বলে কি গো! সর্বনেশে কথা যে!
থেকেও কি আছে! তুমিই বলো। ওরা কি আর আমার তোমার? ওরা সব নিজের নিজের। কাউকে আপনার জন ভাবতে পারি না। কৃষ্ণজীবনের কথা ভাবো তো একবার!
তার কথা আবার কি ভাবব?
ভাবো। ভাবলেই বুঝবে।
তুমিই বুঝিয়ে দাও না! জানো তো আমার মাথা নেই।
কৃষ্ণজীবন তো আমাদেরই ছেলে, নাকি?
তবে কার ছেলে?
তাকে কি আমাদের ছেলে বলে মনে হয়? সে যদি রামজীবন বা বামাচরণের মতো হত তাহলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হত। তা তো হল না। কত বিদ্যে শিখে সে এক লাফে কোথায় উঠে গেল। বিলেত-আমেরিকা অবধি ঘুরে আসছে। দুনিয়া-জোড়া নাম। এটা কেমন হল বলো তো! আমাদের ছেলের কি এ রকম হওয়ার কথা? আমরা দুটো বোকাসোকা মেয়েপুরুষ, আমাদের ছেলেপুলেরা তো আমাদের মতোই হবে নাকি! তা তো হল না কৃষ্ণজীবন!
লোকের পাঁচটা ছেলে কি একরকম হয়?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না। কিন্তু কেন হয় না তাই তো বুঝি না। রামজীবন, বামাচরণ এরাও কি আর আমাদের ছেলে? তুমি তো জানো, জীবনে আমার সঙ্গে কারও ঝগড়াঝাটি হয়নি, মুখে একটাও দূষিত কথা উচ্চারণ করিনি, কাউকে গালাগালি অপমান করিনি। রামজীবন বা বামাচরণ তাহলে ওরকম করে কি করে?
সে কপালের দোষে।
তাই হবে। আমি ভেবে দেখেছি, ছেলেপুলে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই। আমরা তো আর তৈরি করিনি ওদের, আমাদের ভিতর দিয়ে জন্মেছে। যার যার নিজের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আর ওদের নিয়ে ভেবে কি লাভ?
ভাবনা কি ছাড়ে।
আমাকে তো ছেড়েছে। যখনই কৃষ্ণজীবনের কথা ভাবি তখনই বড় অবাক লাগে। আমার প্রাইমারি ইস্কুলে পড়ানোর বিদ্যে, বিষয়বুদ্ধি নেই, তেমন বড় কোনও বাবু-মানুষ এসে দাঁড়ালে কথা কইতে ভয় খাই। সেই আমার ছেলে ওরকম বাঘা বিদ্বান হয়ে ওঠে কি করে? এ যে অশৈলী কাণ্ড! আর সে অমনধারা হয়ে উঠল বলেই তো এদের সঙ্গে বনল না। একরকম মেরেরে তাড়াল তাকে।
পুরনো কথা তুলে কি লাভ? তুমি কি বসে বসে ও সব ভাবো?
দুটো জিনিস খুব ঘোরাফেরা করে মনের মধ্যে। একটা হল কৃষ্ণজীবনের কথা। ইদানীং খুব তার কথা মনে হয় আর বড় অবাক লাগে। আর দু নম্বর হল রামজীবনের ওই বাড়িটা। কেন যে মনে হয়, ওই বাড়িটা যেই শেষ হবে অমনি আমার ঘড়ির সময় ফুরোবে।
সর্বনেশে কথা! তাহলে ওই অলক্ষুণে বাড়ি এখনই বন্ধ করে দিতে বলি।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, বোলো না। ও সব আবোল তাবোল ভাবনা, ওর মধ্যে কোনও সার নেই। মন হচ্ছে এক নিষ্কৰ্মা মানুষ, সারাদিন অকাজ করে যাচ্ছে। দুনিয়াতে যারা বড় মানুষ তাদের মন হল বিশ্বকৰ্মা। কত কী ভাবছে আর করে ফেলছে। সেই জন্যই তো দুনিয়ায় কত অশৈলী কাণ্ড ঘটছে। আকাশে এরোপ্লেন উঠছে, চাঁদে মানুষ যাচ্ছে, লোকে টিভি দেখছে ঘরে বসে। ও সব তো আমার মতে বোকাসোকা মানুষের কর্ম নয়। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বেঁচে আছি মাত্র। নাড়ী চলছে, বুক ধুকধুক করছে, খাচ্ছি হাগছি, এইমাত্র। বিষ্ণুপদ থাকলেই কি, গেলেই কি। দুনিয়ার লাভও নেই, লোকসানও নেই।
নয়নতারা পানের একটুখানি পিক ফেলে হেঁচকি তুলে বলল, আর আমার কথা বুঝি ভাবতে নেই?
