একদিন হেমাঙ্গর ফোন এল, কৃষ্ণজীবনবাবু, আমরা রোববার একটা গেট টুগেদার করছি। আসবেন?
রবিবার? বেশ তো।
আবার হুট করে বিদেশে চলে যাবেন না তো!
না। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লেখালেখির কাজ আছে। মার্চে যাবো।
এখন আপনি কী লিখছেন?
কৃষ্ণজীবন হাসল, আমার লেখার কিছু মাথামুণ্ডু নেই। আমি এখন যা লিখছি সেটা খানিকটা আত্মজীবনীর মতো। কিংবা তাও নয়। নাম দিয়েছি—হোয়েন আই মিট মাইসেলফ।
দার্শনিক লেখা নাকি?
অনেকটা। লেখাটা কিছু হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। শুধু রিফ্লেকশনস। ছোট ছোট ঘটনা। রিঅ্যাকশন।
কারা ছাপবো?
আমেরিকার পাবলিশার। ওরা বলেছে যা লিখব ছাপবে। সেই সাহসেই যা খুশি লিখছি।
লিখুন। হয়তো এটাও হবে মাস্টারপিস।
না, তা হবে না। তবে আমার ভিতরকার বিষণ্ণতার একটা চিত্র রেখে যাচ্ছি।
আপনি কি বিষণ্ণ মানুষ?
কে জানে! আনহ্যাপি, ইয়েস। কিন্তু মেলাংকলিক হয়তো নয়। এসব ভারী কথা থাক। হানিমুন কেমন হল?
আমরা গিয়েছিলাম নিশিপুর।
একটু ভেবে কৃষ্ণজীবন বলল, ওঃ, আপনার সেই গ্রাম?
হ্যাঁ। যেখানে আপনাকে আজও নিতে পারিনি। যাবেন একবার?
যাবো। নিশ্চয়ই যাবো।
হোয়েন আই মিট মাইসেলফ-এ কৃষ্ণজীবন লিখল, আমি আজকাল সুখী লোকদের ঈর্ষা করি। কিনা কে জানে। এই যে হেমাঙ্গ আর ঝুমকি এক তরুণ এদের ঝলমলে মুখ, আর উজ্জ্বল সম্পর্ক আমাকে সুখী করল না। ওদের গেট টুগেদারে গিয়ে আমার কেবলই মনে হতে লাগল। এ তো মায়া। এ তে রচিত সম্পর্ক। আঠা কই? জোড় কিসের? শুধু মন, শুধু বিভ্ৰম জুড়ে রেখেছে এদের।
হোয়েন আই মিট মাইসেলফ লিখতে লিখতে মাঝে মাঝে ভীষণ অস্থিরতা বোধ করে কৃষ্ণজীবন। ঘরবন্দী থাকতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে লিখতেও ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে গভীর রাত অবধি ঘুম আসতে চায় না। মাঝে মাঝে মূক-বধিরের মতো আচরণ করে সে। দিনের পর দিন কথা বলে না কারও সঙ্গে। শুধু চুপচাপ বসে থাকে।
এক মধ্যরাতে রিয়া উঠে এল তার ঘরে। একটা ঢাকনা পরানো আলো-আধো অন্ধকার ঘরে কৃষ্ণজীবন বসে আছে। পাথরের মূর্তির মতো। সম্পূৰ্ণ বাহ্যজ্ঞানরহিত। মাথার ভিতরে নানান চিন্তার সূত্র পরস্পরের সঙ্গে নানা অন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। অনেক ছিন্ন সূত্র ঝুলে আছে অর্থহীনতায়। কত ছোট টুকরো ঘটনার স্মৃতি গহীন আবছায়ার চেতনার ভিতর থেকে উঠে আসছে। কত তুচ্ছ অর্থহীন ঘটনা। রিয়া যখন ঘরে এল তখন সে একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা ভাবছিল। ছেলেবেলায় একবার হাতে একটা বাতাসা মুঠোয় নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাঝরাতে অজস্র পিঁপড়ে ঘেঁকে ধরেছিল তাকে। পিঁপড়ের কামড়ে উঠে বসে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠেছিল সে। আলো জ্বেলে দেখা গেল, লাল পিপড়েয় ভরে গেছে বালিশ এবং আশপাশ। এই ঘটনার পর সে অবাক হয়ে ভাবত, পিঁপড়েদের খবর দিল কে? কি করে তারা টের পেল কোথায় বাতাসাটা আছে? পিপড়েরা কি রাতে ঘুমোয় না? তারা কি অন্ধকারেও দেখতে পায়? নিজের প্রশ্নে প্রশ্নে নিজেই জর্জরিত হত সে।
আজও হয়।
রিয়া দুবার ডাকবার পর কৃষ্ণজীবন ফিরে এল বর্তমানে।
কিছু বলছ?
