বামাচরণ ফিরল সন্ধের কিছু পর। ফিরতেই শ্যামলী এমন চেঁচিয়ে উঠল যেন তার নিকটজন কারও কাল হয়েছে। বামাচরণ এক সরকারী অফিসে পিওনের কাজ করে। সে খুব ফিকিরের লোক, দালালি-টালালি কিসের যেন একটু বাড়তি দুপয়সা আয় আছে। তবে সে সব সে কখনও ফাস করে না। এক বাড়িতে থেকেও, এক হাঁড়ি হয়েও তারা খুব আলগোছ হয়ে থাকে। তবে হাঁড়ি আর এক রাখা যাবে না, বিষ্ণুপদ বুঝতে পারছিল। এক থাকলেই কি আর আলাদা হলেই বা কি? বিষ্ণুপদর আর যে সব ভেবে কাজ নেই।
ঝগড়াটা জস্পেশ করে লাগল সন্ধের পর। রামজীবন একটু মাতাল হয়েই রোজ ফেরে। আজও ফিরল। সে গ্রিতেই বামাচরণ লাফ দিয়ে উঠোনে নামল। তারপর দুজনে গঙ্গাজলের মতো গালাগাল দিতে লাগল দুজনকে। তারপর খুনখুনির জোগাড়।
বিষ্ণুপদ মাতব্বরদের কথার খেই ধরে বুঝতে পারছিল, তারা বামাচরণের পক্ষে। কাজটা অন্যায় হয়েছে।
রাজু হালদার বলল, আপনার চোখের সামনেই অন্যায্য ব্যাপারটা হয়ে গেল, এটা কেমন কথা? বামাচরণ কি আপনার ছেলে নয়? আমাদের একটা খবর দিলেই আমরা এসে মীমাংসা করতাম।
রামজীবনকে তার ঘরের কাছে কয়েকজন ঘিরে রেখেছিল। সেখান থেকেই সে গলা তুলে বলল, কোনও হারামীর বাচ্চার সালিশ মানব না। শালারা মাতব্বরী দেখাতে এসেছে! আবে এই খানকীর ছেলে রাজু, আমার বাবাকে চোখ রাঙাচ্ছিস কেন রে? বাপের ব্যাটা হয়ে থাকলে আমাকে চোখ রাঙাবি আয়! চোখ গেলে দেবো।
বিষ্ণুপদ টের পেল, মাতব্বরদেরও আর সেই দিন নেই। রামজীবন হুমকিতে রাজু থিতিয়ে গেল।
ঘর তুলেছি বেশ করেছি। বুকের পাটা থাকলে একটা ইটও খসিয়ে দেখ, দেখ খসিয়ে কী হয়।
রাজুর বয়স পঞ্চাশের ওপর। এক সময় গায়ের রাজনীতিতে বেশ নামডাক ছিল। এখন আর সেসব নেই। লোকেও তেমন মানে না। আগে এই রাজুরই কত হাঁকডাক ছিল। বিষ্ণুপদ একটু কষ্টই হল রাজুর জন্য।
রাজু বিষ্ণুপদকে বলল, শুনলেন রামজীবনের কথা? ওর যদি এরপর একটা বিপদ হয় তখন কিন্তু আমাদের দুষবেন না। রামজীবন কিন্তু খারাপ সংসর্গে পড়েছে।
বেশ চাপা গলায় বলল, যাতে রামজীবন শুনতে না পায়। রামজীবন অবশ্য শুনতে পেল না, কারণ সে নিজেই চেঁচিয়ে মাতব্বরদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করছিল।
বামাচরণ তার দাওয়া থেকে নেমে এসে বিষ্ণুপদকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে রাজুকে বলল, এই শালা বুড়োর জন্যই যত গণ্ডগোল বুঝলেন রাজু দাদা? কবে থেকে বলে আসছি, বাবা, বাড়িটা বাগজোখ করে বেড়া তুলে দাও। শালা বসে বসে। ঝিমোয় আর কঁড়ি কড়ি খায়। গা করে না। কেন করে না জানেন? ওই হারামজাদা রেমো ওকে হাত করেছে। রামজীবন ছাড়া উনি চোখে অন্ধকার দেখেন।
বামাচরণ বাপকে শালা বলাতেও কেউ তেমন কোনও আপত্তি করল না। শুধু কে যেন—লুণ্ঠনের আলোয় মুখটা ভাল দেখা গেল না—বিড়বিড় করে বলল, ওভাবে বলছে কেন? ওভাবে বলা কি ঠিক?
