এবার কি বন্যা হবে? যা বৃষ্টি হতেও পারে। খবরের কাগজে আসাম আর বিহারের বন্যার খবর দিচ্ছে। বছরওয়ারি ঘটনা। এ দেশে নদীর কোনও সংস্কার নেই। সে সারা দেশ ঘুরে দেখে, অধিকাংশ নদীই শুধার মরসুমে খাঁ আঁ করে শুকনো বালিয়াড়ি বুকে নিয়ে। কোথাও তিরতির করে একপাশ দিয়ে নর্দমার মতো একটি ধারা প্রবহমান থাকে, কোথাও তাও থাকে না। তখন চাষ মার খায়, নদীর নাব্যতা বলে কিছু থাকে না। অগভীর খাতে যখন বর্ষার ঢল নামে তখন দুকূল ছাপিয়ে গ্রামের পর গ্রাম আর শহর ভেসে যায়। কেন প্রতি বছরই হবে খরা বা বন্যা? নদী সংস্কার করা হলে, জায়গামতো পাহাড়ে বাঁধ দিয়ে জল সঞ্চয় করলে, নিয়মিত ড্রেজিং করা হলে, নিকাশী খাল কাটা হলে কত অনায়াসে কাজে লাগানো যেত জলের মতো মহাৰ্ঘ সম্পদ। এখনও এ দেশের কত ঊষর ভূমি তেষ্টা নিয়ে চেয়ে আছে বুদ্ধিমান মানুষের দিকে। অথচ ধী-সম্পন্ন মানুষ কেন কিছুই করছে না? তার ধী খেয়ে নিল কে? পলিটিকস? না কি স্বার্থ? না কি আলস্য ও দূরদর্শিতার আদ্যন্ত অভাব? অস্ট্রেলিয়ায় নদীর সংখ্যা কত কম, সেখানে চাষীদের জল পয়সা দিয়ে কিনতে হয়, তবু কখনও জলের অভাবে চাষ মার খায় না। এক ফোঁটা জলের কোনও অপচয় করে না ওরা। ভারতবাসী যেন জানেই না নদীকে কিরকমভাবে ব্যবহার করতে হয়। এরা যেন বুড়ো বয়সেও হামা-টানা শিশুর মতো অবোধ। এবং নির্বোধ। গোটা ভারতবর্ষকে জলপথে নানাভাবে জাল বদ্ধ করার একটি প্ল্যান সে কর্তাব্যক্তিদের কাছে পেশ করেছিল। সেই প্ল্যান কার্যকর হলে, শুধু কৃষি নয়, পরিবহন ব্যবস্থাতেও একটা প্রভূত ওলটপালট ঘটতে পারত। এদেশে গরুর গাড়ি, জেট প্লেন, ভাঙা শ্লেট, কম্পিউটার, বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের এক অসাধারণ সহাবস্থান। জলপথ থাকলে দিশি নৌকো ডিজেল ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাল পরিবহন করতে পারত। কর্তাব্যক্তিরা সবিনয়ে বলেছেন, প্ল্যান তো ভাল, কিন্তু আমাদের অত টাকা কোথায়? সে নিজের ভিতরে ভিতরে অসহায় রাগে মাথা কুটে মরে। এ সব নির্বোধরা কি জানে না, বৃক্ষপতনের ফলে ন্যাড়া প্রকৃতি একদিন আর বাদলমেঘ আকর্ষণ করতে পারবে না? খরার পর খরা আর অজন্মায় শুকোবে মাটি? বাড়বে সামুদ্রিক নোনা জলের স্তর এবং তা গ্রাস করবে নিচু সব ভূখণ্ড? আগামী শতাব্দীর মাঝামাঝি মানুষের অস্তিত্বে যে নাভিশ্বাস উঠবে সে তার শব্দটা অবধি আগাম শুনতে পায়। এরা কেন পায় না। খুব কি সময় আছে আর.? মানুষের সর্বনাশের আগাম লক্ষণগুলি কি ধরা পড়ছে না এদের বোধবুদ্ধিতে।