সেই তো কথা। তুমিই একমাত্র মানুষ যার কাছে বিষ্ণুপদ একটা তালেবর লোক। তোমার জন্যই তো দড়ি ছিড়তে চাইছে না আমার।
এ কথায় নয়নতারা হয়তো কেঁদে ফেলত, কিন্তু এ সময়ে বৃষ্টি মাথায় করে উঠোনে চারটে সাইকেল এসে ঢুকল পর পর।
ঘটনা পুরনো, বহুবার ঘটেছে। তবু নয়নতারা ওই আবার এসেছে বলে একটা চাপা আর্তনাদ করে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল, বলল, তুমি কথা কইতে যেও না ওদের সঙ্গে। রাঙাকে ডেকে দিচ্ছি।
চারটে জোয়ান মর্দ ছেলে এসে দাওয়ার সামনে পা ঠেকিয়ে সাইকেল থামাল, নামল না।
কালো চেহারার একটা ছেলে বিষ্ণুপদর দিকে চেয়ে থমথমে গলায় বলল, রামজীবন কোথায়?
নয়নতারা কথা কইতে বারণ করে গেছে। কিন্তু রাঙাকে এখন পাবে না নয়নতারা। রাঙা একটু আগে পুকুরে গেছে। এক ডাই বাসি কাপড় নিয়ে। বিষ্ণুপদ ছেলেটাকে দেখল ভাল করে। শক্ত পোক্ত শরীর, বয়সে রামজীবনের চেয়ে ছোটো, চোখের নজর মোটেই সাদা-সরল নয়। চোখে একটু ধমক আছে।
বিষ্ণুপদ নিরীহ গলায় বলে, সে তো সকালে বেরিয়ে গেছে।
সোডার বোতল খোলার আওয়াজের মতো পরের প্রশ্ন এল, কোথায় গেছে?
সে তো বলে যায়নি।
পিছনে তিনটে ছেলে পাথরের মূর্তির মতো সাইকেলে বসা। বৃষ্টিকে গ্রাহ্য নেই।
সামনের ছেলেটা বিষ্ণুপদর দিকে পলক না ফেলে চেয়ে থেকে বলে, কাল তার বটতলায় যাওয়ার কথা ছিল। যায়নি।
বিষ্ণুপদর একটুও ভয় হল না। ছেলেটার চোখের দিকে সেও নিম্পলক চেয়ে থেকে বলল, কাল তার যাওয়ার উপায় ছিল না।
কী হয়েছিল?
একটু ঝামেলায় ছিল।
বটতলা দিয়ে আজকাল সে যাতায়াত করছে না। তাকে বলবেন আজ সন্ধের পর যদি না যায় তা হলে কিন্তু মুশকিল আছে।
বিষ্ণুপদ নিরীহ গলায় বলে, মুশকিল! কেন, সে কি কোনও খারাপ কাজ করেছে।
তাকে বলবেন, আমরা সন্ধের পর বটতলায় থাকব। কথা আছে।
বিষ্ণুপদ মাথাটা ডাইনে বায়ে নাড়ল। সে কিছু বুঝতে পারছ না। বৃষ্টি হঠাৎ চেপে নামল। চারজন সাইকেবাজ আবছা হয়ে গেল বৃষ্টিতে। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ওরা চলে যাচ্ছে। যেন একটা পরোয়ারা ধরিয়ে দেওয়ার ছিল, কাজ শেষ করে ফিরে গেল।
উঠোনটা কঁকা হয়ে গেল, বটে, কিন্তু মনটা কি হল, চারজন সাইকেলবাজ এখন অনেক সময় ধরে মনের মধ্যে ঘঘারাফেরা করবে। কিছুতেই যাবে না।