বিষ্ণুপদর অবশ্য রাগ-টাগ হল না। কোনওদিনই হয় না। বামাচরণ হয়তো ঠিকই বলে।
বামা চেঁচাচ্ছিল, কেন এই খচ্চর বুড়ো রামজীবনের পক্ষ নেয় জানো? রামজীবন পাকা ঘর তুললে সেখানে আরামসে। থাকবে সেই লোভে। রামজীবন লুচি খাওয়ায়, রসগোল্লা খাওয়ায়, মাঝে মাঝে জামা জুতো দেয়; আর সেই সঙ্গে যত কু পরামর্শ দেয়।
ওপাশ থেকে রামজীবনও কী যেন বলে উঠল।
বিষ্ণুপদর হল গণ্ডারের চামড়া। সে শুধু অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে ওপাশে রামজীবনের ঘরখানার দিকে চেয়ে রইল। বড় তাড়াতাড়ি কাজ হচ্ছে এখন। একটু বেশী তাড়াতাড়ি কি?
আর এক মাতব্বর কপিল ঘোষ বলল, আচ্ছা খুড়ো, আপনার বড় ছেলে কৃষ্ণজীবনের তো আর এই গাঁয়ের বাড়ির ভাগ দরকার নেই। তা তার ভাগেরটা এদিকে বাঁটোয়ারা করে দিলেও তো হয়।
সতীশ পাল মাথা নেড়ে বলে, আইন জানোনা বলে বলছো। সে বা তার পুত্ৰ পৌত্ৰাদি কেউ দাবি তুললে তো ছাড়তেই হবে বাপু। তার ওপর মেয়েদের ভাগের কথাটা ধরছে না কেন? জমি পুরো কুড়ি কাঠাও নয়। ছভাগ করতেই হবে।
ভাগজোখের কথায় বিষ্ণুপদ ফের ভাবনায় পড়ে গেল। ভাগের বড় জ্বালা। ভাগ করতে করতে একশ বছর পর থাকবেই বা কি?
সতীশ পাল বলে উঠল, রামজীবনের রান্নাঘর সরাতে হবে। না সরাতে পারলে জমির দাম ধরে দিক। বখেরা মিটে যাবে।
রামজীবন ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে বলে, যে গু-খেগোর ব্যাটা এ কথা বলে তার মুখে পেচ্ছাপ করি, পেচ্ছাপ। বুঝলে! জমি এখনও বাবার। কোন শালাকে মূল্য ধরে দেবো?
খুব হতে লাগল তুমুল সব কাণ্ড। বিষ্ণুপদ শুনল, শব্দের পর শব্দ, আরও শব্দ। এ সব শব্দের যেন ঠিক মনে হচ্ছে না। এ সব যেন ফাঁকা কার্তুজের আওয়াজ।
একটু রাত হচ্ছিল। আরও গড়াত। হঠাৎ একটা ভেজা হাওয়া ছাড়ল। জয়ঢাকের শব্দ তুলল মেঘ। আর তারপর তেরচা ঘাটের বল্লমের মতো বৃষ্টি নেমে এল। দুনিয়াকে গেঁথে ফেলতে লাগল যেন। লোকজন সব বেমালুম গায়েব হয়ে গেল ভেজাবাজির মতো। দাওয়ার দু-তিনজন শুধু গা বাঁচিয়ে বসে থেকে কিছুক্ষণ পর ভিজেই রওনা হয়ে গেল।
তারপরই নয়নতারা এসে হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল বিষ্ণুপদকে।
আজও রোদ নেই। মাঝে মাঝে ছাড় হ্যাড় করে বৃষ্টি হচ্ছে। থামছে। আবার হচ্ছে। রামজীবনের কাঁচা সিমেন্ট ধুয়ে যাচ্ছে। ইরফান আসেনি।
আজ সকাল থেকে বাড়িটা বড় নিঝুম। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঘুলিয়ে উঠছে, পাকিয়ে উঠছে কত আক্রোশ, রাগ; তবে বাইরেটা আজ ভারি নিঝুম। যে কোন সময়ে হঠাৎ বোমা ফাটানোর মতো ধুন্ধুমার লেগে যেতে পারে। দুছেলের কেউ বাড়ি নেই। শ্যামলী সকাল থেকে ঘরের বার হয়নি। সবই দেখছে বিষ্ণুপদ। দেখে যাওয়া ছাড়া তার কী কাজ।