একটা গল্পে সে পড়েছিল, পিঁপড়েদের চলন দেখে একটি গায়ের লোক অনুমান করেছিল, বন্যা আসছে। বন্যা সত্যিই এসেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে গায়ের লোকেরা হাওয়ার চলন দেখে সঠিক নির্ধারণ করতে পারে, প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড় আসছে। চীনের প্রাকৃত মানুষেরা বন্য প্রাণীর হাবভাব দেখে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নির্ধারণ করতে পারে। অশিক্ষিত, প্রকৃতি-লালিত মানুষেরা অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির কথা জানে না বটে, কিন্তু তাদের জন্যও আছে এইসব প্রাকৃত বিজ্ঞান। মাঝে মাঝে যা যন্ত্রপাতিকেও হার মানায়। তার ইচ্ছে ছিল, সারা পৃথিবী ঘুরে আদিবাসী, উপজাতি, যাযাবরদের কাছ থেকে এই অতি সূক্ষ্ম অনুভূতি ও ড্ডাকশনের কৌশল শিখে নিয়ে তাকে আরও পরিশীলিত করে কাজে লাগাতে। পৃথিবীর জন্য কত কিছু করার ছিল তার, কত কী করতে সে আজও চায়! কিন্তু আজকাল তার কেবলই মনে হয় নানা আইন-কানুন, অবহেলা, ঔদাসীন্য, স্বার্থ আর রাজনীতি যেন তাকে হাত-পা বেঁধে একটা বাক্সে বন্দী করে ফেলেছে। তাকে কিছুই করতে দিচ্ছে না কেউ।
গাড়িতে লোকজন নেই বললেই চলে। একে ছুটির দিন, তাতে বৃষ্টি, কোনও স্টেশনে একটা দুটো লোক উঠছে, নেমে যাচ্ছে। ঠায় একা সে-ই বসে আছে ট্রেনে। তার যেন কোথাও যাওয়ার নেই, কোনও স্টেশনেই নামবার নেই। আজ বৃষ্টিভেজা দিনে ভাঙাচোরা ট্রেনের কামরায় সে একেবারে সম্পর্কহীন একা। বড় আনমনা। বাইরের আবছা দিগন্তের দিকে চেয়ে সে পৃথিবীর সঙ্গে তার ও মানুষের সম্পর্কের বুনটটা আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। পারছে না। তার কেবলই মনে হয়, এতকাল পৃথিবীতে বাস করেও, পৃথিবীর সব ধনসম্পদ লুটপাট তছনছ করেও মানুষ-বোকা মানুষ ধরতেই পারেনি, এই পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা কী। পৃথিবীর ভূখণ্ডকে সে স্বার্থপরের মতো ভাগজোখ করে নিয়েছে, সে তৈরি করছে নানা জটিলতার বেড়াজাল, সংকীর্ণ দেশাত্মবোধ। মানুষ কি কখনও দেখে না, পাখি যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়ে যায় তখন তার পাসপোর্ট লাগে না, ভিসা লাগে না, কাস্টমস ডিঙোতে হয় না? পৃথিবীকে ভাগজোখ করার সে কে? সে কেন দেশ ভাগ করে নিজের ভিতরে সৃষ্টি করে আঁটন বাঁধন? সে কেন গোটা এই গ্রহটির কথা ভাবে না। কালো মহাশূন্যে সবুজাভ নীল প্রাণময় এই তুলনাহীন পৃথিবীকে সে কেন গোটাগুটি নিজের বলে ভাবতে পারে না? এ যেন পৃথিবীকে শরিকানায় ভাগ করে নিজের নিজের কোর্ট আঁকড়ে থাকা। আর এই শরিকানার কাজিয়ায় চলে যাচ্ছে মানুষের আয়ু ও শ্রম, এই কাজিয়ায় আহুতি হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর মহার্ঘ জলবায়ু, তার যতেক সম্পদ। তার খুব ইচ্ছে করে ভিখিরির মতো দেশে দেশে ঘুরে মানুষকে এইসব কথা বোঝাতে। সবাই এক হয়ে এই পৃথিবীর কথা ভাবো, পৃথিবী ছোট একটি গ্রহ, তার অফুরন্ত সম্পদ নেই। যা আছে, যেটুকু আছে তাকে যত্ন করে সঞ্চিত রাখো। মেক্সিকোয় ভূমিকম্প হলে উদাসীন থেকো না চীন, ইথিওপিয়ায় দুর্ভিক্ষ হলে তার ক্ষুধা যেন স্পর্শ করে সুইডেনকেও, আফ্রিকায় মহামারী হলে তা যেন উদ্বিগ্ন করে আমেরিকাকেও।