এত রাত অবধি বসে আছ কেন? কী হয়েছে?
কৃষ্ণজীবন তটস্থ হয়ে বলে, কিছু হয়নি তো!
আজকাল এত অন্যমনস্ক থাকো, আমার ভয় করে।
চল্লিশোর্ধ্ব স্ত্রীর দিকে কিছুক্ষণ অপরিচিতের মতো চেয়ে থাকে কৃষ্ণজীবন। কোনও কথা আসে না মুখে।
ধীরে ধীরে তুমি কিরকম হয়ে যা বলো তো! আগেও আনমনা থাকতে, চুপচাপও থাকতে। আজকাল যেন। বাড়াবাড়ি। কী হয়েছে বলবে?
কৃষ্ণজীবন এবারও কথা বলতে পারল না। তার চোখের সামনে ভাসছে ঘোর বর্ষাকালের একটা দৃশ্য। তিনদিন ধরে তুমুল বৃষ্টি। স্কুল বন্ধ, বাজারহাট বন্ধ, উঠোনে হাঁটু জল। মা, বাবা, ভাই, বোন সবাই বারান্দায় বসে জল দেখছে। চুপচাপ। কারও মুখে কথা নেই। টিনের চালে শুধু বৃষ্টির ঝমাঝম। তারা চুপ করে বসে আছে। কিছু করার নেই। রান্নাঘর ভেসে গেছে বলে সেদিন রান্না হয়নি তাদের। পেটে মস্ত খিদে। তবু তারা নিশ্চেষ্ট হয়ে চুপচাপ বসে আছে। শুধু বৃষ্টি পড়ছে। শুধু বৃষ্টি পড়ছে। কেন মনে পড়ছে দৃশ্যটা? কেন এই অহেতুক স্মৃতি।
কৃষ্ণজীবন অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, কি হয়েছে জানি না। কিছু জানি না।
রিয়া মুখোমুখি চেয়ারে বসল। হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করল হাতে। বলল, চুপচাপ থাকলে আরও বেশি চিন্তা হবে। ওগো, তুমি যা-খুশি কিছু কথা বলে। কথা বললে এই স্পেলটা কেটে যাবে।
কৃষ্ণজীবন বেদনার্ত চোখে রিয়ার দিকে চেয়ে থেকে শুধু মাথা নাড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কাটবে না।
কেন কাটবে না? এত মানুষ, কই কেউ তো তোমার মতো এত ভাবে না! তুমি কেন এরকম হয়ে যাও। ছেলেমেয়েরা অবধি তোমার জন্য চিন্তা করছে। দোলন বারবার জিজ্ঞেস করে, বাবার কী হয়েছে মা? আমি বলি, তোমার বাবা বই লিখছে তো! তাই ভাবছে। কিন্তু আসলে তো তা নয়। তোমার ডিপ্রেশন চলছে। কেন গো?
বিস্ফারিত দুই চোখে রিয়ার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কৃষ্ণজীবন অস্ফুট গলায় বলল, অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা।
কি বলছ?
আজ যদি স্মৃতিভ্ৰষ্ট হই, কি করে বুঝবো যে তুমি রিয়া? বস্তুর চতুর্থ মাত্রা হল সময়। আইনস্টাইন বলেছিলেন। কিন্তু বস্তুর আরও কত মাত্ৰা আছে। পঞ্চম মাত্রা হল স্মৃতি, নইলে বুঝব কি করে কোনটা কী? ষষ্ঠ মাত্রা হল ইমাজিনেশন, পারসোন্যাল ভিশন। চারদিকে এই যে এত বস্তুপুঞ্জ দেখছো, সে সবই আমাদের কল্পনার রঙে রঙিন। নইলে কিছুই নয়।
