলো। যে তো এধার ওধার ঘোরাফেরা করে। সে গিয়ে খবর এনে দেবেন।
সে কি আর এখন যেতে চাইবে? ঘর উঠছে, সে এখন ঘরের নেশায় বুদ। হা-টাকা জো-টাকা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে নড়ানো যাবে না।
তাও বটে।
আমি বলি কি, আমরা বুড়োবুড়ি তো অনেককাল ভিটে আকড়ে পড়ে আছি, কোথাও যাই-টাই না। তা একবার যাবে নাকি বনগাঁ? বুড়োবুড়ি মিলে যাই চলো। বেশী দূর তো নয়।
বিষ্ণুপদ হাসল, সে আর বেশী কথা কি! কিন্তু তোমাদেরই তো কিসে যেন বাধে। ছেলেপুলে না হলে নাকি মেয়ের বাড়ি যেতে নেই!
ও বাবা! তাই তো! মনে ছিল না কথাটা। তা হলে একখানা পোস্টকার্ড লিখে দাও, পটল আজই ডাকে দিয়ে আসবে। রিপ্লাই কার্ডে দিও। পটলকে পাঠাচ্ছি পোস্টকার্ড আনতে।
পাঠাতে হবে না। আমার কাছে একখানা জোড়া পোস্টকার্ড আছে। লিখে দিচ্ছি।
তাকে আসতে লিখো একবারটি। বড় দেখতে ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে।
লিখবখন। তবে এই অশান্তির মধ্যে এসে তার তো তেমন সুখ হবে না।
তবু আসুক। নিমাইকে নিয়েই যেন আসে।
সব দিক বুঝে-সুঝে বলছে তো!
বুঝবার আবার কি আছে! সেই কবে একবার এসেছিল, বছর চারেক হবে বোধ হয়। মুখখানাই তো ভুলতে বসেছি। আর বুঝঝ দরকার নেই, মনটা বড় খারাপ। একবার আসুক। তোমার তাকে দেখতে ইচ্ছে হয় না?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না। আমি বড় একা হয়ে গেছি। কেবল মনে হয় আমার আর কেউ নেই।
