রিয়া উঠে এসে কৃষ্ণজীবনের মাথাটা বুকে চেপে ধরল, এরকম করছ কেন? কেন এরকম সব অদ্ভুত কথা বলছ? আমি যে ভয় পাচ্ছি। কেন দূরে সরে যাচ্ছ?
রিয়ালিটিকে বুঝতে পারো রিয়া?
তোমার মতো করে কি পারি? আমি আমার মতো করে দেখি, বুঝি।
বুঝতে গেলে ইউ হ্যাভ টু লাভ, ইউ হ্যাভ টু লাভ। তুমি কি জানো মানুষ কত দেউলিয়া হয়ে গেছে ভালবাসায়? কত দেউলিয়া? ভাত কাপড়ে নয়, বস্তুপুঞ্জে নয়, মেধায় নয়, দেউলিয়া শুধু ভালবাসায়।
কেন ও কথা বলছ? এই যে আমি তোমাকে এত ভালবাসি এ কি মিথ্যে? তুমি ছাড়া আমাদের যে জগৎ অন্ধকার।
কৃষ্ণজীবন নিঃকুম হয়ে চোখ বুজে রইল। তার চোখের কোল বেয়ে ঝরে পড়তে লাগল চোখের জল।
হোয়েন আই মিট মাইসেল-এ সে লিখল,বস্তুর পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম মাত্ৰাতেই থেমে থাকে না তার প্রকৃত পরিচয়। আমাদের অজ্ঞাত আরও বহু মাত্রাও হয়ত রয়ে গেছে। আমরা কতটুকু জানি? অবিরত নানা মতবাদ, নানা দৰ্শন মানুষকে আবিল করে দেয়। মানুষের মন সব সময়েই জারিত হচ্ছে অন্যের ভাবনাচিন্তার প্রভাবে। সে যা দেখে, যা বোধ করে, যা বোঝে সবই ওই সব মতবাদ ও প্রভাবের দ্বারা চালিত হয়ে। যদি মানুষের মন রিক্ত থাকত, যদি হাঁসের পালকের। মতো ঝেড়ে ফেলতে পারত সব প্রভাব তবে কি সে বস্তুর স্বরূপকে ধরতে পারত। আমি তাই প্রথম মানবের কথা ভাবি। একমাত্র সে-ই অনাবিল চোখ ও মন নিয়ে দেখেছিল এই বস্তুবিশ্বকে। আমি আজ ঠিক তার মতো মন আর চোখ চাই।
শীতের কবোষ্ণ সোনালি রোদে ভরে আছে মাঠঘাট। মাঝে মাঝে কৃষ্ণজীবন বেরিয়ে পড়ে হারা-উদ্দেশ্যে। পায়ে হেঁটে হেঁটে দূরদূরান্তে চলে যায় অচেনা গাঁয়েগঞ্জে। কখনও অচেনা চাষীবাড়িতে ঢুকে যায়। বসে, গল্প করে। কখনও গাছের মাথায় বসে-থাকা একটি পাখির দিকে চেয়ে থাকে। কখনও হাঁ করে চেয়ে দেখে, বাঁশগাছের ডগা দুলছে উত্তরে হাওয়ায়। এ পৃথিবী তার বড় প্রিয়। বড় প্রিয় এই মনুষ্যজীবন। মুখ নয়, তার মন নানা কথা বলে যেতে থাকে। বলে, ভালবাসা ছাড়া আর কী আছে মানুষের? মানুষ কেন ভুল মুক্তির খোজে নষ্ট করে ফেলছে এই মহাৰ্ঘ জীবন?
শীতের দুপুরে আমি বকুলপুর নামে একটা গাঁয়ে এক ততঘরে বসে দেখছিলাম, অনাত্মীয় সুতো কেমন টানাপড়েনে পড়ে পরস্পরের সঙ্গে রচনা করছে সম্পর্ক। ফুটে উঠছে নকশা। তৈরি হচ্ছে ঘনবন্ধ কাপড়। এই তো, কী সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা! টানা-পপাড়েন, টানা-পপাড়েন। দৃশ্যটা আমার এত ভাল লাগল যে কী বলব! মনটা ভরে গেল।
ভালবাসা এক অনুশীলনসাপেক্ষ ব্যাপার। ভাবের ভালবাসা বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। আমার জল-বসন্ত হয়েছিল বলে আমার এক প্রিয় বন্ধু আমার বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর আমার মা জেগে বসে থাকত আমার শিয়রে। দিনরাত সেবা করত। যাকে ভালবাসো তার জন্য কিছু করো। তাকে কিছু দাও। রোজ দাও। প্রতিদান চেও না।
ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব স্কুলের হস্টেলে একদিন গোপালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল কৃষ্ণজীবন। তাকে দেখে কী আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল গোপালের মুখ। ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। কৃষ্ণজীবন তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। গোপালের বুকটা ধকধক করছে আনন্দে।
কেমন আছিস রে গোপাল?
গোপাল তার মুখের দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে রইল। মুখে হাসি, কেবল হাসি। অনেকক্ষণ ছিল কৃষ্ণজীবন। গোপালের জন্য চকোলেট, বিস্কুট, টি-শার্ট এনেছিল। দিল। যতক্ষণ ছিল কৃষ্ণজীবন, গোপাল তার মুখ থেকে চোখ সরাইল না।
ছেড়ে আসতে বড় কষ্ট হচ্ছিল কৃষ্ণজীবনের। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ভাল থাকিস। আমি আবার আসব।
ছুটিতে বিষ্টুপুর গিয়ে গোপাল তার দাদুকে খুঁজেছিল এ-ঘর ও-ঘর। নানা শব্দে, ইশারায় জানতে চেয়েছিল দাদু কোথায়। মৃত্যু কী জিনিস তা সে আজও জানে না। তাকে বোঝানো যায়নি। যতদিন ছিল ততদিন দাদুকে খুঁজে বেড়াত সে। এ-ঘর ও-ঘর সে-ঘর।
দৃশ্যটা হোয়েন আই মিট মাইসেলফ্-এ বর্ণনা করল কৃষ্ণজীবন। লিখল, আমিও আজ এই মূকবধির বালকটির মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি এ-ঘর ওঘর সে-ঘর। খুঁজতেই হবে। খোঁজাই যে আমার কাজ। খোঁজাই যে জীবন। …
মাঝরাতে রিয়া ফের উঠে এল।
ঘুমোওনি?
কৃষ্ণজীবন তার বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থেকে বলল, না।
রিয়া কাছে এল। নরম করে চেপে ধরল নিজের বুকে কৃষ্ণজীবনের মাথা।
শুয়ে পড়ো না গো! একটু বিশ্রাম নাও।
ঘুম আসবে না।
এসো আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।
কৃষ্ণজীবন রিয়ার মুখের দিকে শিশুর মতো চেয়ে থেকে বলল, আজ কাঁদব। আজ ঘুমোবো না।
ও মা! ও কী কথা? কাঁদবে কেন? ওরকম বোলোনা, ভয় পাই।
কৃষ্ণজীবনের মুখ নয়, মন কথা বলছিল। বলছিল, এসো আমার সঙ্গে তুমিও কাঁদো, এসো কান্নায় একাকার হয়ে যাই। একাকার হয়ে যাই।
২৬. মেঘ দেখলে আনন্দ হয়
মেঘ দেখলে আজও তার একইরকম আনন্দ হয়, ছেলেবেলায় যেমন হত। বৃষ্টি তাকে এখনও সম্মোহিত করে। এ বছর তার সাধ মেটাতে বৃষ্টিও হচ্ছে বটে। একদিন দুদিন শুকনো যায় তো চারদিন ধরে নেমে থাকে।
আজ এক বৃষ্টি-ঝমাঝম দিন। মেঘলা আকাশ চারদিকে আঁধার ছড়িয়ে দিচ্ছে আজ সকালে। ছেদহীন বৃষ্টি নেমে আছে। শেযরাত থেকে। ঝাঁঝালো বৃষ্টির ভিতর দিয়ে চলেছে রেলগাড়ি। দরজা খোলা, জানালার পাল্লা নেই। হুহু করে বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে কামরার ভিতরটা। কোনওরকম একটা খাঁজের আড়ালে বেঞ্চে বসে আছে সে। বেঞ্চের কাঠ চুরি হয়ে যাওয়ায় বসাটাও ভীষণ কষ্টকর হচ্ছে। বেঞ্চের লোহার কাঠামোর ওপর কোনওক্রমে শরীরের ভারখানি রাখা। জলকণায় সে ভিজছেও। কিন্তু কোনও বিরক্তি বা রাগ নেই তার। বৃষ্টি-মুগ্ধ দুখানি চোখ পেতে সে দেখছে মাঠঘাট, দরিদ্র শহরতলি, দোকানপাট, ছোট্ট স্টেশন। কয়েকটা ভেজা চড়াই বসে আছে ওপরের মাল রাখার ব্যাকে। বিনা টিকিটে রেলগাড়ি চেপে তারা কোথায় যাচ্ছে তা তারাও জানে না। পাখির তো দেশ নেই। তবে বাসা আছে, বাসায় আছে ডিম, আছে ওম, ওরা সেই টানে ঠিক ফিরে যাবে যথাস্থানে।
